অনলাইন ডেস্ক : স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় বিপুলসংখ্যক অভিবাসী প্রবেশের পর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত চার দিনে প্রায় ৬৯ হাজার ৫০০ অভিবাসীকে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে স্পেন সরকার।
সোমবার সেউতার একটি সমুদ্রসৈকতে শত শত অভিবাসী অস্থায়ীভাবে অবস্থান নেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সেউতায় প্রবেশ করেছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
এ ঘটনায় স্পেনের সীমান্ত এলাকায় ৭২ জন এবং মরক্কোর অংশে ১১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। সেউতায় আটকে থাকা অভিবাসীদের অনেকে খাবারের সংকটে পড়েছেন। দোকানপাট বন্ধ থাকায় তাদের দৈনন্দিন জীবন কঠিন হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে স্থানীয়দের বিরূপ আচরণ এবং স্পেনের মূল ভূখণ্ডে যেতে না পারায় তারা সেখানে আটকা পড়েছেন।
মরক্কোর ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত সেউতা ও মেলিয়া স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত ছিটমহল। ইউরোপে প্রবেশের আশায় অভিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে এসব সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করে আসছেন।
রয়টার্সের ভিডিওতে সেউতার এল ট্রাম্পোলিন সৈকতে শত শত অভিবাসীকে অবস্থান করতে দেখা গেছে। তাদের বেশির ভাগই সাব-সাহারান আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিক। ঠান্ডা বাতাস থেকে বাঁচতে অনেকে শরীরে তোয়ালে জড়িয়ে রেখেছিলেন। সৈকতসংলগ্ন সড়কে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যানবাহনও টহল দিতে দেখা যায়।
সেউতার প্রশাসনিক প্রধান হুয়ান জেসুস ভিভাস জানান, বর্তমানে ছিটমহলটিতে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার অভিবাসী অবস্থান করছেন। প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য থাকা দুটি অভ্যর্থনা কেন্দ্র ইতোমধ্যে ধারণক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে।
স্থানীয় কর্মকর্তা আলবার্তো গাইতান জানান, ৮৬২ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীর নিবন্ধন প্রক্রিয়া চলছে। আন্তর্জাতিক ও স্প্যানিশ আইনের অধীনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বহিষ্কারের ক্ষেত্রে বিশেষ সুরক্ষা রয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইউরোপজুড়ে অভিবাসনবিরোধী বক্তব্য আবারও জোরালো হয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সীমান্ত নীতি নিয়ে কূটনৈতিক টানাপোড়েনও বেড়েছে।
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস বলেন, অতীতে অন্য ইউরোপীয় দেশগুলো অভিবাসন সংকটে পড়লে স্পেন তাদের সহযোগিতা করেছে। এবার স্পেনও অংশীদার দেশগুলোর কাছ থেকে একই ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে। সংকট নিয়ে মঙ্গলবার ইইউভুক্ত দেশগুলোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠকও ডাকা হয়েছে।
মরক্কোর ভূমিকা নিয়ে স্পেনের বিভিন্ন মহলে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। আলবারেসের দাবি, সংকটের শুরু থেকেই মরক্কোর সীমান্ত পুলিশ সহযোগিতা করেছে এবং বেশির ভাগ অভিবাসীকে দ্রুত ফিরিয়ে নিতে দেশটি কোনো শর্ত দেয়নি।
তবে সেউতার প্রশাসনিক প্রধান ভিভাস মরক্কোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার অভিযোগ, মরক্কো এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে দিয়েছে, ফলে দেশটিকে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখা কঠিন।
অন্যদিকে মরক্কোর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য, মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা এবং স্পেনের একটি আদালতের রায় ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল পাইস ও কাদেনা সেরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির গোয়েন্দা মূল্যায়নে মরক্কোর পক্ষ থেকে গণহারে সীমান্ত পারাপারের সরাসরি পরিকল্পনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাটি ঠেকাতে দেশটি যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইজুড়ে মরক্কো ধীরে ধীরে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে। পরে দেশটির থ্রোন ডে উদযাপনকে ঘিরে বিপুলসংখ্যক মানুষ তারাখাল সীমান্তের দিকে এগিয়ে গেলে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে।
এদিকে স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মার্লাস্কা জানান, এত বড় সংখ্যায় অভিবাসী সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে—এমন কোনো আগাম সতর্কতা দেশটির বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা সিএনআই তাকে দেয়নি। এ ঘটনাকে ঘিরে স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মতবিরোধের খবরও সামনে এসেছে।
তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্গারিতা রোবলেস গোয়েন্দা সংস্থার কাছে আগে থেকে কোনো তথ্য ছিল কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, গোয়েন্দা কার্যক্রমের তথ্য গোপনীয় এবং সংকট মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।