অনলাইন ডেস্ক : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন হলেও তাদের দেওয়া সুপারিশ বাস্তবায়নে ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে। ফলে অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে বারবার একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সর্বশেষ গত শুক্রবার রাতে বিমানবন্দরের একটি লাউঞ্জে আগুন লাগে। এর আগে গত ৫ জুন কার্গো ভিলেজের ৯ নম্বর গেটের কাছে একটি বিদেশি কুরিয়ার সার্ভিসের মালামাল রাখার স্থানে আগুন ও ধোঁয়া দেখা দেয়। ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট প্রায় ১৪ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ওই ঘটনায় বড় ধরনের হতাহত হয়নি এবং বিমান চলাচলেও কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি।
জুনের ওই ঘটনার পর অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমাতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত শেষে কার্গো ও কুরিয়ার এলাকায় অগ্নিঝুঁকি কমাতে ১৭টি সুপারিশ দেওয়া হয়।
তদন্তে বৈদ্যুতিক স্থাপনার পাশে মালামাল রাখা, অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক লোড, নিম্নমানের ক্যাবল ও ওয়্যারিং, বিপজ্জনক পণ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা এবং নিরাপত্তা তদারকির ঘাটতিকে অগ্নিঝুঁকির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কমিটি দাহ্য ও বিপজ্জনক পণ্য আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও) ও আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (আইএটিএ) মানদণ্ড অনুযায়ী আলাদা করে সংরক্ষণ ও চিহ্নিত করার সুপারিশ করেছে। এসব পণ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ডেটাবেজভিত্তিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রধান ও বৈদ্যুতিক বিতরণ বোর্ড, সড়কবাতিসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক স্থাপনার অন্তত এক মিটারের মধ্যে কোনো মালামাল না রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি কার্গো ও কুরিয়ার এলাকার বৈদ্যুতিক অবকাঠামো নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ওয়্যারিং, ক্যাবল, বৈদ্যুতিক বোর্ড, আর্থিং ও বজ্রনিরোধক ব্যবস্থার নিয়মিত পরিদর্শনের সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন বা সংস্কার করা বৈদ্যুতিক স্থাপনায় ত্রুটিপূর্ণ তার থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে প্রয়োজন অনুযায়ী আর্ক-ফল্ট ডিটেকশন ডিভাইস ও সার্কিট সুরক্ষা ব্যবস্থা বসানোর কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া বৈদ্যুতিক ক্যাবল ও অন্যান্য সরঞ্জাম চুরি বা নাশকতা থেকে রক্ষায় পর্যাপ্ত আলো, নিয়মিত টহল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের সুপারিশ রয়েছে।
কার্গো গুদামে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা নিলামযোগ্য পণ্যকেও ঝুঁকি হিসেবে দেখেছে তদন্ত কমিটি। এসব পণ্যের নিলাম দ্রুত শেষ করার জন্য ঢাকা কাস্টমস হাউসকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিটি কার্গো ও কুরিয়ার ইউনিটে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম এমন জায়গায় রাখার কথা বলা হয়েছে, যাতে জরুরি মুহূর্তে কনটেইনার বা তালাবদ্ধ স্থাপনার বাইরে থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা যায়। পাশাপাশি নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্তে কয়েকটি কুরিয়ার সার্ভিসের বিরুদ্ধে অনুমোদন ছাড়া অস্থায়ী শেড নির্মাণ, সেখানে দাহ্য ও বিপজ্জনক পণ্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে রাখা এবং আগুন লাগার পর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।
বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমডর আবু সাঈদ মেহবুব খান জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব শাখাকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালনে কারও গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতাও বিমানবন্দরে বারবার আগুনের ঘটনাকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বিপুল পরিমাণ আমদানি পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই ঘটনার পর গঠিত একাধিক তদন্ত কমিটি বিভিন্ন সুপারিশ দিলেও সেগুলোর বড় একটি অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ফলে তদন্তের পর সুপারিশ এলেও তা দ্রুত বাস্তবায়ন না হওয়াই বিমানবন্দরের অগ্নিনিরাপত্তার বড় দুর্বলতা হিসেবে সামনে আসছে।