অনলাইন ডেস্ক : হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে ইরানের দেওয়া শর্তের বিপরীতে এবার পাল্টা ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত কয়েক দশকে ইরানের কর্মকাণ্ডে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য তেহরানকে অর্থ পরিশোধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। এতে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া নিয়ে দুই দেশের সমঝোতার পথ আরও কঠিন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সোমবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, ইরানের কর্মকাণ্ডে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি তিনি চান। এর মধ্যে বিক্ষোভে নিহত বেসামরিক মানুষ এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিহত মার্কিন সেনাদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ট্রাম্পের ভাষ্য, ইরানের কারণে যদি কোনো ক্ষতি হয়ে থাকে এবং তার জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে সেই অর্থ তেহরানকেই দিতে হবে।
এর আগে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে ইরান ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সামরিক হুমকি বন্ধের দাবি জানিয়েছিল। তেহরানের এসব শর্ত দুই দেশের মধ্যে আগে হওয়া একটি প্রাথমিক শান্তি সমঝোতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তবে পরবর্তীতে সেই সমঝোতা ভেস্তে যায়।
ট্রাম্পের পাল্টা দাবির পর হরমুজ প্রণালি দ্রুত চালু হওয়া নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে।
ইরানে বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা নিয়েও ট্রাম্পের দাবি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ ভাগ থেকে ২০২৬ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি দাবি করেছেন, ছয় সপ্তাহ আগ পর্যন্ত প্রায় ৫২ হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে এই সংখ্যার বড় পার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির হিসাবে, বিক্ষোভে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জনসহ মোট নিহতের সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। অন্যদিকে ইরানের কিছু বিরোধী ও নির্বাসিত সংগঠন নিহতের সংখ্যা কয়েক দশক হাজার বলে দাবি করেছে।
এ ছাড়া ২০০০ সালের অক্টোবরে ইয়েমেনে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস কোল-এ হামলায় নিহত ১৭ মার্কিন নাবিকের পরিবারকেও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি করেছেন ট্রাম্প। যদিও ওই হামলার জন্য ইরানকে নয়, আল-কায়েদাকে দায়ী করা হয়েছিল।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও দাবি করেছেন, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও গাজায় মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতির জন্যও ইরানকে দায় নিতে হবে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির বিকল্প নৌপথ নির্ধারণে ওমানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, আলোচনা ইতিবাচক ও গঠনমূলকভাবে এগোচ্ছে। নতুন নৌপথের মানচিত্র নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলেও কিছু কারিগরি বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
নিরাপদ নৌ চলাচল, পরিবেশ সুরক্ষা, সামুদ্রিক সেবা এবং অপরাধ দমনের বিষয়গুলোও আলোচনায় রয়েছে। এসব সেবার ক্ষেত্রে সাধারণত নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধের প্রয়োজন হয়।
তবে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের জন্য ইরানের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ফি আদায়ের ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়। জুলাইয়ে ইরানের জাহাজ চলাচলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে অবরোধ আরোপ করলে তেহরান সেটিকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করে।
অন্যদিকে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানির উচ্চমূল্য দেশটির গ্রামীণ এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি চালু করতে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা এগোলেও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ক্ষতিপূরণের দাবি এবং দুই পক্ষের পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে দ্রুত চূড়ান্ত সমঝোতা হওয়া এখনো অনিশ্চিত।