,

আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অস্বস্তি কাটেনি

news-image

অনলাইন ডেস্ক : তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি। সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ও সুশাসন নিশ্চিত করা। তবে খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও দস্যুতার পাশাপাশি দলবদ্ধ সহিংসতার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে।

সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও বিভিন্ন সময়ে হামলার শিকার হচ্ছেন। রাজধানীতে একের পর এক বোমা উদ্ধারের ঘটনায় নিষিদ্ধ উগ্রপন্থি সংগঠনের তৎপরতা নিয়েও নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গত জুনে পুলিশ সদর দপ্তর সাতটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষের মধ্যে আস্থা ফেরানো ছিল এসব কমিটির অন্যতম লক্ষ্য। কমিটিগুলো প্রতিবেদন জমা দিলেও এর দৃশ্যমান প্রভাব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে এখনো খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

সরকারের বিশেষ অভিযানে রাজধানীর ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কিছুটা সাফল্য এসেছে। অনেক চাঁদাবাজ গ্রেপ্তার হয়েছে, আবার কেউ কেউ আত্মগোপনে চলে গেছে। তবে ছিনতাই, ডাকাতি, দস্যুতা ও মব ভায়োলেন্সের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ মব কালচার বা সংঘবদ্ধ সহিংসতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ দলবদ্ধভাবে হামলা চালিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে মব ভায়োলেন্সে ৩১ জন, জুনে ৩৩ জন, মে মাসে ৩২ জন, এপ্রিলে ২১ জন, মার্চে ১৯ জন এবং ফেব্রুয়ারিতে ১৮ জন নিহত হয়েছেন। এসব পরিসংখ্যানে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দলবদ্ধ সহিংসতার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

বর্তমান সরকারের সময় আলোচিত মব হামলার একটি ঘটনা ঘটে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে। গত ১১ এপ্রিল ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে দুই শতাধিক মানুষ পীর শামীম রেজা জাহাঙ্গীরের আস্তানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। পরে তাকে মারধর ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

এর আগে ৯ মার্চ গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গরু চুরির সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ১ মার্চ রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক আইনজীবীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটে। বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ছয় মাসের পরিসংখ্যানেও বিভিন্ন অপরাধের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মাসভেদে খুন, ডাকাতি ও দস্যুতা, অপহরণ, চুরি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। জুনে খুনের মামলা ৩২৬টিতে পৌঁছালেও জুলাইয়ে তা কিছুটা কমে ২৯৮টি হয়। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা জুলাইয়ে ২ হাজার ৩৩৬টিতে দাঁড়ায়।

তবে পুলিশের মামলাভিত্তিক পরিসংখ্যানকে অপরাধের পুরো চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এদিকে সাইবার অপরাধ ও অনলাইন প্রতারণাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স ও ভুয়া বিনিয়োগের নামে প্রতারণার অভিযোগের পাশাপাশি অনলাইন জুয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানোর ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি, টহল, চেকপোস্ট ও তথ্যভিত্তিক অভিযান জোরদার করা হয়েছে। অপরাধের কারণ ও অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, সরকার কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নিলেও কয়েকটি বিষয়ে আগের সরকারগুলোর মতোই ধীরগতির পথ অনুসরণ করেছে। ফলে নেওয়া উদ্যোগগুলো এখনো সাধারণ মানুষের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি তৈরি করতে পারেনি।

তবে সরকারের ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিবেদনে আইনশৃঙ্খলা ও সুশাসনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সাফল্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান, সীমান্তে নজরদারি ও টহল বৃদ্ধি, নদীপথে নিরাপত্তা জোরদার এবং রোহিঙ্গা শিবিরে অস্ত্র-মাদক চোরাচালান ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে