অনলাইন ডেস্ক : দেশের রাষ্ট্রীয় চিনি শিল্পকে আবারও শক্তিশালী ও লাভজনক অবস্থানে নিতে বহুমুখী পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. শামছুজ্জামান। তার মতে, শুধু চিনি উৎপাদনের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও বাই-প্রোডাক্ট উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্পটিকে সারা বছর সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মো. শামছুজ্জামান বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন প্রতিষ্ঠিত হলেও দেশের অনেক চিনিকল শত বছরেরও বেশি পুরোনো। এসব কারখানাকে আধুনিকায়নের পাশাপাশি কৃষক, শ্রমিক ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে চিনি শিল্পের যে সম্পর্ক রয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে ছয়টি চিনিকলে মাড়াই বন্ধ রয়েছে এবং নয়টি কারখানায় উৎপাদন চলছে। সাধারণত বছরে মাত্র তিন থেকে চার মাস আখ মাড়াই করা হয়। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বছরের অধিকাংশ সময় কারখানাগুলো চালু রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ জন্য সরিষার তেল, ফলের জুস, ম্যাংগো পাল্প, আনারস প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইথানলসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আগামী জানুয়ারি থেকে একটি নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য চিনিকলেও এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া হবে।
চিনিকলের পুরোনো যন্ত্রপাতি আধুনিকায়নের কাজও এগিয়ে চলছে। কেরুতে বিএমআর সম্পন্ন হয়েছে এবং নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ হয়েছে। অন্যান্য কারখানার আধুনিকায়নের সম্ভাব্যতা যাচাইও চলছে।
চেয়ারম্যান জানান, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আখ থেকে চিনি পাওয়ার হার বাড়ানো সম্ভব। বর্তমানে গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ রিকভারি পাওয়া যায়। এটি আরও ২ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হলে একই পরিমাণ আখ ও প্রায় একই ব্যয়ে বেশি চিনি উৎপাদন করা যাবে।
বাই-প্রোডাক্ট থেকেও বড় ধরনের আয় করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেরুতে জৈব সার বিক্রি করে গত বছর প্রায় ২৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়েছে। পাশাপাশি কারখানায় উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের আধুনিকায়ন শেষ হলে মাড়াই মৌসুমে প্রায় ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
চিনি শিল্পের ভবিষ্যৎ আখ উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হওয়ায় কৃষকদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বছর প্রায় ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষিকে মোট ১২ কোটি ২৩ লাখ টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান চেয়ারম্যান। কৃষকদের বীজ, সার ও কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ ঋণের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে। আখ বিক্রির সময় সেই অর্থ সমন্বয় করা হয়।
আখের জমিতে সাথী ফসল চাষেও কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। মরিচ, ডাল, চিনাবাদাম, পেঁয়াজ, রসুন ও তুলাসহ বিভিন্ন ফসল আখের সঙ্গে চাষের সুযোগ রয়েছে। এতে কৃষকের বাড়তি আয় হবে এবং আখ চাষে আগ্রহও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ছয়টি চিনিকল পুনরায় চালুর বিষয়েও কাজ চলছে। ২০২০ সালে এসব কারখানার মাড়াই বন্ধ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট এলাকার অনেক কৃষক বিকল্প ফসলে চলে যান। এখন তাদের আবার আখ চাষে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পর্যাপ্ত আখ নিশ্চিত করা গেলে ধাপে ধাপে বন্ধ চিনিকলগুলো চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে চিনি শিল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনাও দেখছেন করপোরেশনের চেয়ারম্যান। তার দাবি, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। জাপানের জেবিআইসি, এক্সিম ব্যাংক এবং চীনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বাই-প্রোডাক্ট তৈরির সুযোগ থাকায় এ খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
মো. শামছুজ্জামান বলেন, চিনি শিল্পের সঙ্গে বর্তমানে প্রায় ৬১ হাজার কৃষক এবং ২০ হাজার শ্রমিক যুক্ত। গত অর্থবছরে করপোরেশন রাষ্ট্রকে প্রায় ২১৩ কোটি টাকা কর দিয়েছে। এর মধ্যে কেরু থেকে এসেছে প্রায় ১৫৩ কোটি টাকা।
পরিবেশ রক্ষায়ও কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এ অর্থবছরে করপোরেশনের মিল ও কারখানাগুলোতে প্রায় ১৫ হাজার গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় অর্ধেক গাছ লাগানো হয়েছে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো কর্মসূচি শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
চেয়ারম্যানের ভাষায়, আধুনিকায়ন, আখের উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকদের সহযোগিতা এবং বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে চিনি শিল্পকে একটি শক্তিশালী কৃষিভিত্তিক শিল্পে রূপ দেওয়াই মূল লক্ষ্য। তিনি চান, পুরোনো ঐতিহ্য ফিরে পেয়ে দেশের চিনিকলগুলো আবারও বড় ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াক।