মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা শিফাত আহমেদের মাসিক আয় ২৮ হাজার টাকা। স্ত্রী ও পাঁচ বছরের সন্তানকে নিয়ে ছোট একটি ফ্ল্যাটে থাকেন তিনি। তার মাসিক বাসা ভাড়া ১৪ হাজার টাকা। বিদ্যুৎ, যাতায়াত, সন্তানের পড়াশোনা ও বাজার খরচ মিলিয়ে মাসের শুরুতেই আয়ের বড় অংশ শেষ হয়ে যায়।
শিফাত জানান, আগে বাজারের জন্য ৬ হাজার টাকা রাখলেই মোটামুটি চলত। এখন ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা খরচ করেও প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে গ্যাসের সংকটের কারণে ইন্ডাকশন কুকার ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে বেড়েছে বিদ্যুৎ বিলও। আগে যেখানে মাসে বিদ্যুৎ বিল ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে থাকত, গত মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২০০ টাকায়।
সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় ৫০০ টাকা নিয়ে মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে গিয়ে শিফাত দেখেন, ওই টাকায় প্রয়োজনীয় সব পণ্য কেনা সম্ভব নয়। ব্রয়লার মুরগি কেজি ২০০ টাকা এবং তেলাপিয়া মাছ ২৫০ টাকার কাছাকাছি হওয়ায় সেদিন মুরগি ও মাছ না কিনেই ফিরে আসেন তিনি। কিছু সবজি, আলু-পেঁয়াজ ও চারটি ডিম কেনার পর ভোজ্যতেল কিনতে আরও ২০৪ টাকা খরচ হয়।
বাজারের এমন চিত্রে খাদ্য তালিকাও ছোট করতে হয়েছে শিফাতের পরিবারকে। কয়েক মাস ধরে গরুর মাংস কেনা বন্ধ। মুরগিও সপ্তাহে একবারের বেশি কেনা হয় না। মাছের পরিবর্তে অনেক সময় ডিম, ডাল ও সবজি দিয়েই খাবার সারতে হচ্ছে।
মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে বর্তমানে কাঁচামরিচ ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, টমেটো ১২০ থেকে ১৪০, বেগুন ৮০ থেকে ১০০ এবং বরবটি ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির দাম প্রায় ২০০ টাকা এবং গরুর মাংস ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি।
মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০, রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ এবং চিংড়ি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাবদা, ভেটকি, ট্যাংরা, কই, বাইম ও শিং মাছের দামও সীমিত আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
শিফাতের মতো অনেক পরিবারের জন্য শুধু খাবারের খরচই চাপ তৈরি করছে না। সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, যাতায়াত ও বিনোদনের খরচও কমিয়ে আনতে হচ্ছে। আগে মাসে একবার পরিবার নিয়ে বাইরে বের হলেও এখন সেটি বন্ধ। হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ মেটানোর মতো আলাদা সঞ্চয়ও নেই।
তিনি বলেন, মাসিক আয় ২৮ হাজার টাকা হলেও প্রয়োজনীয় খরচ ৩১ হাজার টাকার বেশি হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রতি মাসেই কয়েক হাজার টাকা ঘাটতি থাকছে। কখনো ধার করে, আবার কখনো পরিবারের কাছ থেকে সহায়তা নিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির হার সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমেছে। মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, জুনে ৯ দশমিক ১৬, জুলাইয়ে ৮ দশমিক ৫৫ এবং আগস্টে তা ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে নেমেছে। তবে আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ।
অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ পুরোপুরি কমেনি। কয়েক বছর ধরে পণ্যের দাম যে পর্যায়ে উঠেছে, আয় সেই অনুপাতে না বাড়ায় সাধারণ মানুষের সংসারে স্বস্তি ফিরছে না।
অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদের মতে, মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান না বাড়লে শুধু মূল্যস্ফীতি কমে গেলেই বড় ধরনের স্বস্তি আসবে না। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সুদের হার ও করের চাপ কমানো এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যার সমাধান জরুরি।
তার মতে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং মানুষের আয়ও বাড়বে। অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি ফিরলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, তখন মূল্যস্ফীতির চাপও তুলনামূলকভাবে কম অনুভূত হবে।
তবে সেই স্বস্তি আসার আগ পর্যন্ত শিফাতদের মতো পরিবারগুলোকে প্রতিদিন হিসাব কষেই চলতে হচ্ছে। বাজারের তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছে মাছ-মাংস, কমছে বিনোদন, চিকিৎসার জন্য থাকছে না সঞ্চয়। আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান যত বাড়ছে, ততই ছোট হয়ে আসছে মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বাভাবিক জীবন ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন।