হাসিনার প্রত্যর্পণ চায় বাংলাদেশ, সম্পর্কেও নতুন বার্তা
আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া
আগস্ট ১১, ২০২৬
অনলাইন ডেস্ক : বাংলাদেশে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভারতের কাছ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ চেয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাক্ষাতে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি ছিল তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বৈঠক। আলোচনায় দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো সংলাপের মাধ্যমে সমাধান এবং ভবিষ্যৎমুখী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, জাতীয় মর্যাদা এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রত্যাশাও জানানো হয়েছে।
শুধু শেখ হাসিনা নন, শহীদ ওসমান হাদী হত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামিসহ ভারতে অবস্থানরত চিহ্নিত পলাতক অপরাধীদেরও দ্রুত প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা।
বৈঠক শেষে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচক হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য বা বিভিন্ন ইস্যু থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে সেগুলোর সমাধান সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
তার মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের প্রত্যাশা মূলত একটি—দুই দেশের মধ্যে ভালো সম্পর্ক। ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্কের কারণে দুই দেশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দীনেশ ত্রিবেদী আরও বলেন, দুই দেশের মধ্যে এমন কোনো সমস্যা নেই, যা আলোচনার টেবিলে বসে সমাধান করা সম্ভব নয়। সম্পর্ক ভালো হলে উভয় দেশই লাভবান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এর আগে রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। পরদিন প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গেও তার বৈঠক হয়। ধারাবাহিক এসব বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ঢাকা।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দিল্লি এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয় এবং তিনি আদালতে দণ্ডিত হন। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারত সরকারের কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানানো হলেও এখনো প্রত্যর্পণ সম্পন্ন হয়নি।
সম্প্রতি দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ঢাকা মনে করে, বিচারিক প্রক্রিয়ায় দণ্ডিত একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের শামিল।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়গুলো তারা বুঝতে পেরেছে বলে মনে হয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনো প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি হবে না—এমন প্রত্যাশা করছে ঢাকা।
শহীদ ওসমান হাদী হত্যা মামলার আসামিদের প্রসঙ্গেও ভারতের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেওয়া হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাদের দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে অতীতের মতপার্থক্য পেছনে রেখে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দুই দেশ পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। তাই সমতার ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ২০১৩ সালে দুই দেশের মধ্যে হওয়া প্রত্যর্পণ চুক্তির বিষয়টিও সামনে আনা হয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য একাধিকবার অনুরোধ করা হলেও এখনো ভারত থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ঢাকা।
অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি চিঠি দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ওই চিঠিতে আমন্ত্রণও রয়েছে। তবে বাংলাদেশ এখনো আমন্ত্রণ গ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় শেখ হাসিনাকে ভারতের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত ছিল। তার মতে, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে হলে এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয় যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পরিচালনা করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, পলাতক আসামিদের ফেরত পাঠানো এবং পারস্পরিক আস্থার সংকট দূর করার বিষয়গুলো এখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে দুই দেশই আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ককে নতুন ও ইতিবাচক পর্যায়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।