নেপালে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬২, নিখোঁজ শতাধিক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬২ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, এখনো শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৮ জন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা হয়।
গতকাল বুধবার দেশটির তিব্বত সীমান্তবর্তী পার্বত্য এলাকায় আকস্মিক বন্যার পানিতে একের পর এক গ্রাম ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নেপাল পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বুধবার রাত পর্যন্ত ১৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্গত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যার পর প্রায় ৪০৩ পর্যটকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতের নাগরিক। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও রয়েছেন।
পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে জানিয়েছেন, ২৮ জন পুলিশ সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন।
অন্যদিকে সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং কাউন্টিতে অন্তত তিনজন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এখনো যাচাই করা হচ্ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ দুর্যোগের এই সময়ে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, উদ্ধার, চিকিৎসা, খাবার ও আশ্রয়ের দায়িত্ব সরকার নিয়েছে এবং সবাইকে ধৈর্য ধরে একসঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।
নেপালের রাসুয়া জেলার স্যাফ্রুবেসি ও টিমুরে এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাসের এই পার্বত্য জেলায় পানির স্রোত এতটাই প্রবল ছিল যে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারও সেখানে অবতরণ করতে পারেনি।
জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার ভোতে কোশি নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের দ্রুত উঁচু এলাকায় সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় গ্রাম ও বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের স্থাপনা পানির তোড়ে ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
নেপাল সরকারের মুখপাত্র স্মিত পখরেল জানিয়েছেন, উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার জন্য ভারত ও চীনের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত সদস্যদের দুর্গত এলাকায় পাঠিয়েছে।
চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং বন্দরের কাছে ভূমিধসের ঘটনায় সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বন্যার কারণে নেপালের বিদ্যুৎ অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
এদিকে সীমান্তবর্তী ভারতের বিহার রাজ্যেও বন্যার আশঙ্কায় ছয়টি জেলার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়েছে। কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, নেপালের বন্যার পানি সীমান্ত পেরিয়ে বিহারের নিম্নাঞ্চলে পৌঁছাতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, পাহাড়ি উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে কাদামিশ্রিত পানি প্রবাহিত হচ্ছে। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক কোশ রাজ কৈরালা জানিয়েছেন, বন্যার সময় অনেক মানুষ কোনো ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাননি। কারণ ওই এলাকায় উল্লেখযোগ্য ভারী বৃষ্টিপাতও হয়নি।
দুর্যোগের সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নেপালের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হিমবাহ থেকে সৃষ্ট তুষার ও পাথরের ধসই আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত ঘটাতে পারে।











