,

আইএমএফের নতুন ঋণেও পুরোনো শর্তের চাপ

news-image

অনলাইন ডেস্ক : দেশের অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদার করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে নতুন করে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে নতুন ঋণ কর্মসূচিতে অর্থের পরিমাণের পাশাপাশি রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, ভর্তুকি কমানো ও বিনিময় হার ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তিন বছর মেয়াদি নতুন ঋণ কর্মসূচির চুক্তি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। এ নিয়ে গত মে মাস থেকে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। ঋণের পরিমাণ, সংস্কারের ধরন এবং সেগুলো বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দর-কষাকষি চলছে।
আগামীকাল সোমবার থেকে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হতে যাওয়া আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সাত দিনব্যাপী বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের ঋণ কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল এতে অংশ নেবে। এ ছাড়া আগামী নভেম্বরে আইএমএফের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করতে পারে। ওই সফরে সংস্কার পরিকল্পনা ও ঋণের শর্ত চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন কর্মসূচিতে আগের ঋণের বেশ কিছু শর্ত আবারও সামনে আসতে পারে। বিশেষ করে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করা, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি ভর্তুকির ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের বিষয়ে সংস্থাটি গুরুত্ব দিতে পারে। আগের কর্মসূচিতে এসব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় নতুন ঋণ পেতে সরকারকে সংস্কার বাস্তবায়নের দৃশ্যমান প্রমাণ দিতে হতে পারে।
অর্থনীতির স্বার্থেই সংস্কার জরুরি
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব মনে করেন, আইএমএফের ঋণ পাওয়ার বিষয়টির বাইরে গিয়েও ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কারকে দেশের নিজস্ব প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
তাঁর মতে, এসব সংস্কার শুধু আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্ত পূরণের জন্য নয়; বরং দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ও গতিশীল রাখার জন্যও প্রয়োজন। আইএমএফ ঋণ দিক বা না দিক, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পরিবর্তন আনা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সংস্কার বাস্তবায়নে আইএমএফের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সব লক্ষ্য অর্জন করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হতে পারে। তবে সরকারকে এমন পরিকল্পনা দিতে হবে, যাতে সংস্কারের অগ্রগতি ও বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে সংস্থাটিকে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া যায়।
আগের ঋণের শর্ত আবারও আলোচনায়
বাংলাদেশের আগের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির পরিমাণ প্রথমে ছিল ৪৭০ কোটি ডলার। পরে তা বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। ওই কর্মসূচিতে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং ভর্তুকি কমানোর মতো শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে সব সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, নতুন কর্মসূচিতেও বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা, রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম পৃথক করা, করছাড় যৌক্তিক করা, দেউলিয়া আইন প্রণয়ন এবং সরকারি ভর্তুকি কমানোর বিষয়গুলো আলোচনায় রয়েছে। তবে আগের কর্মসূচির সব শর্ত নতুন ঋণে একইভাবে যুক্ত হবে কি না, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড রিসার্চের (পিটিআর) চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মাজেদুল হকের ধারণা, নতুন ঋণ কর্মসূচিতেও আগের শর্তগুলোর বড় অংশ বহাল থাকতে পারে। তাঁর মতে, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করা এবং ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কারের ক্ষেত্রে আইএমএফ সহজে ছাড় নাও দিতে পারে।
তিনি জানান, আগের কর্মসূচিতে প্রতিবছর কর-জিডিপি অনুপাত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ানোর লক্ষ্য দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। ফলে রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ব্যাংক খাতের সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলে নতুন ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তাঁর ধারণা, নতুন কর্মসূচিতে আগের শর্তগুলোর প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ আবারও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে ভর্তুকির পরিমাণ ও খাতভিত্তিক সমন্বয় নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ থাকতে পারে।
রাজস্ব আদায় বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন ঋণ কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও অন্যান্য জরুরি খাতে ব্যয় করার ক্ষেত্রে সরকারকে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়।
এ কারণে আইএমএফ শুধু তাৎক্ষণিকভাবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্য নয়, আগামী কয়েক বছরে কীভাবে রাজস্ব বাড়ানো হবে, তার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনাও দেখতে চাইছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। এই লক্ষ্য কীভাবে অর্জন করা হবে, সে বিষয়ে এনবিআরের কাছে বিস্তারিত জানতে চেয়েছে আইএমএফ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
করছাড় কমানো, করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়গুলোও আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম আলাদা করার প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা চলছে।
ব্যাংক খাত সংস্কারে বাড়তি গুরুত্ব
খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, দুর্বল সুশাসন এবং ঋণ আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা দেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম সমস্যা। এসব কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আগের ঋণ কর্মসূচিতেও ব্যাংক খাত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ছিল। তবে খাতটির দুর্বলতা কাটাতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন কর্মসূচিতে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণ, খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন ঘাটতি কমানো এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। এ ক্ষেত্রে শুধু সংস্কারের ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিমাপের কার্যকর ব্যবস্থাও প্রয়োজন হবে।
ভর্তুকি কমানোর চাপে সরকার
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে সরকারি ভর্তুকি বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান পূরণ করতে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। এতে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার মতো অন্যান্য খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
আগের ঋণ কর্মসূচিতেও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল। নতুন কর্মসূচির আলোচনাতেও এ বিষয়গুলো থাকতে পারে।
তবে ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্তের প্রভাব সাধারণ মানুষ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর পড়তে পারে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পণ্যমূল্যে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা কমে গেলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোও চাপে পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে ভর্তুকির অপচয় কমানোর পাশাপাশি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিনিময় হার ও দেউলিয়া আইনেও পরিবর্তনের আলোচনা
নতুন ঋণ কর্মসূচিতে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনাকে আরও বাজারভিত্তিক করার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিময় হার নির্ধারণে বাজারের ভূমিকা বাড়ানো এ সংস্কারের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এর পাশাপাশি দেউলিয়া আইন প্রণয়নের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, পাওনাদারদের অধিকার রক্ষা এবং আর্থিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এসব সংস্কারের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। ঋণের পরিমাণ, শর্ত এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়ে সরকার ও আইএমএফের আলোচনার ওপরই নতুন কর্মসূচির চূড়ান্ত রূপ নির্ভর করছে।

 

এ জাতীয় আরও খবর

দিল্লিতে অপ্রয়োজনীয় ব্যারিকেড সরানোর নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের

আইপিইউ তদন্তে আ. লীগের অভিযোগের সত্যতা মেলেনি: স্পিকার

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় জয়ের লক্ষ্য বিএনপির

রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় নিহত ১২, বাংলাদেশি দুজন

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর শুরু ২৬ অক্টোবর

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় জয়ের লক্ষ্য বিএনপির

গর্ডনের গোলে শুরু, গেতাফেকে ৩-০ ব্যবধানে হারাল বার্সেলোনা

সৌদি আরবের পাশে থাকার অঙ্গীকার পাকিস্তানের

যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলায় একই পরিবারের আটজন নিহত

সোমবার থেকে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ শুরু

আর্জেন্টিনাকে বিদায়ের পরই মেসির জোড়া গোল

রাতেই মুক্তি পান ধ্রুব রাঠি, জানাল পুলিশ