বৃহস্পতিবার, ৩০শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৫ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

news-image

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ক্লিন ইমেজের ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিও দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকতে পারলেন না। স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্তে মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে পার্ক নির্মাণ ও দোকান বরাদ্দে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। আর যেখানে অনিয়ম করা হয় সেখানে সঙ্গতকারণে দুর্নীতির বিষয়টি চলে আসে। তদন্তে প্রমাণিত অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ইতিমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনকে চিঠিও পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

প্রসঙ্গত, মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি স্বজনপ্রীতি ও বেআইনি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেন। নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় কিছু লোকজন ছাড়াও এমন অভিযোগ করে আসছিলেন এ এলাকার সংসদ সদস্য শামীম ওসমানও। দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগের কথা উচ্চারিত হলেও এবার কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।
এদিকে উত্থাপিত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ মোটেও সত্য নয় বলে দাবি করেছেন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। এ বিষয়ে রোববার  তিনি বলেন, ‘আমি শামীম ওসমানের উদ্দেশ্যমূলক প্রতিহিংসার শিকার। শুধু এ কারণেই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপ্রপচার করা হচ্ছে।’ তবে শামীম ওসমান এ অভিযোগ খণ্ডন করে বলেন, ‘মেয়র আইভী ক্লিন ইমেজের আড়ালে শুধু লুটপাটই করছেন না, তিনি মহান সংসদে মিথ্যা তথ্যও উপস্থাপন করতে পিছপা হননি।’ তিনি আইভীর অপসারণ ও শাস্তি দাবি করেন। জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে মেয়রের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে জোরালো অভিযোগ তোলেন স্থানীয় এমপি শামীম ওসমান। ৪ মার্চ জাতীয় সংসদের ৫ম অধিবেশনে তিনি এ সংক্রান্ত বিষয়ে দেশবাসীকে জানানোর জন্য কয়েকটি লিখিত প্রশ্ন উপস্থাপন করেন। তার প্রশ্ন ও অভিযোগের সূত্র ধরেই তদন্ত কমিটি গঠন করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ৬ এপ্রিল এসংক্রান্ত তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে তদন্ত শুরু হওয়ার পর পরই হঠাৎ কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে সরিয়ে দেয়া নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনাও ছড়িয়ে পড়ে। এতে করে স্পর্শকাতর এ তদন্ত প্রক্রিয়াটি প্রথমেই এক ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। এরপর কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে ৪ মাসের মাথায় তদন্ত শেষ করা হয়। চলতি মাসেই এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনটি স্থানীয় সরকার বিভাগে জমা দেয়া হয়।


যা আছে রিপোর্টে : তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব অশোক মাধব রায় স্বাক্ষরিত ১৫ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি  হাতে এসেছে। এটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি এলাকায় পার্ক নির্মাণে চুক্তির ক্ষেত্রে অনিয়মের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান মেসার্স জুলফিয়া ইন্টারন্যাশনালের পরিচালকরা প্রকৃত তথ্য গোপন করে পার্ক নির্মাণসংক্রান্ত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে জড়িত হন। জুলফিয়া ইন্টারন্যাশনাল নামের ওই প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন পরিচালকের স্বামী সিটি কর্পোরেশনে কর্মরত আছেন। চুক্তির সময় তারা দাখিলকৃত কাগজপত্রে স্বামীর নাম গোপন করে বিশেষ উদ্দেশে পিতার নাম উল্লেখ করেন। তদন্ত কমিটি এ সংক্রান্ত বিষয়ে পরিষ্কারভাবেই বলেছে, ‘সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা তাদের স্ত্রীরা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই এ ধরনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন না। এ বিষয়ে আরও অভিযোগ ছিল, পার্ক নির্মাণের জন্য সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মালিক সিটি মেয়র আইভীর মামাতো ভাই রেজাউল ইসলাম ওরফে রনি। তদন্তে আইভীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগটিও প্রমাণিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কমিটির পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, রেজাউল ইসলাম মেয়রের মামাতো ভাই হলেও তিনি মেয়রের ওপর নির্ভরশীল নন। তাই এ সংক্রান্ত চুক্তির ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি। কিন্তু স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিকটাত্মীয়কে কোটি কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেয়া কাগজে-কলমে বেআইনি না হলেও এটি একজন জনপ্রতিনিধির গুরুতর নৈতিক স্খলন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত লংঘন করে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও পার্কটি সিটি কর্পোরেশনের কাছে বুঝিয়ে দেয়নি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জুলফিয়া ইন্টারন্যাশনাল। অথচ এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি কর্তৃপক্ষ।


এদিকে মেয়রের বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ ছিল, সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন মার্কেটে দোকান ও ফ্ল্যাট বরাদ্দে অনিয়ম এবং স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেয়া। এক্ষেত্রে মেয়র তার সংরক্ষিত কোটার অপব্যবহারও করেছেন। এ বিষয়ে তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, একই ব্যক্তিকে একাধিক দোকান বরাদ্দ দেয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তদন্ত রিপোর্টের ৯.২ অনুচ্ছেদে পর্যালোচনা ও মন্তব্য অংশে বলা হয়েছে, চাষাঢ়া পৌর (সিটি) মার্কেটের ২য় তলার ৪নং এবং ৫নং দোকানটি জনৈক আবু সাইদের স্ত্রী আয়েশা বেগমের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়। আবার শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের কথা উল্লেখ করে আরেকটি দোকান আবু সাইদকেও বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অথচ এ সংক্রান্ত নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনো ব্যক্তিকে বা তার পরিবারের সদস্যদের একটির বেশি দোকান বরাদ্দ দেয়া যাবে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিক দোকান বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তি এই আবু সাইদ মেয়রের ঘনিষ্ঠভাজন হিসেবে পরিচিত। তিনি সিটি কর্পোরেশনের বহুল আলোচিত ঠিকাদার আবু সুফিয়ানের পিতা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সময় স্বল্পতার কারণে সব দোকান বরাদ্দের তালিকা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই দৈবচয়ন ভিত্তিতে এ সংক্রান্ত যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারাই বলছেন, প্রায় ৬শ’ দোকান বরাদ্দের নামে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। এক্ষেত্রে মুখ বন্ধ রাখতে অনেক প্রভাবশালীকেও বেনামে দোকান বরাদ্দ দিয়েছেন সিটি মেয়র। এভাবে অনিয়ম করে কয়েক কোটি টাকার দুর্নীতি করা হয়েছে।


সেই খসড়া রিপোর্টে যা আছে : জমা হওয়া তদন্ত রিপোর্ট নিয়েও সমালোচনার শেষ নেই। অভিযোগ করা হচ্ছে, মেয়রের দুর্নীতি ঢাকতে পর্দার আড়ালে অনেক কিছুই ঘটে গেছে। এরই অংশ হিসেবে তদন্ত কমিটি থেকে একজন সদস্যকে মাঝ পথে সরিয়ে দেয়া হয়। সূত্র জানায়, সরিয়ে দেয়া কর্মকর্তার তদন্তে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে। তিনি তার তদন্তের একটি খসড়াও চূড়ান্ত করেছিলেন।

অনুসন্ধানে ওই খসড়া তদন্ত রিপোর্টের সন্ধান মিলেছে। পার্ক নির্মাণসংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে এই খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জুলফিয়া ইন্টারন্যাশনাল অখ্যাত ও আর্থিকভাবে দুর্বল। তাদের আদৌ পার্ক নির্মাণের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। তাই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পার্ক নির্মাণের চুক্তি করে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। তাছাড়া নির্ধারিত সময়ে পার্ক নির্মাণ করতে না পারলেও সিটি কর্পোরেশন অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে কোনো ধরনের জরিমানা করেনি। এতে প্রমাণিত হয়, পার্ক নির্মাণে গাফিলতির বিষয়ে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের পরোক্ষ সমর্থন ছিল। একইভাবে অন্যান্য অভিযোগের বিষয়েও এ ধরনের মন্তব্য করা হয়েছে এই খসড়া প্রতিবেদনে। কিন্তু তদন্ত কমিটির ওই সদস্যকে মাঝ পথে সরিয়ে দেয়ায় এই তদন্ত রিপোর্টটিও শেষ পর্যন্ত জমা দেয়া সম্ভব হয়নি।


মেয়রের বক্তব্য : নারায়ণগঞ্জ সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী রোববার  বলেন, তার সিটি কর্পোরেশনে এক টাকার দুর্নীতিও কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। তিনি বলেন, মহান সংসদে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগ সম্পূর্ণ অবান্তর। স্থানীয় এমপি শামীম ওসমান রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে তাকে হেয় করার জন্য মূলত এসব মনগড়া অভিযোগ তুলছেন। আইভী বলেন, এমপি সাহেব আমার সঙ্গে মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গিয়েছিলেন। সেই পরাজয় এখনও তিনি ভুলতে পারেননি। নারায়ণগঞ্জে তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিরোধিতাকারীদের তিনি মোটেও সহ্য করতে পারেন না। তাই তিনি আমার পেছনে উঠেপড়ে লেগেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শামীম ওসমানের অভিযোগের ভিত্তিতে যে তদন্ত হয়েছে তার রিপোর্ট এখনও তিনি দেখেননি। তাই রিপোর্টের বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। শামীম ওসমান এমপির বক্তব্য : তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান যুগান্তরকে বলেন, তিনি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে সংসদে প্রশ্ন রেখেছিলেন। ওইসব প্রশ্নের বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে তথ্য দেয়ার ক্ষেত্রেও জালিয়াতি ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। আর এসব তথ্য সংসদে উপস্থাপিত হওয়ায় নিঃসন্দেহে মহান সংসদের অবমাননা করা হয়েছে। তাই মেয়রের বিরুদ্ধে সংসদ অবমাননার অভিযোগেরও সুরাহা হওয়া উচিত। –যুগান্তর

এ জাতীয় আরও খবর

বিশ্বের ‘মোমো রাজধানী’ কোন শহর?

সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সম্মত ঢাকা-দিল্লি : পররাষ্ট্রমন্ত্রী

পুরুষের ৫টি গোপন রহস্য জেনে নিন

সহকারী পরিচালকের ‘অদ্ভুত’ আচরণ, ভয়াল স্মৃতি কাজলের

বিএনপি সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির দিকে যাচ্ছে : নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

সাগরপথে ইতালি ও গ্রীসে যাওয়ার শীর্ষে বাংলাদেশ

এই সরকার স্বৈরাচারের পথেই হাঁটছে : নাহিদ ইসলাম

ইরানের ডজনের বেশি প্রতিষ্ঠান-ট্যাংকারের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

অধিনায়কত্ব হারালেন মিরাজ, দায়িত্ব বাড়ল লিটনের

কারিনার নতুন লুকে মুগ্ধ ভক্তরা, স্কার্ফ নিয়ে আলোচনা

যশোরে গ্রেপ্তার ডেভিড ইমনকে চট্টগ্রামে আনা হচ্ছে

চট্টগ্রামে বিএনপি-এনসিপি মুখোমুখি, বাড়ছে উত্তেজনা