,

দুবলারচরে জমজমাট শুঁটকি বাণিজ্য, ন্যায্য দাম নিয়ে জেলেদের ক্ষোভ

news-image

অনলাইন ডেস্ক : বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে সুন্দরবনের দক্ষিণে অবস্থিত দুবলারচর। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই বিচ্ছিন্ন চর পরিণত হয় কর্মচঞ্চল শুঁটকিপল্লিতে। সাগর থেকে মাছ আহরণ, বাছাই, শুকানো ও বাজারজাত—সব মিলিয়ে কয়েক মাস ধরে চলে বিশাল কর্মযজ্ঞ।

ভোর হতেই জেলেরা নৌকা নিয়ে সাগরে ছুটে যান। কেউ মাছ নিয়ে ফেরেন, কেউ তা বাছাই করেন, আবার কেউ চাতালে মাছ শুকাতে দেন। লইট্টা, ছুরি, রূপচাঁদা, তেলফ্যাসাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বাঁশের মাচা ও চাতালে শুকিয়ে তৈরি করা হয় শুঁটকি।

পাঁচ মাসের মৌসুমি জীবন : অক্টোবর-নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত দুবলারচরে জেলে, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা থাকে তুঙ্গে। পরিবারের কাছ থেকে দূরে থেকে কয়েক মাস এই চরে অবস্থান করেন তারা।

প্রতিদিনের জীবনে তাদের সঙ্গী থাকে উত্তাল সাগর, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা। মৌসুম শেষে এই সময়ের আয় দিয়েই অনেক পরিবার সারা বছরের খরচ চালানোর চেষ্টা করে।

বড় বাণিজ্য, সীমিত সরকারি সহায়তা : দুবলারচর থেকে উৎপাদিত শুঁটকি দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে সরবরাহ করা হয়। রংপুর, সৈয়দপুর, চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যায় এসব পণ্য।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে শুঁটকি আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে ৩ কোটি ২২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব এলেও শুঁটকি শিল্পের অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি সহায়তা এখনও সীমিত। অস্থায়ী ঘর, চাতাল ও মাছ শুকানোর মাচার বড় অংশই জেলে ও ব্যবসায়ীদের নিজ উদ্যোগে তৈরি করতে হয়।

দাদনের চাপে জেলেরা : শুঁটকি মৌসুমের আগে অনেক জেলে ও ব্যবসায়ী মহাজনদের কাছ থেকে দাদন বা অগ্রিম অর্থ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মাছ আহরণ ব্যাহত হলে সেই ঋণের বোঝা আরও বাড়ে।

জেলেদের একাংশের অভিযোগ, দাদন নেওয়ার কারণে তারা অনেক সময় নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীর কাছেই মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে বাজারদরের তুলনায় কম দাম পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক নথি বা লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভিযোগ : দুবলারচরের ব্যবসা ও কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে স্থানীয় জেলেদের একাংশ কামাল উদ্দিন আহমেদের নাম উল্লেখ করেছেন।

তাদের দাবি, মাছ বিক্রি ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এর বাইরে গিয়ে মাছ বা শুঁটকি বিক্রি করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে কামাল উদ্দিন আহমেদ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার বক্তব্য, জেলে ও অন্যান্য সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে এবং জেলেদের কাছ থেকে কোনো চাঁদা নেওয়া হয় না।

অভিযোগে উল্লেখ করা অন্য ব্যক্তিদের সবার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

লাইসেন্স নিয়ে প্রশাসনের বক্তব্য : বন বিভাগ জানিয়েছে, নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করে মৌসুমে মাছ আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতের অনুমতি নিতে হয়। চলতি মৌসুমে ১৫ জনকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানান।

দুবলারচর বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রহ্লাদ চন্দ্র রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, লাইসেন্সধারীরাই তাদের লোকজন নিয়ে ঘর নির্মাণ ও মাছ প্রক্রিয়াজাতের কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

তিনি আরও জানান, কোনো অনিয়মের বিষয়ে লিখিত বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চিকিৎসা ও পানির সংকট : এত বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিপরীতে দুবলারচরে স্থায়ী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নেই। গুরুতর অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা ঘটলে রোগীকে সাগর পাড়ি দিয়ে দূরের হাসপাতালে নিতে হয়।

জেলেদের অভিযোগ, নিরাপদ পানির সংকটও রয়েছে। কয়েক মাস ধরে হাজারো মানুষের বসবাসের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পানি, স্যানিটেশন ও চিকিৎসা সুবিধা পর্যাপ্ত নয়।

চরে কয়েকটি সাইক্লোন শেল্টার থাকলেও সেগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়েও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে।

বাজারদর জানতে নেটওয়ার্ক সমস্যা : মাছের প্রকৃত বাজারদর জানা জেলেদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে অনেক সময় তারা বিভিন্ন বাজারের দর সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পান না বলে অভিযোগ করেছেন।

জেলেদের ভাষ্য, বাজারদরের তথ্য না থাকলে কাঁচা মাছ বা শুঁটকি তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করার ঝুঁকি থাকে।

কামাল উদ্দিন আহমেদ অবশ্য নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণ হিসেবে টাওয়ারের জ্বালানি সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন।

বন রক্ষায় বাইরে থেকে নির্মাণসামগ্রী : দুবলারচরে অস্থায়ী ঘর ও মাছ শুকানোর অবকাঠামো তৈরিতে সুন্দরবনের গাছপালা ব্যবহারের অনুমতি নেই। তাই জেলেরা নিজ নিজ এলাকা থেকে বাঁশ, ছনসহ প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী নিয়ে আসেন।

মৌসুম শেষে এসব অস্থায়ী স্থাপনা গুটিয়ে তারা আবার নিজ এলাকায় ফিরে যান।

প্রতিদিন সাগরের সঙ্গে যুদ্ধ : দুবলারচরের জীবনযাত্রা অনেকটাই নির্ভরশীল আবহাওয়া ও সাগরের ওপর। মাছ ধরতে গিয়ে দুর্ঘটনা, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে।

আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তনও তাদের আয়-রোজগারে প্রভাব ফেলে। ফলে মাছের বাজারদর থেকে শুরু করে ঋণ, আবহাওয়া ও নিরাপত্তা—প্রতিটি বিষয়ই জেলেদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ।

সম্ভাবনার বড় জায়গা : শুঁটকি শিল্পকে আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা গেলে দুবলারচরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সম্প্রসারিত হতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

আধুনিক মাছ শুকানোর ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণাগার, নিরাপদ পানি, চিকিৎসা ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি রয়েছে তাদের।

ব্যবসায়ীদের মতে, এসব সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে দেশের বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও দুবলারচরের শুঁটকির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

হিসাবের পাশাপাশি দরকার নজরদারি : দুবলারচরের শুঁটকি শিল্প একদিকে যেমন হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস, অন্যদিকে তেমনি জেলেদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ জীবিকার ক্ষেত্র।

এই শিল্পের প্রকৃত অর্থনৈতিক চিত্র ও সুফল কারা কতটা পাচ্ছেন, তা স্পষ্ট করতে প্রয়োজন স্বচ্ছ আর্থিক হিসাব, বাজারব্যবস্থায় নজরদারি এবং জেলেদের অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাই।

জেলেদের নিরাপত্তা, ন্যায্য বাজারদর ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে দুবলারচরের শুঁটকি শিল্প আরও টেকসইভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।

এ জাতীয় আরও খবর

মা হওয়ার পর সৌন্দর্য নিয়ে যা বললেন ক্যাটরিনা

বাস-মিনিবাসের ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি

যে দোয়া আল্লাহর খুব প্রিয়

ইউরোপে যুদ্ধের দামামা: খাবার ও পানি মজুতের নির্দেশ, প্রস্তুত হচ্ছে হাসপাতাল

চলন্ত মেট্রোরেলের দরজা খুলে, ২৬ মিনিট বন্ধ ছিল চলাচল

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ড. খলিলুর রহমানের মতবিনিময়

দ্বিতীয়বার পাসপোর্ট হারালে দিতে হবে ১০ হাজার টাকা দণ্ড ফি

ভারতীয় রুপির বিপরীতে শক্তিশালী হচ্ছে বাংলাদেশি টাকা

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার চান এরদোগান

ঘরে বসেই মোবাইলেই খুঁজুন বাবা-দাদার জমির তথ্য

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সমর্থন ফ্রান্স যুক্তরাজ্য ও কানাডার

টাইফুন দুজুয়ানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯