শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝড়, বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানছে। ৭ মাত্রার বেশি শক্তির এসব ভূমিকম্পে কোথাও প্রাণহানি ঘটেছে, কোথাও ধসে পড়েছে ঘরবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতার পাশাপাশি অনেক এলাকায় সুনামির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক।
সবশেষ শনিবার (১৫ আগস্ট) ভোরে ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, এতে প্রায় ৫০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। তবে উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয় সময় ভোর ৫টার কিছু আগে আঘাত হানা ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের মাত্র ১৫ কিলোমিটার গভীরে। সাধারণত ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল যত অগভীর হয়, ভূপৃষ্ঠে এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব তত বেশি হয়। ভূমিকম্পের পর একই এলাকায় একাধিক শক্তিশালী আফটারশক অনুভূত হয়। এর মধ্যে একটি ছিল ৬ দশমিক ১ মাত্রার।
ভূমিকম্পে মাউমেরে বন্দরের একটি টার্মিনাল ভবনের বড় অংশ ভেঙে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ভবনের কংক্রিটের অংশ নিচে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের ওপর পড়ছে। একটি জাহাজের সঙ্গে যুক্ত গ্যাংওয়ে ভেঙে পড়লে কয়েকজন যাত্রী সাগরেও পড়ে যান।
পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের গভর্নর ইমানুয়েল মেলকিয়াদেস লাকা লেনা জানান, ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে ঘুমের মধ্যেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। ভূমিকম্পের পর সুনামির সতর্কতা জারি হলে আতঙ্কিত মানুষজন উপকূল থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন। প্রায় ২ হাজার মানুষ নিজ উদ্যোগে নিরাপদ স্থানে চলে যান বা আশ্রয় নেন। তবে প্রায় তিন ঘণ্টা পর সুনামির সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।
এর আগে গত ১০ আগস্ট কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটে। দেশটির দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্থা ইউএনজিআরডির তথ্য অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮৫ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৯৭৫ জন। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৩৭৯ জন। এছাড়া ৩৫৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
ভূমিকম্পে কলম্বিয়ার ১৫টি বিভাগ ও ৪২৬টি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির মুখে পড়েছেন ৪৫ হাজার ৫২৩টি পরিবার এবং ১ লাখ ২ হাজার ২৬৩ জন মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৭১ হাজার ৭৬৩টি বাড়ি এবং পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে ১২ হাজার ৫৯৭টি বাড়ি। ধসে পড়েছে ১২১টি ভবন।
এ ছাড়া ২ হাজার ২০৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ২৪০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ১ হাজার ২০৮টি কমিউনিটি সেন্টার, ২১০টি সড়ক, ৭৩টি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, ৪৪টি যানবাহন চলাচলের সেতু, ১৩টি পথচারী সেতু এবং পাঁচটি বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলও কাজ করছে।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলায় গত ২৪ জুন আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫ হাজার ৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। উদ্ধার, ধ্বংসস্তূপ সরানো ও নিখোঁজদের সন্ধান কার্যক্রমের কারণে মৃতের সংখ্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। দেশটির উপকূলীয় লা গুয়াইরা রাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভূমিকম্পের পর ১ হাজার ৩৩১টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে।
সরকারের হিসাবে, ৮৫৬টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত এবং ১৯০টি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে। সেতু, সড়কসহ আরও বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্প
জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কুমামোতোতেও সম্প্রতি শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রাণহানি ঘটে। প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পটির মাত্রা ৭ দশমিক ১ বলা হলেও পরে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ এর মাত্রা ৬ দশমিক ৮ বলে সংশোধন করে। এতে অন্তত ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভূমিকম্পের পর ভবন ধস, অগ্নিকাণ্ড, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং সড়ক ক্ষতির ঘটনা ঘটে।
কুমামোতো শহরের একটি শপিং মলেও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ভূমিকম্পের পর ভবনের একটি অংশ ধসে পড়ে এবং পরে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে কয়েকজন নিহত ও আহত হন। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে অভিযান চালান।
ফিলিপাইনে শক্তিশালী ভূমিকম্প
চলতি বছরের জুনে ফিলিপাইনে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির দক্ষিণের প্রধান দ্বীপ মিন্দানাও এর জেনারেল সান্তোস সিটির উপকূলে ভূমিকম্প আঘাত হানে। এই ভূমিকম্পে অন্তত ১৩৪ জন আহত হয়েছেন।
তুরস্ক-সিরিয়ার ভয়াবহ স্মৃতি
সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্ক ও সিরিয়ায়। ওই দিন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৭ দশমিক ৮ ও ৭ দশমিক ৭ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে।
ভূমিকম্পে তুরস্ক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়। সড়ক, ভবন ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তী তিন মাসে ৩০ হাজারের বেশি আফটারশক রেকর্ড করা হয়।
প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়, যা প্রায় জার্মানির সমান। তুরস্কে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং প্রায় ১৫ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন।
তুরস্কে নিশ্চিতভাবে ৫৩ হাজার ৫৩৭ জনের মৃত্যু হয়। সিরিয়ায় নিহতের সংখ্যা ৫ হাজার ৯৫১ থেকে ৮ হাজার ৪৭৬ জনের মধ্যে বলে বিভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। দুই দেশের জন্যই এটি আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি।
কেন এত ভূমিকম্প?
ভূমিকম্পের পেছনে মূল ভূমিকা রাখে পৃথিবীর ভূত্বকের টেকটোনিক প্লেটগুলোর নড়াচড়া। জাপান প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে ভূমিকম্পের প্রবণতা বেশি। প্রশান্ত মহাসাগরীয়, ফিলিপাইন সাগর, ইউরেশীয় ও উত্তর আমেরিকান প্লেটের ক্রমাগত নড়াচড়ার কারণে দেশটিতে প্রতি বছর হাজারো ভূমিকম্প হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী ভূমিকম্প পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে কঠোর ভবন নির্মাণ বিধিমালা, নিয়মিত মহড়া, দ্রুত সতর্কবার্তা এবং কার্যকর উদ্ধারব্যবস্থা প্রাণহানি অনেকটাই কমাতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলো আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের জন্য প্রস্তুতি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার কোনো বিকল্প নেই। সূত্র: আল-জাজিরা, এপি, বিবিসি











