বারবার গর্ভপাতের আসল কারণ ও ঝুঁকি এবং করণীয়
ডা. মাহবুবা আক্তার জাহান
পরপর দুই বা ততোধিকবার গর্ভপাত হওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বারবার গর্ভপাত বা রিকারেন্ট প্রেগনেন্সি লস বলা হয়। এটি যেকোনো দম্পতির জন্য চরম মানসিক ও শারীরিক কষ্টের কারণ হলেও সঠিক সময়ে উপযুক্ত কারণ নির্ণয় এবং যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরবর্তী সময় সফলভাবে সুস্থ সন্তান জন্ম দেওয়া সম্ভব।
গর্ভকালের ওপর ভিত্তি করে এই সমস্যার কারণগুলোকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়।
গর্ভধারণের প্রথম থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে (প্রথম ট্রাইমেস্টার) গর্ভপাতের পেছনে প্রধানত দায়ী থাকে ভ্রƒণের ক্রোমোজোম বা জেনেটিক ত্রুটি, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও থাইরয়েডের মতো হরমোনজনিত সমস্যা, পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম (PCOS) এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ত্রুটি, বিশেষ করে অ্যান্টিফসফোলিপিড সিন্ড্রোম (APS)। এছাড়া বংশগতভাবে রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা বা ইনহেরিটেড থ্রোম্বোফিলিয়াও এর অন্যতম কারণ। অন্যদিকে, ১৩ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে (দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার) গর্ভপাতের ক্ষেত্রে জরায়ুর বিভিন্ন গঠনগত ত্রুটি, জরায়ুর ভেতরের পর্দা (সেপ্টাম), বড় আকারের ফাইব্রয়েড টিউমার, জরায়ুর মুখ দুর্বল হওয়া (সার্ভাইকাল ইনসাফিসিয়েন্সি) এবং প্রজননতন্ত্রের বিভিন্ন সংক্রমণ মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
এর পাশাপাশি জীবনযাত্রার কিছু ক্ষতিকর দিক, যেমন- ধূমপান, অ্যালকোহল বা মাদকাসক্তি, অতিরিক্ত ওজন, চরম অপুষ্টি এবং মায়ের বয়স ৩৫ বছর পার হওয়া গর্ভপাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রে নিখুঁত পরীক্ষার পরও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। এই সমস্যার সঠিক কারণ উদঘাটনে চিকিৎসকরা রক্তের সাধারণ পরীক্ষা, থাইরয়েড ও ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং, পেলভিক আল্ট্রাসোনোগ্রাফি, অ্যান্টিফসফোলিপিড সিন্ড্রোম পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে মা-বাবার ক্রোমোজোম পরীক্ষা (ক্যারিয়োটাইপ) বা হিস্টেরোস্কপির মতো বিশেষ পরীক্ষার সাহায্য নিয়ে থাকেন।
বারবার গর্ভপাত প্রতিরোধে করণীয় হলো- পরবর্তী গর্ভধারণের পরিকল্পনা করার আগেই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নিয়মিত ফলিক অ্যাসিড সেবন শুরু করা।
চিকিৎসকের নির্দেশনায় ডায়াবেটিস ও থাইরয়েডের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা, সব ধরনের ক্ষতিকর অভ্যাস ও মাদক বর্জন করা, সুষম খাদ্যগ্রহণ ও স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যেকোনো ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি।
পরিশেষে আশার কথা হলো, বারবার গর্ভপাত মানেই সন্তান ধারণের আশা চিরতরে শেষ হয়ে যাওয়া নয়। সঠিক সচেতনতা, নির্ভুল রোগনির্ণয় এবং সময়মতো কারণভিত্তিক চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ দম্পতিই সফল মাতৃত্বের স্বাদ লাভ করতে পারেন।
লেখক : এফসিপিএস (গাইনি অ্যান্ড অবস) এবং ফেলো ট্রেইনি ইন ফিটো ম্যাটারনাল মেডিসিন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
চেম্বার : লং লাইফ ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসাল্টেশন সেন্টার লিমিটেড
ইয়াকুব সাউথ সেন্টার, ১৫৬ লেক সার্কাস, কলাবাগান, ঢাকা
হটলাইন : ০১৩২৯৬৬৭৫৬০, ০২-২২৩৩৭১৫৩৩











