,

ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে ভূগর্ভে অপসারিত তরল বর্জ্য

carbonquakes_openerআন্তর্জাতিক ডেস্ক :শিল্পায়নের পাশাপাশি কয়লা, গ্যাস, তেল ইত্যাদি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ কার্বনডাইঅক্সাইড পৃথিবীকে ঠেলে দিচ্ছে এক গুরুতর পরিবর্তনের দিকে। জলবায়ুর এ পরিবর্তন বদলে দেবে আমাদের চেনা পৃথিবীর মানচিত্র। সমুদ্র এবং স্থলভাগের পরিমাণগত অনুপাত বদলে যাবার পাশাপাশি তাপ ও শৈত্যের ভারসাম্যও বিঘ্নিত হবে, পরিবর্তিত হয়ে যাবে আবহাওয়ার ছক।

কার্বনডাইঅক্সাইড অপসারণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার প্রচেষ্টায় একটি অন্যতম কৌশল ছিল মাটির নিচে বর্জ্য চাপা দেয়া। আশা করা হচ্ছিল এতে করে অন্তত কয়েক শতাব্দীর জন্য নিশ্চিন্ত থাকা যাবে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা আশংকা করছেন প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা দিতে পারে বড় ধরনের ভূমিকম্প। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ মার্ক জ্যোব্যাকের মতে, কয়েকশ হাজার বছর ধরে প্রচণ্ড চাপ সহ্য করে যাওয়া ভূগর্ভস্থ প্লেটগুলো গ্যাস, পানি বা অন্য যেকোনো তরলের অনুপ্রবেশে স্তরচ্যুতি ঘটাতে পারে।

ভূতত্ত্ববিদরা ১৯৭০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে পূর্ব ও মধ্য আমেরিকায় গড়ে বছরে ২০টি ৩.০ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করেছেন। যা ২০১০ থেকে ২০১৩ এর মধ্যে বেড়ে হয় ৪৫০টি, মাত্রাও ঐ অঞ্চলের জন্য স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি।

মধ্য এবং পূর্ব আমেরিকায় কয়েক দশক ধরে স্থিতিশীল ভূমিকম্পের হার ২০০৯-এর পর থেকে খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে, ২০১৩ নাগাদ তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি।

অধিকাংশ আমেরিকান মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভূমিকম্পের মাত্রা এবং প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার পেছনে হাইড্রলিক ফ্র্যাকচারিং বা ফ্র্যাকিং এর একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। তেল বা গ্যাস উত্তোলনের সময় ফ্র্যাকিং এর মাধ্যমে স্লেট পাথরের স্তরের মধ্যে বাইরে থেকে বিশেষ জলীয় মিশ্রণ ঢুকানো হয়, ফলে উচ্চচাপে কূপমধ্যস্থ তেল বা গ্যাস প্রবল বেগে বাইরে নির্গত হয়। হাইড্রলিক ফ্র্যাকচারিং বহু পুরনো পদ্ধতি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। যদিও অধিকাংশ ফ্র্যাকিং কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়, কিন্তু কখনও কখনও; ‘হোয়েন দ্য আর্থ মুভস’-এ এলসওয়ার্থ যেমনটি বলেছেন, সবকিছু চলে যায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এলসওয়ার্থের মতে, মাসের পর মাস খনিজ উত্তোলনে ভারী যন্ত্রপাতির চাপ বা তরল প্রবেশ করিয়ে খনিজ উত্তোলনের প্রক্রিয়া সরাসরি মানবসৃষ্ট ভূমিকম্প ঘটায় না। বরং এগুলো প্রাকৃতিকভাবেই ঐ অঞ্চলে বিদ্যমান ভূমিকম্পের প্রবণতাকে উসকে দেয়।

ভূতত্ত্ববিদদের ধারণা, গত কয়েক দশকে আমেরিকার ভূগর্ভস্থ পাথরের ভিত্তিস্তর ভাঙনের পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। পুরো পৃথিবী জুড়েই মাটির নিচে এমন অসংখ্য পাথরের স্তর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কখনও একটির সঙ্গে অন্যটি উপরিপাতন করে, কোথাও বা দুটি স্তরের মধ্যে পর্যাপ্ত ব্যবধানে। এই স্তর বা প্লেটগুলো বিভিন্ন কারণে স্থানচ্যুত হতে পারে, যা ভূমিকম্প বা ভূমিধ্বস ঘটায়। কয়েকশ বছর ধরে স্থির থাকা অঞ্চলেও হঠাৎ ঘটতে পারে স্তরচ্যুতি। আর বর্তমান সময়ের ব্যাপক হারে ব্যবহৃত খনিজ উত্তোলন পদ্ধতি স্বাভাবিকভাবেই চ্যুতিপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। যে তরল ভূগর্ভে প্রবেশ করানো হয় তা প্রাকৃতিকভাবে বিন্যস্ত প্লেটগুলোর বিন্যাসে বিচ্যুতি ঘটায়। ফলে মাটির নিচে সজ্জিত স্তরগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং ভূ-অভ্যন্তরে আলোড়ন তৈরি হয়।

শিকাগোর ডেকাটুর পরীক্ষামূলক কেন্দ্রে স্লেট পাথরের অভেদ্য স্তরের মধ্য দিয়ে পালাজোয়িকপূর্ব গ্রানাইট-রায়োলাইট শিলাস্তরের ঠিক উপরে অবস্থিত বেলেপাথরের স্তরে প্রচুর কার্বনডাইঅক্সাইড পাম্প করা হয়েছে।

তবে ডেকাটুরের অধিবাসীরা বড় ধরনের কোনো ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে নেই। শিকাগোর ১৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে গড়ানো পর্বতশ্রেণির ভাঁজে অবস্থিত এই শিল্পনগরী আমেরিকার সবচেয়ে বড় কার্বন জমা করার স্থান, এবং এটি নিরাপদ কারণ এর আশেপাশে কোথাও ভূগর্ভস্থ স্তরচ্যুতির সম্ভাবনা দেখা যায় না।

উত্তর আমেরিকার সর্ববৃহৎ কৃষিবাণিজ্য কোম্পানি আরচার ড্যানিয়েলস মিডল্যান্ড(এডিএম) এখানে কাজ করছে । প্রচুর পরিমাণ পশুখাদ্য, ভোজ্য তেল, ভুট্টার সিরাপ, মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য এবং অন্যান্য কৃষিজ দ্রব্য উৎপাদনের পাশাপাশি কার্বন নিয়ন্ত্রণেও এডিএম প্ল্যান্ট কাজ করে যাচ্ছে।
বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রতিরোধের পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে এখানে স্থাপন করা হয়েছে একাধিক ফারমেন্টেশন ট্যাংক, যার প্রতিটি ১৫ মিটারেরও বেশি উচ্চতাসম্পন্ন। এগুলো ৩.৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন এডিএম কর্নকে গ্যাসোলিনের সঙ্গে মিশ্রিত করার জন্য ইথানলে রূপান্তরিত করে। উচ্ছিষ্ট মিশ্রণ পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই প্ল্যান্ট প্রতিদিন প্রায় ২,৭০০ টন বিশুদ্ধ কার্বনডাইঅক্সাইড উৎপন্ন করে।
কিন্তু এই প্ল্যান্টের কার্বনডাইঅক্সাইড জীবাশ্ম জ্বালানি দহনের ফলে উৎপন্ন কার্বনডাইঅক্সাইডের মত পৃথিবীর জন্য হুমকিস্বরূপ নয়। কেননা ভুট্টা গাছ প্রচুর পরিমাণ কার্বনডাইঅক্সাইড শোষণ করে নেয় যা একধরনের ভারসাম্য তৈরি করে।

এডিএম প্ল্যান্ট একটি দুই পর্ববিশিষ্ট পরীক্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। প্রথম ধাপটি ইলিনয়স বেসিন-ডেকাটুর প্রোজেক্ট নামে তিন বছর সফলতার সঙ্গে কাজ করেছে। এই প্রোজেক্ট গাঁজনে উৎপাদিত কার্বনডাইঅক্সাইডের এক-তৃতীয়াংশ ২,১০০ মিটার মাটির নিচে পাঠিয়ে দিয়েছে। ২০১৫-এর মধ্যে এই প্ল্যান্ট পুরোপুরি কার্বন নিঃসরণমুক্ত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রতিরোধে এখনও পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে প্রমাণযোগ্য পদক্ষেপ। এই প্ল্যান্ট তিন বছরে মোট এক মিলিয়ন টন CO2 মাটির নিচে ব্যবস্থাপনা করতে পেরেছে, যা আপাতদৃষ্টিতে বিশাল সাফল্য বলে মনে হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা কিছুই না। এক মিলিয়ন টন হলো একটি কয়লা প্ল্যান্টে বছরে যে পরিমাণ কার্বনডাইঅক্সাইড উৎপাদিত হয় তার এক-চতুর্থাংশ। আমেরিকায় কয়লা প্ল্যান্ট আছে ৪০০টিরও বেশি। অতএব শুধু আমেরিকার কার্বন নিঃসরণ প্রশমিত করতেই এরকম কয়েক হাজার প্ল্যান্ট প্রয়োজন হবে।
বিভিন্ন ধরনের শক্তি ব্যবহার করে প্রয়োগকৃত বিভিন্ন প্রযুক্তি ইতোপূর্বে নানা মাত্রার ভূমিকম্প ঘটিয়েছে। তেল এবং গ্যাস নিষ্কাশন ঘটিয়েছে সবচেয়ে বেশি।
তবে পরিকল্পিতভাবে মাটির নিচে প্রবেশ করানো বিপুল পরিমাণ কার্বনডাইঅক্সাইড এখনও পর্যন্ত এডিএম প্ল্যান্ট বা তার আশেপাশের এলাকায় কোনো ভূমিকম্প সৃষ্টি করেনি। অতি সামান্য মাত্রার সূক্ষ্ম সিসমিক সিগন্যাল ধরার জন্যও এখানে আছে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা।
তবে মার্ক জ্যোব্যাক মনে করেন ভূগর্ভে কার্বন প্রতিস্থাপন কোনো টেকসই সমাধান নয়। তিনি আশংকা প্রকাশ করেন, অনুপ্রবেশকৃত কার্বনডাইঅক্সাইড যে অতি সামান্য কম্পন বা বিচ্যুতি তৈরি করে তা যেকোনো সময় বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনার পথ খুলে দিতে পারে। তিনি বলেন শিলাস্তরের সামান্য স্থান পরিবর্তন ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত দীর্ঘ ফাটল তৈরি করতে পারে, সেক্ষেত্রে অনাগত ভবিষ্যতে এই জমা করা গ্যাসগুলো আবার উঠে আসার সম্ভাবনা আছে। যা নিঃসন্দেহে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।

ভূ-অভ্যন্তরে কার্বনডাইঅক্সাইড বা কোনো তরল ঢুকানো হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার আশেপাশে অনেকখানি জায়গা জুড়ে প্রচণ্ড চাপ বিরাজ করে। চাপ বেড়ে গেলে ছোটছোট শিলাখণ্ড চতুর্দিকে প্রবল বেগে নিক্ষিপ্ত হয়, যা দুর্বল শিলাস্তর ভেদ করে কার্বনডাইঅক্সাইড পুনরায় উদগীরণসহ অন্যান্য অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয় ঘটাতে পারে।
তাছাড়া তিনি আরও বিশ্বাস করেন, এই ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া জলবায়ু পরিবর্তনের তড়িৎগতির সঙ্গে পেরে উঠবে না। বিলিয়ন বিলিয়ন টন কার্বন দাফন করতে করতে পৃথিবীর পরিবেশ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

তবে ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির একদল গবেষক মনে করেন মাটির অনেক গভীরে কার্বন অপসারণ পৃথিবীকে বাঁচাতে একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে কাজ করবে। তারা মনে করেন বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি বেশিমাত্রার ভূমিকম্প হয়তো হতে পারে কিন্তু তাতে মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা নেই, কেননা অধিকাংশ প্ল্যান্ট লোকালয় থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। ভূগর্ভে আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তারা মনে করেন যে খুব কম শিলাস্তরই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কার্বন নিঃসরণের মতো ছিদ্রপথ তৈরি করবে।

শেষপর্যন্ত ভালো বা মন্দ যা-ই হোক, এই পদ্ধতি অবলম্বন করে কার্বন অপসারণ কিংবা গ্রীন হাউজ এফেক্টের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে আরও সময় লাগবে। আশা করা যায় প্রযুক্তিগত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠে কার্বন ব্যবস্থাপনা ব্যাপক পরিসরে শুরু হবে, তখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বিশেষায়িত কার্যক্রমের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এতে অবদান রাখবে। একসময় হয়তো যে মাটির নিচ থেকে জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন করে মানুষ প্রকৃতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে উৎপন্ন সব কার্বন সেই মাটির নিচেই পাঠিয়ে দিতে পারবে।

এ জাতীয় আরও খবর

‘প্লেয়ার্স বাই চয়েজে’ সমাধান! সম্মানজনক পারিশ্রমিক দাবি ক্রিকেটারদের

মাতৃত্বের পর শরীর নিয়ে কটাক্ষ, এবার মুখ খুললেন ক্যাটরিনা

একাদশে ভর্তি থেকে ছিটকে পড়লো ১ লাখ ২৭ হাজার শিক্ষার্থী

এবার গুলশানের এডিসিসহ চার কর্মকর্তাকে বদলি

নতুন পে-স্কেলের সুবিধা পাবেন না যারা

আল্লাহর কসম, এই দাবিগুলো দলের নয়, জনগণের: জামায়াত আমির

ডেঙ্গুর থাবা সারাদেশে, রেহাই পাচ্ছে না শিশুরাও

মুন্সীগঞ্জে বাস-প্রাইভেটকার সংঘর্ষে নিহত ৪

প্রয়োজনে জীবন দেব, দাবি আদায় না করে ঘরে ফিরব না : শফিকুর রহমান

রাজধানীতে ৩ বাসে আগুন

অপ্রতিম হত্যা: সিসিটিভির সূত্রে ৩ জন আটক

এসডিজি অর্জনে বিশ্বনেতাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর