স্পোর্টস ডেস্ক : অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দীর্ঘ ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কঠিন এই সফরে দলের ব্যাটিং ও নেতৃত্ব—দুই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে থাকছেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের উন্নতির পেছনে শান্তর ব্যাটিং এবং বাস্তবধর্মী নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে দলের প্রস্তুতি খুব একটা আশাব্যঞ্জক হয়নি। ডারউইনে ১৩ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া প্রথম টেস্টের আগে একমাত্র প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের কাছে ইনিংস ও ৩৮ রানে হেরেছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হওয়ায় ব্যাটিং নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে।
প্রস্তুতি ম্যাচে শান্ত প্রথম ইনিংসে ৩৭ রান করলেও দ্বিতীয় ইনিংসে কোনো রান না করেই ফিরেছেন। তারপরও গত দেড় বছরের ব্যাটিং ফর্ম বিবেচনায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের সাফল্যে তার ব্যাটিং বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
চার নম্বরে ব্যাট করা শান্তকে অনেক সময় দলের টপ অর্ডারের দুর্বলতার কারণে নিজের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে লাগাম দিতে হয়। তবে মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে তার কার্যকর জুটি এবং লিটন দাসের ফেরায় মিডল অর্ডারে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে বাংলাদেশ।
শুধু ব্যাটিং নয়, নেতৃত্বেও নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন শান্ত। ১৯ টেস্টে অধিনায়ক হিসেবে আটটি জয় নিয়ে তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল টেস্ট অধিনায়ক হয়েছেন। এর আগে ৩৪ টেস্টে সাত জয় নিয়ে এই রেকর্ড ছিল মুশফিকুর রহিমের।
শান্তর নেতৃত্বের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া। সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদের মতে, মাঠের বাইরে শান্ত স্বভাবের হলেও মাঠে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন। জয়ের তীব্র মানসিকতা থেকেই তিনি আক্রমণাত্মক সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পান এবং সতীর্থদের ওপরও আস্থা রাখেন।
মাহমুদের সঙ্গে শান্তর সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। খেলোয়াড়ি জীবনের শুরু থেকেই তিনি শান্তর পরামর্শদাতা ছিলেন এবং ২০২৩ সালে তাকে অধিনায়ক করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে মাহমুদের পরামর্শ, নেতৃত্বের দায়িত্বের পাশাপাশি শান্তকে নিজের ব্যাটিংয়েও সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে। কারণ অধিনায়ক হিসেবে দলের ওপর প্রভাব রাখতে হলে একজন ব্যাটার হিসেবে রান করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কোচ সোহেল ইসলামের চোখেও শান্তর নেতৃত্ব দলের পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। তার মতে, কঠিন পরিস্থিতিতে সামনে থেকে দায়িত্ব নেওয়া, সতীর্থদের সঙ্গে পরিষ্কারভাবে যোগাযোগ করা এবং দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়ের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে তা জানিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে শান্তর।
পাকিস্তানের বিপক্ষে সাম্প্রতিক টেস্ট সিরিজেও শান্তর নেতৃত্বের ছাপ স্পষ্ট ছিল। পেস ও বাউন্স সহায়ক উইকেটে বোলারদের কার্যকরভাবে ব্যবহার করেন তিনি। বিশেষ করে দ্বিতীয় টেস্টে মাত্র ২৬৭ রানের লিড নিয়েই ইনিংস ঘোষণা করে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করেন। পেস ও স্পিনের সমন্বিত আক্রমণে শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত জয়ও পায় বাংলাদেশ।
অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের প্রতিও শান্তর আস্থা রয়েছে। মুমিনুল হক, তাইজুল ইসলাম ও মুশফিকুর রহিমের মতো ক্রিকেটারদের দায়িত্ব অনুযায়ী ব্যবহার করছেন তিনি। একই সঙ্গে নিজের ব্যাটিংয়ের দুর্বল জায়গাগুলো নিয়েও কাজ করে যাচ্ছেন।
অস্ট্রেলিয়া সফরে অবশ্য বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে শান্তর জন্য। চোটের কারণে দলের অন্যতম কার্যকর পেসার নাহিদ রানাকে পাওয়া যাচ্ছে না। শরিফুল ইসলামও প্রথম টেস্টে অনিশ্চিত। ফলে বোলিং আক্রমণেও চাপ তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে অলআউট হওয়া বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা হলেও কঠিন অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে দলের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব থাকবে শান্তর কাঁধেই।
ব্যাট হাতে রান, মাঠে সাহসী সিদ্ধান্ত এবং সতীর্থদের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা—অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশের সাফল্যের ক্ষেত্রে এই তিন জায়গাতেই শান্তর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।