ইউরোপে যুদ্ধের দামামা: খাবার ও পানি মজুতের নির্দেশ, প্রস্তুত হচ্ছে হাসপাতাল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ ও বড় ধরনের সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতিও জোরদার হচ্ছে। কোথাও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা বাড়ানো হচ্ছে, কোথাও হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। সাধারণ নাগরিকদেরও জরুরি পরিস্থিতির জন্য খাবার ও পানি মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
চলতি সপ্তাহে বেলারুশ সুওয়ালকি গ্যাপের কাছে বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালিয়েছে। পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যবর্তী প্রায় ৬৫ মাইল দীর্ঘ এই সীমান্তপথটি ন্যাটোভুক্ত বাল্টিক দেশগুলোর সঙ্গে জোটের অন্য সদস্যদের স্থল যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ।
কৌশলগত অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই অঞ্চলটি ইউরোপের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছে।
রাশিয়ার সম্ভাব্য হাইব্রিড হামলা নিয়েও ইউরোপের দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়ছে। সাইবার হামলা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, ড্রোনের ব্যবহার এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার মতো কর্মকাণ্ডকে এই ঝুঁকির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের গোয়েন্দা ব্রিফিংয়ে ডেকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় নতুন পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়া কোনো ন্যাটো সদস্যের বিরুদ্ধে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সেটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করতে পারে।
যুক্তরাজ্যেও সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাধারণ মানুষকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে। টিনজাত খাবার, পানীয় জলসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী হাতে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দেশটির প্রতিরক্ষা নেতৃত্ব ইউরোপের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে সাম্প্রতিক কয়েক দশকের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
সম্ভাব্য বড় ধরনের হামলা বা সংকটে বিপুলসংখ্যক আহত মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে জার্মানির হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসও ইউরোপের স্বাধীনতা ও শান্তি রক্ষায় বর্তমান সময়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।
সুইজারল্যান্ড ঐতিহাসিকভাবে নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও তারাও নিরাপত্তা প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে। নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে সশস্ত্র হামলা মোকাবিলার সক্ষমতা এবং দেশের সামগ্রিক প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পোল্যান্ডে স্থায়ী মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন।
তবে একই সময়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক নিরাপত্তা অগ্রাধিকার রয়েছে। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগ শুধু সরাসরি সামরিক হামলা নিয়ে নয়। সাইবার আক্রমণ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থায় নাশকতা, ড্রোন হামলা কিংবা পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানোর মতো ঘটনাও এখন নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পর্যায়ে না গিয়েও একটি দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে আরও একটি বিষয় দেখিয়েছে—যুদ্ধের সময় শুধু সেনাবাহিনী ও অস্ত্র থাকলেই হয় না। বিদ্যুৎ, পানি, হাসপাতাল, যোগাযোগ, পরিবহন ও সরকারি সেবা সচল রাখার সক্ষমতাও জরুরি।
রাশিয়ার হামলার মধ্যেও ইউক্রেন কীভাবে জরুরি নাগরিক সেবা চালু রেখেছে, তা ন্যাটোর কর্মকর্তারা গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন।
ন্যাটোর সাম্প্রতিক প্রস্তুতি পরিকল্পনাতেও বেসামরিক নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংকট বা সংঘাতের সময় সরকারব্যবস্থা, জ্বালানি, খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থা সচল রাখার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ যুদ্ধের প্রস্তুতি এখন শুধু সামরিক বাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একটি দেশের পুরো সমাজ ও গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক অবকাঠামোকে সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রাখার বিষয়টিও এর অংশ হয়ে উঠেছে।
রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধেই ব্যস্ত। তবে ইউরোপের দেশগুলোর আশঙ্কা, ভবিষ্যতে উত্তেজনা বাড়লে সংঘাত শুধু প্রচলিত যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।
সাইবার হামলা, নাশকতা, ড্রোন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ধাপে ধাপে চাপ বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে বিভিন্ন দেশ।
তবে এসব প্রস্তুতিকে সরাসরি ইউরোপে যুদ্ধ আসন্ন হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। বরং ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো।
স্নায়ুযুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় ইউরোপের অনেক দেশ সামরিক ও বেসামরিক প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতে তুলনামূলক কম গুরুত্ব দিয়েছিল। ইউক্রেন যুদ্ধ সেই ধারণায় বড় পরিবর্তন এনেছে। এখন খাবার-পানি থেকে হাসপাতাল, বিদ্যুৎ থেকে যোগাযোগ—সবকিছুকেই নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।











