,

সাক্ষ্যের আগে হুমকি, প্রলোভনের অভিযোগ

news-image

অনলাইন ডেস্ক : চট্টগ্রামে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে ছয়জন নিহতের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর আগেই কয়েকজন সাক্ষীকে হুমকি ও প্রলোভন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সাক্ষীদের দাবি, বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে তাদের সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের তথ্য উল্লেখ করে ভয় দেখানো এবং সাক্ষ্য থেকে সরে গেলে আর্থিক সুবিধা ও বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এই মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীসহ ২২ জন আসামি রয়েছেন। সাক্ষীদের অভিযোগের কেন্দ্রে ফজলে করিমের অনুসারীদের নাম উঠে এলেও এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ৬ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে আসামিপক্ষ ওই আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করায় সাক্ষ্যগ্রহণ পিছিয়ে যায়। আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর রিভিউ আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

মামলার কয়েকজন সাক্ষী জানিয়েছেন, তাদের কাছে বিদেশি নম্বর থেকে একাধিকবার ফোন এসেছে। ফোনদাতারা তাদের বাড়ির ঠিকানা, পরিবারের সদস্যদের নাম ও মোবাইল নম্বর পর্যন্ত উল্লেখ করেছেন। এতে সাক্ষীদের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে হুমকিদাতাদের কাছে পৌঁছেছে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সাক্ষী সম্রাট রোবায়েতের দাবি, তার আত্মীয়দের ফোন করে তাকে মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। সাক্ষ্য না দিলে আর্থিক সহযোগিতা এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি তার এক আত্মীয়কে গুরুতর হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে জানান রোবায়েত।

আরেক সাক্ষী আনিস আহমেদ জানান, দুবাইয়ের একটি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল করে তাকে সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়। তার পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্যও কলদাতার জানা ছিল বলে দাবি করেন তিনি। এ ঘটনায় ফারাজ করিমের সম্পৃক্ততার সন্দেহ প্রকাশ করলেও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার মতো প্রমাণের কথা জানাননি তিনি।

মামলার আরেক সাক্ষী রেজাউল করিমও বিদেশি নম্বর থেকে প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। নিজের ও অন্য সাক্ষীদের নিরাপত্তা চেয়ে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।

নারী সাক্ষী আচিয়া খাতুনও জানান, জর্ডানের একটি নম্বর থেকে ‘রহমান’ পরিচয়ে এক ব্যক্তি তাকে ফোন করেন। ফজলে করিমের বিরুদ্ধে কেন সাক্ষ্য দিচ্ছেন এবং এর বিনিময়ে কত টাকা পেয়েছেন—এমন প্রশ্ন করা হয় বলে দাবি তার। একই সঙ্গে জীবন রক্ষার জন্য সাক্ষ্য থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে সাক্ষী রোবায়েতকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের অভিযোগও উঠেছে। তার ছবি, মোবাইল নম্বর ও পরিচয় প্রকাশ করে তাকে ‘জঙ্গি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে কয়েকটি পোস্ট দেওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর বিদেশি নম্বর থেকে তাকে নিয়মিত ফোন করে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ফজলে করিমের আইনজীবী ব্যারিস্টার রিজওয়ানা ইউসুফ বলেছেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। সাক্ষীরা সত্যিই হুমকি পেয়ে থাকলে তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও অভিযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট থানা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, আইনে সাক্ষী সুরক্ষার বিধান থাকায় তাদের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সাক্ষীদের তথ্য কীভাবে হুমকিদাতাদের হাতে গেছে—এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর সেটি পাবলিক ডকুমেন্ট হিসেবে বিবেচিত হয় এবং আইন অনুযায়ী আসামিপক্ষও তা পাওয়ার অধিকার রাখে। তবে হুমকি বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার কোনো সুযোগ নেই।

মামলাটিতে বর্তমানে ফজলে করিম চৌধুরীসহ পাঁচজন আসামি কারাগারে রয়েছেন। অন্যদিকে ড. হাছান মাহমুদ, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ অধিকাংশ আসামি পলাতক রয়েছেন।

এ জাতীয় আরও খবর