,

আলোচনা-সমালোচনায় বছর শেষ

news-image

ডেস্ক রিপোর্ট : বহু ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী হয়েছে ২০২১ সাল। চট্টগ্রামে প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তিতে বছরজুড়ে ছিলো নানান আলোচনা-সমালোচনা। যা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও আলোড়ন তুলেছে। বিদায়ী বছরে এমন কয়েকটি আলোচিত ঘটনাগুলোর বর্ণনা তুলে ধরা হলো।

চসিক নির্বাচন

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ শুরু হলেও শেষ হয়েছে কেন্দ্র দখল নিতে প্রকাশ্যে গোলাগুলি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ-সহিংসতা, প্রাণহানি, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ভাঙচুর, ভোট বর্জনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ও ভোটার খরার মধ্যদিয়ে। প্রথমবারের মতো পুরো নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়েছে ইভিএমের মাধ্যমে। বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচনে নানা অনিয়মের অভিযোগ তোলা হলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তরফ থেকে ভোটকে উৎসবমুখর বলা হয়েছে। নির্বাচনী কর্মকর্তারাও বলেছেন, ভোট শান্তিপূর্ণ হয়েছে।

নির্বাচনের দিন সকাল সোয়া ৮টার দিকে লালখান বাজারে একটি কেন্দ্র এবং চকবাজার বিএড কলেজ কেন্দ্রে তিনটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ভোটারদের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর লালখান বাজার শহিদনগর স্কুলের ভোট কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থী আবুল হাসনাত বেলাল ও দলটির বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী এফ কবির মানিকের সমর্থকদের মধ্যে থেমে থেমে সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের ২০ জন আহত হয়। ঘটনায় ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুমকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। এছাড়া বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়। পরে পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবি গিয়ে দুই পক্ষকে ধাওয়া নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।

এছাড়া সেদিন সকাল ৮টার দিকে চট্টগ্রামের ১২ নম্বর ওয়ার্ডে (সরাইপাড়া) নির্বাচনী বিরোধকে কেন্দ্র করে আপন ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে আরেক ভাই নিহত হন। এরপর সকাল ১০টার দিকে ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের আমাবাগন ইউসেপ স্কুল কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে আলাউদ্দিন আলো (২৮) নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান।

এ সমস্ত ঘটনার মধ্যেদিয়ে নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ এই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নৌকা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন তিন লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোট পান ৫২ হাজার ৪৮৯।

‘স্পাইডারম্যান’ হাজতি রুবেল

৬ মার্চ সকালে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের নির্মাণাধীন একটি চার তলার ভবন থেকেই লাফ দিয়ে পালিয়ে যায় হাজতি ফরহাদ হোসেন রুবেল। নির্মাণাধীন চার তলার ভবনের উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট। তবে ৬০ ফুট ওপর থেকে লাফ দিয়েও পা ভাঙেনি রুবেলের। এক্স-রে করার পর পুলিশ এ তথ্যটি জেনেছে। এরপর ৯ মার্চ সকালে রুবেলকে তার ফুফুর বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুর থানার বাল্লাকান্দি চর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

কারাগার থেকে হাজতি রুবেল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে জেলার মো. রফিকুল ইসলামসহ এক ডেপুটি জেলারকে প্রত্যাহার করা হয়। এছাড়া কর্ণফুলী ভবনের ১৫ নম্বর সেলের দায়িত্বরত কারারক্ষী নাজিম উদ্দিন ও সহকারী কারারক্ষী ইউনুস মিয়া সাময়িক বরখাস্ত হন। সহকারী প্রধান কারারক্ষী কামাল হায়দারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়।

বছরজুড়ে আলোচনায় মিতু হত্যা মামলা

চট্টগ্রামের চাঞ্চল্যকর মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যা মামলার আলোচনা ছিল বছরজুড়ে। ২০১৬ সালের ৫ জুন চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে করে তিন দুর্বৃত্ত মিতুকে গুলি ও কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়। ওই সময় মিতুর স্বামী বাবুল আক্তার পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে যোগ দিয়ে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। এ ঘটনায় নগরীর পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন বাবুল আক্তার। মামলাটি চট্টগ্রামের নগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে ৩ বছর ১১ মাস তদন্তে থাকার পর গত বছরের মে মাসে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) হস্তান্তর করা হয়। মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা হলেন পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা।

তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বাবুল আক্তারকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। এরপর মিতু হত্যাকাণ্ডে বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করে মোট ৮ জনের বিরুদ্ধে গত ১২ মে মিতুর বাবা মোশারফ হোসেন পাঁচলাইশ থানায় এজাহার দায়ের করেন। এজাহারে সাবেক এসপি মিতুর স্বামী বাবুল আক্তার, কিলিং স্কোয়াডের সদস্য মো. কামরুল ইসলাম সিকদার ওরফে মুসা, এহতেশামুল হক ওরফে ভোলা, মো. মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. খায়রুল ইসলাম ওরফে কালু ওরফে কসাই কালু, মো. সাইদুল ইসলাম সিকদার ওরফে সাকু মাইজ্যা ও শাহজাহান মিয়াকে আসামি করা হয়েছে। যদিও এদের মধ্যে ২ জন পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন এবং বর্তমানে জেলে আছেন ২ জন।

পুলিশের তথ্যমতে, কিলিং স্কোয়াডের নেতৃত্বদানকারী মুসা পলাতক রয়েছেন। এছাড়া স্ত্রী হত্যা মামলার প্রধান আসামি বাবুল আক্তারকে পাঁচ দিনের রিমান্ড নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই। রিমান্ড শেষে প্রথমে আদালতে জবানবন্দি দেয়ার কথা থাকলেও পরে জবানবন্দি দেননি বাবুল। ২৯ মে থেকে বাবুল আক্তার ফেনী কারাগারে আছেন।

চাঞ্চল্যকর এ মামলায় সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের কথিত প্রেমিকা গায়ত্রী অমর শিং এর নতুন উঠে আসে। গায়ত্রী অমর শিং সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাকে (ইউএনএইচসিআর) গত ২৩ মে চিঠি দেয় পিবিআই। সেই চিঠির উত্তর পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ইউএনএইচসিআর এটি নিশ্চিত করেছে যে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারে ইউএনএইচসিআরের ফিল্ড অফিসার (প্রটেকশন) হিসেবে কর্মরত ছিলেন গায়ত্রী অমর সিং। ফিরতি চিঠিতে সংস্থাটি এও জানিয়েছে, গায়ত্রী এখন আর ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে যুক্ত নেই। তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কেও কিছু জানানো হয়নি চিঠিতে।

গায়ত্রী অমর সিং একজন ভারতীয় নাগরিক। তিনি জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার—ইউএনএইচসিআর এর ফিল্ড অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন কক্সবাজারে। তিনি উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের রাষ্ট্র নেদারল্যান্ডসের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর রটারডামে রয়েছেন। সেখানেও তিনি ইউএনএইচসিআর-এর লিগ্যাল অফিসার হিসেবে কাজ করেন।

এছাড়া মিতু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও পরিবর্তন হয়। পিবিআইয়ের পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা বদলি করা হয়। সন্তোষ চাকমা বদলি হলে ২২ নভেম্বর মিতু হত্যা মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান একেএম মহিউদ্দিন সেলিম। এর কদিনের মধ্যেই তিনি পদোন্নতি পেয়ে সহকারী পুলিশ সুপার হন। এরপরই পরিদর্শক আবু জাফর মোহাম্মদ ওমর ফারুককে দায়িত্ব দেয়া হয়।

মিনু-হাছিনা কাণ্ড: উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে

চট্টগ্রামে হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কুলসুম আক্তারের হয়ে প্রায় তিন বছর ধরে সাজা খাটছিলেন মিনু আক্তার। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ২০০৬ সালের ৯ জুলাই মোবাইল ফোন নিয়ে বিবাদের জেরে চট্টগ্রাম নগরীর রহমতগঞ্জ এলাকায় পোশাক কারখানার কর্মী কোহিনুর বেগম খুন হন। ওই মামলায় ২০০৭ সালের ২৬ অক্টোবর চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার গৌরস্থান মাঝেরপাড়া গ্রামের আনু মিয়ার মেয়ে কুলসুমীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ২০০৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম আদালত থেকে জামিন পেয়ে কারাগার থেকে মুক্তি পান কুলসুমী। পরবর্তীতে এ মামলায় বিচার শেষে ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর চট্টগ্রামের চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত এক রায়ে কুলসুমীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দেন। রায়ের দিন কুলসুমী আদালতে অনুপস্থিত থাকায় তাকে পলাতক দেখিয়ে রায় ঘোষণা করা হয়।

এরপর ভাসমান বস্তিতে মিনুকে পান কুলসুমী। মিনুর পরিবার গরিব হওয়ায় তার সন্তানদের ভরণপোষণ দেয়ার প্রস্তাব দেন কুলসুমী। বিনিময়ে একদিন আদালতে হাজির হতে হবে বলে জানানো হয় মিনুকে। আদালতে হাজির হলে তার জামিনও করিয়ে আনবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। মিনু কুলসুমীর কথায় রাজি হয়ে কুলসুমী সেজে ২০১৮ সালের ১২ জুন চট্টগ্রাম আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। সেই থেকে মিনু কারাবন্দি। তবে মিনুর আর খোঁজ নেননি কুলসুমী।

এ অবস্থায় মিনু পুরো ঘটনা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে ফাঁস করে দেন। প্রথম প্রথম কেউ তার কথা না শুনলেও গত ১৮ মার্চ কুলসুমীর পরিবর্তে মিনুর কারাভোগের বিষয়টি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার মো. শফিকুল ইসলাম খানের নজরে আসে। এরপর তিনি বিষয়টি নিজে অনুসন্ধান করেন। চট্টগ্রাম কারাগারে থাকা নথিতে কুলসুমীর ছবির সঙ্গে মিনুর ছবির মিল খুঁজে পায় না কারা কর্তৃপক্ষ। গত ২১ মার্চ সিনিয়র জেল সুপার মো. শফিকুল ইসলাম খান রায় প্রদানকারী চট্টগ্রামের আদালতের নজরে আনেন বিষয়টি। এরপর মিনুকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেয়া হলে পরদিন ২২ মার্চ কারাগার থেকে মিনুকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত ১৬ জুন মিনু কারাগার থেকে মুক্তি পান।

শুধু মিনু আক্তারই নয়, নামের মিলের কারণে চট্টগ্রাম কারাগারে অন্যের হয়ে সাজাভোগ করেন হাসিনা বেগমও। তিনি কারাগার থেকে দীর্ঘ ১ বছর ৪ মাস ২০ দিন পর মুক্তি পান। ২০১৭ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কর্ণফুলী থানার মইজ্জারটেকে ২ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের হয়। সাজাপ্রাপ্ত আসামি হাসিনা আক্তার ২০১৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে কারাগারে যান। হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে একই বছর ২৭ নভেম্বর জামিনে গিয়ে পলাতক হন। ২০১৯ সালের ১ জুলাই পলাতক থাকা আসামিদের অনুপস্থিতিতে চট্টগ্রাম অতিরিক্ত মহানগর ৫ম আদালতের বিচারক জান্নাতুল ফেরদাউস চৌধুরী রায়ে ৬ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো এক মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন।

পরবর্তীতে টেকনাফ থানা পুলিশ ২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর টেকনাফের চৌধুরী পাড়ার হোসন বর বাড়ি থেকে নামের সাথে সাজাপ্রাপ্ত আসামির নামের একাংশের মিল থাকায় হাসিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করে। এই মামলায় এরপর থেকে জেল খাটেন হাসিনা। বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হলে আদালত টেকনাফ থানাতে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দেন। আদালতের চাওয়া সেই অনুসন্ধান প্রতিবেদন ২ মে আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

সাবেক ওসি প্রদীপ দম্পতি

কক্সবাজারের টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও তার স্ত্রী চুমকির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। একইসঙ্গে পলাতক চুমকি কারণের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া প্রদীপের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন বিচারক। আগামী ১৭ জানুয়ারি সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, প্রদীপ ও তার স্ত্রীর নামে থাকা সম্পত্তি ইতিপূর্বে আদালত ক্রোক করেছেন। চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটায় থাকা ছয়তলা বাড়ি, ষোলশহরের বাড়ি, একটি করে কার ও মাইক্রোবাস এবং কক্সবাজারের একটি ফ্ল্যাটে রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে রিসিভার নিয়োগ করা হোক।

গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রদীপ-চুমকির মালিকানায় থাকা চার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন আদালত। প্রদীপ ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে চার কোটি ছয় লাখ ৭৮ হাজার ৭৯ টাকার সম্পদ অর্জন করে স্ত্রীর নামে হস্তান্তর ও স্থানান্তর করেছেন- এ অভিযোগে দুদক তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল।

কওমি অঙ্গনে শোকের ছায়া

বিগত ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৯ নভেম্বর। মাত্র এক বছর দুই মাসে বছর ঘুরতেই একে একে চলে গেলেন কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন বলে দাবিদার হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের চার শীর্ষ আলেম। এতে করে সংগঠনটির নেতৃত্বে অপূরণীয় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। যেসব শূন্যতা কখনও পূরণ হওয়ার মতো নয় বলে জানিয়েছে সংগঠনটির নেতারা। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যু দিয়ে কওমি অঙ্গণে শোকের ছায়া নামে।

আল্লামা আহমদ শফীর মৃত্যুর পর গত বছরের ১৫ নভেম্বর হেফাজতে ইসলামের কাউন্সিলে সাবেক মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে সংগঠনটির নতুন আমির এবং ঢাকার জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীকে মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়। এক মাসের মাথায় ১৩ ডিসেম্বর আল্লামা কাসেমী না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। এরপর ২৬ ডিসেম্বর সংগঠনটির মহাসচিব নির্বাচিত হন ঢাকার খিলগাঁও আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাখজানুল উলুম মাদ্রাসার মহাপরিচালক মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদী।

শীর্ষ দুই আলেমের শোক কাটতে না কাটতে ২০২১ সালের ১৯ আগস্ট হেফাজতের সাবেক আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর হেফাজতের আমির হন বাবুনগরীর মামা চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসার পরিচালক আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। তার বয়স নব্বইয়ের বেশি। আমির হওয়ার পর দুইবার তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তবে বর্তমানে তিনি অনেকটা সুস্থ। এর মধ্যে ২৯ নভেম্বর রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা নুরুল ইসলাম জিহাদী।

দেশের কওমি অঙ্গনের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হাটহাজারী দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদারাসা। হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পর তিন সদস্যের শুরা কমিটির নেতৃত্বে হাটহাজারী মাদারাসাটি পরিচালিত হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব নেন প্রয়াত জুনায়েদ বাবুনগরী। কিন্তু বাবুনগরী মারা গেলে মাদরাসা পরিচালনায় আবার নতুন করে সংকট সৃষ্টি হয়। ফলে নতুন করে আলোচনায় আসে মাদারাসার মহাপরিচালক নির্বাচনের বিষয়টি। ৮ সেপ্টেম্বর যখন বহুল কাঙ্কিত হাটহাজারী মাদরাসার শুরা কমিটির বৈঠকে যখন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মুফতি আব্দুস সালাম চাটগামীকে মহাপরিচালক ঘোষণা করা হয়। তার পরপরই অসুস্থ হয়ে তিনি মৃত্যবরণ করেন।

এছাড়া নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের মার্চের ২৫, ২৬ ও ২৭ তারিখ দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৭ জন মারা যান। এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলায় হেফাজতের অর্ধশতাধিক নেতা গ্রেফতার হন। তাদের অনেকেই এখনও কারাগারে রয়েছেন।

চট্টগ্রামের ‘ফুসফুস’ নিয়ে টানাটানি

চট্টগ্রাম নগরীর সিআরবি ভবনকে ঘিরে রয়েছে শতবর্ষী গাছগাছালি আর ছোট-বড় পাহাড়-টিলা। প্রাকৃতিক এই পরিবেশকে নগরবাসী চট্টগ্রামের ‘ফুসফুস’ বলে থাকেন। কিন্তু এখানে বড়সড় একটি হাসপাতাল নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু করে সেই ‘ফুসফুস’ ধ্বংসের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত শতাব্দি প্রাচীন সুউচ্চ বৃক্ষরাজি ঘেরা এলাকায় ৫শ’ শয্যার হাসপাতাল ও ১শ’ আসনের কলেজের মতো একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণের এমন উদ্যোগে চট্টগ্রামে সর্বমহলে ব্যাপক ক্ষোভ, অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর সিআরবি এলাকায় বেসরকারি হাসপাতাল নির্মাণ বন্ধ ও বাংলাদেশ রেলওয়ে-ইউনাইটেড হাসপাতালের চুক্তি বাতিলের দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ৯ সংগঠনের উদ্যোগে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়াও গত ২৪ জুলাই সিআরবিতে পিপিপি’র হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণের চুক্তি বাতিলের দাবিতে চট্টগ্রামের ১০১ জন বিশিষ্ট নাগরিক বিবৃতি দিয়েছেন।

প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন সংগঠনের আয়োজনে সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের বিরুদ্ধে সমাবেশ করছেন। পরিবেশবাদী সংগঠনের পাশাপাশি সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ঐতিহ্য ও পরিবেশ বিধ্বংস এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তাদের দাবি সেখানে হাসপাতাল হলে বৃক্ষরাজি আর সবুজ বন ধ্বংস হয়ে যাবে। পৌনে এক কোটি মানুষের এই নগরীতে নান্দনিক উম্মুক্ত সবুজ চত্বর বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। কালের সাক্ষী অবিভক্ত ভারতের আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দপ্তর সিআরবি ভবনটি হয় ১৮৯৫ সালে। শতবর্ষী বৃক্ষরাজি, পাহাড়, টিলা ও উপত্যকা ঘেরা এই এলাকাটি হরেক প্রজাতির পাখ-পাখালি ও প্রাণির আবাস।

ফ্লাইওভারের পিলারে ফাটল

২৫ অক্টোবর বহদ্দারহাট এম এ মান্নান ফ্লাইওভারের আরাকান সড়কমুখী মদিনা হোটেলের সামনে পাশাপাশি দুটি র্যাম্পের পিলারে ওপরের অংশে বেশ বড় ধরণের ফাটল দেখতে স্থানীয়রা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ফাটলের বেশ কয়েকটি ছবি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণের ৪ বছরের মাথায় ফ্লাইওভারের এমন অবস্থায় ঘটনাটি হয়ে ওঠে টক অব দ্যা টাউন।

পরদিন সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান ফ্লাইওভারের রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী। নির্মাণে ত্রুটি থাকার কারণে এই ফাটল দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অন্যদিকে প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে এই ফাটল দেখা দিয়েছে। যদিও শুরু থেকেই একে তেমন কোনো সমস্যা বলে মনে করেনি সিডিএ’র প্রকৌশল বিভাগ। এ ঘটনার মাস ঘুরতেই আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারে ফাটলের ছবি ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই নিয়েও কোনও বক্তব্য দেয়নি সিডিএ ও ওয়াসা। এছাড়া দেওয়ান হাট ব্রিজও ঝুঁকিপূর্ণ বলে উঠে আসে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে।

অরক্ষিত নালায় পড়ে একের পর এক মৃত্যু: দোষ চাপিয়ে দায় সারছে কর্তৃপক্ষ

চট্টগ্রাম নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় অন্তত দেড় শতাধিক ড্রেন রয়েছে। যার পুরোটাই অরক্ষিত। এছাড়া রয়েছে ছোট বড় অসংখ্য খাল। এসব খালের পাশেও নেই কোন সীমানা দেয়াল। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই পানিতে তলিয়ে যায় রাস্তাঘাট। ফলে অসাবধানতাবশত ড্রেন কিংবা খালে পড়ে মারা যাচ্ছে কেউ না কেউ। আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণও করছেন অনেকে। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অরক্ষিত ড্রেন ও খালে পড়ে মারা গেছেন ৫ জন। আর নিখোঁজ রয়েছেন একজন। আহত হয়ে পঙ্গু হয়েছেন একজন। বাকিরা চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলেও আজো সেসব দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন।

চলতি বছরের সর্বশেষ ঘটনা ৩ ডিসেম্বর চিটাগং শপিং কমপ্লেক্সের বিপরীতে ভূমি অফিসের সামনে চশমা খালে সাঁতার কাটতে গিয়ে ময়লাযুক্ত পানিতে ভেসে যায় ১০ বছরের শিশু মো. কামাল উদ্দিন। তিনদিন পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে নগরীর ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদ শেখ মুজিব সড়কে মাজারগেট এলাকায় নালায় পড়ে নিখোঁজ হন সেহেরীন মাহবুব সাদিয়া (১৯)। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিদলের সদস্যরা নালা থেকে সাদিয়ার মৃতদেহ উদ্ধার করেন।

২৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর সদরঘাট থানার মাঝিরঘাট রোডের ড্রেন থেকে অজ্ঞাত (বয়স আনুমানিক ৩৫) এক পুরুষের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের অভিমত, ড্রেনে পড়ে গিয়ে উঠতে না পেরে মারা গেছেন অজ্ঞাত এই পথচারী। এছাড়া গত ২৫ আগস্ট মুরাদপুর এলাকায় রাস্তার পাশে ড্রেনে পড়ে তলিয়ে যান সালেহ আহমেদ নামে এক সবজি ব্যবসায়ী। যার মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এখনও।

গত ৩০ জুন বেলা সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর ২ নম্বর গেট মেয়র গলিতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা খালে পড়ে নিহত হন খাতিজা বেগম (৬৫) ও সিএনজিচালিত অটোচালক মো. সুলতান (৩৮)। তবে এ ঘটনায় অটোতে বাকি তিনজনকে উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। দুই নম্বর গেট মেয়র গলির টিঅ্যান্ডটি কলোনি এলাকা থেকে ডাক্তার দেখানোর জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে মোট চারজন বের হন। এ সময় বাসা থেকে রওনা দিতেই অটো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের খালের পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ড্রেনের পানিতে ডুবে মারা যান ২ জন।

এসব দুর্ঘটনার পর একে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে দায় সেরেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এ নিয়েও দুই সংস্থার দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়।

স্বর্ণ চোরাচালানের বড় ঘাঁটি চট্টগ্রাম বিমানবন্দর

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানের বড় ঘাঁটি। বছরজুড়ে শুল্ক গোয়েন্দারা চোরাচালানের স্বর্ণ জব্দ করছেন। বাহকদের তুলে দিচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। মামলা হচ্ছে, তদন্ত হচ্ছে। কিন্তু চোরাচালানের মূল হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে। বিমানের সিট-টয়লেট, লাগেজ, চার্জার লাইট, জুতাসহ যাত্রীর পেটের ভেতরেও মিলছে স্বর্ণ। একটি টিকিট বা কিছু টাকার বিনিময়ে স্বর্ণের চোরাচালান বহন করে নিয়ে আসছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীরা। আর এ স্বর্ণ চট্টগ্রামের রেয়াজুদ্দীন বাজার ও খাতুনগঞ্জে প্রবেশ করছে। যা পাচারে সহায়তা করেন বিমানের পাইলট ও ক্রুরা। রেয়াজুদ্দীন বাজার ও খাতুনগঞ্জ হয়ে কুমিল্লা বা ফেনীর সীমান্তপথে এসব স্বর্ণের চালান চলে যাচ্ছে ভারত ও দেশের অন্যান্য জায়গায়।

বছরের প্রথম স্বর্ণের চালান আটক করা হয় ২২ ফেব্রুয়ারি। কাস্টমস, শুল্ক গোয়েন্দা ও এনএসআই কর্মকর্তারা যৌথভাবে বিমান বাংলাদেশের একটি বিজি-১২৮ ফ্লাইট থেকে ১৭ কেজি ৪শ’ গ্রাম ওজনের প্রায় ১০ কোটি টাকার স্বর্ণের বার উদ্ধার করে। ওইদিন সকালে আবুধাবি থেকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে ছেড়ে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্সের ফ্লাইটটিতে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণবার রয়েছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালায় কাস্টমস, শুল্ক গোয়েন্দা এবং এনএসআই কর্মকর্তারা। তল্লাশির এক পর্যায়ে ফ্লাইটটির ১৮ এফ সিট ও ২৬ এ সিটের কুশনের নিচে এসি প্যানেল থেকে বিশেষ দুটি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়। পরে প্যাকেট দুটি থেকে ১৭ কেজি ৪শ’ গ্রাম ওজনের প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যমানের স্বর্ণেরবার উদ্ধার করা হয়। তবে কাউকে আটক করা যায়নি।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাই ফেরত আরেক যাত্রীর কাছ থেকে ৮২টি স্বর্ণের বার জব্দ করে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও শুল্ক তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। নয় কেজি ৫৯ গ্রাম ওজনের ওই চালানে জব্দকৃত স্বর্ণের বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ওইদিন সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-১৪৮ ফ্লাইটে মো. এনামুল হক নামের ওই যাত্রী শাহ আমানতে অবতরণ করেন। বিমাবন্দরের বোর্ডিং ব্রিজের কাছে তার গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে তাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। এরপর তাকে তল্লাশি করে পরনের শার্টের নিচে পেটের সঙ্গে বিশেষ কায়দায় বাঁধা অবস্থায় স্বর্ণের বারগুলো পাওয়া যায়। তার গ্রামের বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়ায়।

গত ৯ অক্টোবর ৯ কেজি ২৮০ গ্রাম ওজনের ৮০টি স্বর্ণের বার জব্দ করা হয়। যার মূল্য ৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ২৩ নভেম্বর সকালে শাহ আমানত বিমানবন্দরে দুবাই থেকে ছেড়ে আসা বিমানের একটি ফ্লাইটের যাত্রীর কাছ থেকে ৪ কেজি একশ’ গ্রাম ওজনের স্বর্ণ জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দারা। জব্দকৃত স্বর্ণের বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা শুল্ক অধিদপ্তর থেকে দাবি করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় অবৈধ স্বর্ণের বার বহনকারী দুবাই ফেরত লোহাগাড়ার বাসিন্দা মো. সোহেলকে (২৮)। এ ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করে সোহেলকে পতেঙ্গা থানায় হস্তান্তর করা হয়।

সর্বশেষ ১৮ ডিসেম্বর সকালে দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট থেকে ১০ কেজি ওজনের ৮৬টি স্বর্ণের বার জব্দ করে শুল্ক ও গোয়েন্দা অধিদফতরের কর্মকর্তারা। যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় সাত কোটি টাকা।

জাহাজ ভাঙা শিল্পে ১২ শ্রমিকের মৃত্যু

বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। যার কারণে এ শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ২০২১ সালে ১২ শ্রমিক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন এবং ৩০ জনের বেশি শ্রমিক আহত হয়েছেন। বছরের পর বছর জাহাজ ভাঙা শিল্পখাতে দুর্ঘটনা এবং শ্রমিকের মৃত্যুর হার ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেলেও এর জন্য দায়ী মালিক বা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বাংলাদেশে বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো সুবিধাও জাহাজ ভাঙা শিল্পের শ্রমিকরা পাচ্ছে না।

জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জাহাজ কাটার আগে বর্জ্য, বিষাক্ত গ্যাস এবং বিস্ফোরকমুক্ত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। ভৌগলিক সুবিধার কারণে বিশ্বের বেশিরভাগ বড় জাহাজ এখানে কাটা হয়। কিন্তু বড় জাহাজ কাটার জন্য যে ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা প্রয়োজন, অধিকাংশ ইয়ার্ডে তা ব্যবহার করা হয় না। শ্রম আইনের ৯০ (ক) ধারামতে, বাধ্যতামূলক হলেও এখনও কোনো ইয়ার্ডে সেফটি কমিটি গঠন করা হয়নি। ফলে প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকরা কাজ করছে। জাহাজ ভাঙা শ্রমিকদের কর্মস্থান আজ কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। যার সর্বশেষ শিকার যমুনা শিপ ইয়ার্ডের ৪ হতভাগ্য শ্রমিক।

চট্টগ্রাম ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’

করোনার সঙ্কটকালেও থেমে ছিলো না চট্টগ্রামের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ। দিনরাতে চলেছে এ প্রকল্পের যাবতীয় কর্মযজ্ঞ। এটি চালু হলে শহর থেকে বিমানবন্দরে পৌঁছানো যাবে মাত্র ২০ মিনিটে। নগরজীবনে আসবে গতি। ২০২৩ সালের মধ্যেই চালু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)।

কিন্তু এর টাইগারপাস প্রান্ত নিয়ে আপত্তি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) এবং নগরবিদদের একটি অংশের। উড়াল সড়কের কারণে শহরের সবচেয়ে নান্দনিক এই অংশটি ঢাকা পড়ে যাবে, এমনই অভিমত তাদের। তবে ওই এলাকাটিও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের আওতায় না আনলে সুফল পুরোপুরি মিলবে না বলে অভিমত প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা চউকের। এ নিয়ে চসিক ও চউক দুই প্রতিষ্ঠান দফায় দফায় আলোচনায় বসেও সমাধানে আসতে পারেনি।

বঙ্গবন্ধু টানেল

দেশের বড় কয়েকটি প্রকল্পের মধ্যে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেল অন্যতম। চলতি বছরের ৮ অক্টোবর টানেলের দ্বিতীয় টিউবের খনন কাজ শেষ হয়। এতে দুই পারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন দৃশ্যমান হয়। এ বছর টানেলের কাজের প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হলেও নির্ধারিত সময়ের চেয়ে আরও ৬ মাস বেশি মেয়াদ বাড়াতে চায় কর্তৃপক্ষ।

আগামী ২০২২ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র টানেল দেশ হিসাবে গিনেস বুকে নাম লেখাবে বাংলাদেশ। এটি যুক্ত হবে ট্রান্স এশিয়া সড়কের সঙ্গে। কক্সবাজারের সঙ্গে কমবে ৪০ কিলিমিটার দূরত্ব। সেইসঙ্গে বাস্তবায়ন হবে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ পরিকল্পনা। কর্ণফুলী টানেল নির্মাণকে ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে গড়ে ওঠছে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল। কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে আনোয়ারায় গড়ে উঠেছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড)।

এ টানেলের মধ্যদিয়ে দুই পাড়ের সেতুবন্ধন রচিত হবে। শিল্পায়নের ফলে এ অঞ্চলের লাখো মানুষের ভাগ্য বদলে যাবে। টানেল ঘিরে এখনই ব্যবসায়ীরা দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পকারখানার স্থাপনের জন্য জমি কিনতে শুরু করেছেন। আগে থেকে কোরিয়ান ইপিজেড এ পুরোদমে চলছে শিল্পায়ন কর্মকাণ্ড। একইসঙ্গে শঙ্খ নদী মোহনা এলাকায় গড়ে উঠছে বেসরকারি বিভিন্ন মেগা শিল্প কারখানা।