বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ভূমিকা কম, তবুও জলবায়ু সংকটে ঝুঁকিতে নেপাল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দিন দিন আবহাওয়া উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ও ঘনত্ব। তবে এই উষ্ণায়নের জন্য দায়ী বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান অত্যন্ত সামান্য। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন অভিঘাত মোকাবিলা করা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে হিমালয়ঘেরা এই দেশটি।
পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, মৌসুমি ভারী বৃষ্টি এবং সক্রিয় ভূকম্পন অঞ্চলে অবস্থানের কারণে নেপাল ভূমিকম্প, ভূমিধস, তুষারধস, খরা ও বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের (ডব্লিউডব্লিউএফ) তথ্য অনুযায়ী, নেপালের হিমবাহগুলো বছরে সর্বোচ্চ ১৫ মিটার পর্যন্ত পিছিয়ে যাচ্ছে। এতে পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে এবং হিমবাহের গলিত পানি জমে অনিরাপদ জলাধার তৈরি হচ্ছে, যা হঠাৎ হঠাৎ ভয়াবহ বন্যার কারণ হতে পারে। মার্কিন বার্তাসংস্থা সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
বুধবার নেপালের রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পেছনেও একটি বিশাল হিমবাহের অংশ পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচের উপত্যকায় পড়ে যাওয়ার ঘটনা ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। এর ফলে বিপুল পরিমাণ পানি, পাথর ও পলি দ্রুত নিচের দিকে নেমে এসে বন্যার সৃষ্টি করে থাকতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতায় নেপালের মতো দেশগুলোর দুর্ভোগ আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য যেসব দেশ তুলনামূলকভাবে কম দায়ী, অনেক সময় তারাই এর সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ে।
আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডেটার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নেপাল প্রায় ১ কোটি ৮৮ লাখ মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করেছে, যা বিশ্বের মোট নিঃসরণের শূণ্য দশমিক ১ শতাংশেরও কম। প্রায় ৩ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ ছিল প্রায় শূণ্য দশমিক ৬৩ মেট্রিক টন।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র মোট প্রায় ৪৯০ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করেছে। দেশটির মাথাপিছু নিঃসরণ ছিল ১৪ দশমিক ২ মেট্রিক টন। একই সময়ে চীন প্রায় ১ হাজার ২৩ কোটি মেট্রিক টন নিঃসরণ করেছে, যেখানে মাথাপিছু নিঃসরণ ছিল ৮ দশমিক ৬ মেট্রিক টন।
কম নিঃসরণ করলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকায় নেপাল অন্যতম। দারিদ্র্য এবং কৃষির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা দেশটির ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। বন্যা, খরা, ভূমিধস বা হিমবাহজনিত দুর্যোগ সরাসরি কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ জীবিকায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে জলবায়ু মোকাবিলায় নেপালের নিজস্ব পরিকল্পনা তুলনামূলকভাবে উচ্চাভিলাষী। ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকারের মূল্যায়নে দেশটির জলবায়ু পরিকল্পনাকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্যারিস চুক্তির আওতায় শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্যটির সঙ্গে নেপালের পরিকল্পনা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে নেপালের মতো ছোট ও কম নিঃসরণকারী দেশের একার পক্ষে বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট থামানো সম্ভব নয়। হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় বড় নিঃসরণকারী দেশগুলোর নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে অভিযোজন, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আরও সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; হিমালয়ের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে এর ঝুঁকি ইতোমধ্যেই মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে।











