অবৈধ ঘেরে বিপর্যস্ত তিতাস

Titash-400x224‘তিতাস একটি নদীর নাম’ অদ্বৈত মল্লবর্মণের কালজয়ী উপন্যাস অবম্বনে ঋত্বিক ঘটকের বিখ্যাত চলচিত্র। তিতাসের সেই প্রমত্ত যৌবন এখন কেবলই স্মৃতি। বাংলাদেশের নদীগুলোর অবস্থা এখন প্রায় বিপর্যস্ত। তিতাসের অবস্থাও তার ব্যাতিক্রম নয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাতটি উপজেলার বুক চিরে প্রবাহমান এই নদী। নদীর প্রফুল্লতা চোখে না পড়লেও, চোখ এড়িয়ে যায়না তিতাসের বুকে হাজার হাজার মৎস ঘের। নদীতে গড়ে ওঠা অসংখ্য ঘেরের ফলে মাছের স্বভাবিক চলাচল যেমন বিঘিœত হচ্ছে, তেমনি হুমকির মুখে পড়েছে প্রাণীবৈচিত্র্য। পাশাপাশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানি প্রবাহ, দিনকে দিন কমছে নাব্যতা।
তিতাসের চারিধারে অসংখ্য বাঁশ পুতে তৈরি করা হয় ঘের। ঘেরের ভেতরে পানির নিচে গাছের ডালপালা ফেলে আর উপরে আটকে দেয়া হয় কচুরিপানা। নদীর মাছ ঘেরকেই অভয়ারণ্য মনে করে আশ্রয় নেয় সেখানে। কিন্তু জাল দিয়ে ঘিরে ফেলায় তাদের আর বেরিয়ে যাবার উপায় থাকেনা। উল্লেখ্য যে, এসব ঘেরে সাধারণ জেলেদের মাছ ধরার কোন অধিকার নেই।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোকর্ণ ঘাট থেকে নবীনগর পর্যন্ত প্রায় কুড়ি কিলোমিটার নদীপথে এ ধরণের প্রায় ৪ শতাধিক ঘেরের সন্ধান মেলে। গোকর্ণ ঘাটে মালোপাড়ায় অদ্বৈত মল্লবর্মণের বসতভিটা ছিল। একটু দূরেই গোকর্ণ ঘাট, একটা নৌ বন্দর। তিতাস নদীর এই ঘাটটি থেকে প্রতিদিন অসংখ্য লঞ্চ, ট্রলার, ইঞ্জিন নৌকা ও স্পিডবোট ছেড়ে যায় দূরবর্তী নবীনগরসহ অন্যান্য গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
গোকর্ণ ঘাটের সথে লাগোয়া বস্তিটি স্থানীয় মালোপাড়া বা জেলেপল্লীদের। এই পল্লীর বাসিন্দাদের জীবনযুদ্ধের চিত্র নিয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণ লিখেছিলেন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। মালোপাড়ায় ঢুকতেই চোখে পড়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণের একটি আবক্ষ মূর্তি। ভেতরে তাদের পৈত্রিক বসতভিটাটি এখনো আছে। যদিও দুই তিন হাত ঘুরে সেই ভিটেতে নতুন টিনের ঘর তুলেছেন আরেকটি মল্লবর্মণ পরিবার।
এখন শুষ্ক মৌসুমে তিতাসে মাছ কম বলে পাড়ার সমর্থ পুরুষদের অলস দুপুর কাটে আড্ডা মেরে। যদুলাল বর্মণের কথায়, যা-ও পাওয়া যায় তাতে মালোপাড়ার জেলেদের অধিকার নেই। তিনি বলেন, ‘মাছ মারতে গেলে খেউ-অলারা বাধা দেয়’। খেউ হলো স্থানীয়ভাবে তৈরি একধরনের মাছের ঘের। ঠিক প্রচলিত ঘের না হলেও খেউ হলো নদীর জল আটকে মাছ আহরণের এক ধরণের পদ্ধতি।
সিরাজ মিয়া একটি ঘেরের কথিত মালিক। ঘেরটির আকার প্রায় ৫ একরের মত। দেখেই বোঝা যায়, ভেতরে মাছের সংখ্যা কম নয়। সিরাজ মিয়া বলছিলেন, গত বছর তিনি এই একটা ঘের থেকে আড়াই লাখ টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। এই ঘেরে সিরাজ মিয়া ছাড়া আর কারো মাছ ধরবার অধিকার নেই। কিন্তু কেন?
সিরাজ মিয়া বলেন, ‘এইডাতো মনে করেন নিজে দখল কইরা, ডাল-ডোল বাঁশ-মাশ দিয়া ঘিরছি। আমার ৫০-৬০ হাজারের মতো খরচ হইছে। এখানে অন্য কেউ করতে পারেনা’। কীভাবে উন্মুক্ত এই জলাশয়ের মালিক হলেন তিনি? জানতে চাইলে সরল স্বীকারোক্তি দিলেন, ‘দখল করছি’। ‘নওন যায় না। কিন্তু দশে যহন নেয়, তহন আমগোও নিতে অইবো। বাচ্চা-কাচ্চা আছে, প্যাট আছে, নেওন লাগবো না?’
তার একজন সহকারী পাশ থেকে বলছিলেন, আশপাশে দুই কুড়ির মত ঘেরে তারা মাছ ধরার কাজ করেন এবং এসব ঘের থেকে গত বছর এক কোটিরও বেশি টাকার মাছ পাওয়া গেছে।
কিভাবে উন্মুক্ত এই জলাশয়ের মালিক হলেন? সিরাজ মিয়ার স্বীকারোক্তি- ‘দখল করছি’। পুরো নদী জুড়ে চলে দখলের উৎসব। অসমর্থিত এক হিসেব বলছে, গোকর্ণ ঘাট থেকে নবীনগর পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার নদীপথে এমন প্রায় ৪’শ ঘের আছে, যেখানে সাধারণ জেলেদের মাছ ধরার কোনও অধিকার নেই।
নদীতে দখলের এই উৎসব নিয়ে আমি কথা বলছিলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক ড. মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, এধরনের ঘের অবৈধ। নদীর বুকে এমনভাবে ঘেরগুলো গড়ে উঠছে যে নদীর প্রবাহ মাঝখান দিয়ে অত্যন্ত সরু হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যেখানে কোনমতে নৌযানগুলো চলছে । ঘেরগুলো বারবার উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু এত বিশাল এলাকাজুড়ে সার্বক্ষণিক নজর রাখা যায়না বলে আবারো এসে দখল করছে প্রভাবশালীরা। আর এভাবে নদীর স্বাভাবিক ব্যহত করে মাছ আহরণের ফলে সীমিত হয়ে যাচ্ছে মাছের চলাচল ক্ষেত্র, অবাধ গতিবিধি নষ্ট হওয়ায় হুমকির মুখে পড়ছে নদীর জীববৈচিত্র্য। অন্যদিকে বাঁশ পুঁতে, ডালপালা ফেলে, কচুরীপানা আটকে ঘের তৈরির ফলে নদীপ্রবাহে যে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, তাতে পলি জমে প্রতিনিয়তই নাব্যতা হারাচ্ছে নদীটি।
শুষ্ক মৌসুমে সুধাংশু শেখর মল্লবর্মণের খ-কালীন পেশা কাঠমিস্ত্রির কাজ। বর্ষায় নদীতে পানি বাড়লে আবার মাছ ধরা পেশায় ফিরে যেতে পারবেন বলে তার আশা। একদিকে, সিরাজ মিয়ারা নদী দখল করে এই শুকনো মৌসুমেও লাখ লাখ টাকা রোজগার করছে। অন্যদিকে, সাধারণের জন্য নদীর যেটুকু উন্মুক্ত রয়েছে সেখানে মাছ না মেলায় মালোপাড়ার বেশীরভাগ জেলেরাই এখন নদীর পাড়ে নৌকা তুলে উল্টো করে রেখেছেন। কেউ কেউ বদলে ফেলছেন বাপদাদার পুরনো পেশাটিও। যেমন রবীন্দ্র মল্লবর্মণ এখন দর্জির কাজ করেন। তার ছেলেরাও এই পেশায় নেই। তারা চলে গেছেন নাপিতের পেশায়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্মভূমি গোকর্ণ ঘাটের মালোপাড়া এখন ক্ষয়িষ্ণু। মেরে-কেটে শ’খানেক পরিবার এখানে থাকলেও তারাও প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্য পেশায় পাড়ি জমানোর।

সূত্র : বিবিসি বাংলা।

এ জাতীয় আরও খবর

হালাল শিল্প, টেকসই বিনিয়োগ ও এফডিআই আকর্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ

বিচার বিভাগে আর্থিক দুর্নীতির চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি বেশি ক্ষতিকর: আইনমন্ত্রী

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ বাংলাদেশির মৃত্যু, প্রধানমন্ত্রীর শোক

এসআরবির নতুন মহাপরিচালক হলেন অতিরিক্ত আইজিপি ফারুক আহমেদ

আমন মৌসুমে সাড়ে ৮ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহ করবে সরকার

ডেঙ্গুর ঝুঁকি কাটেনি ঢাকার দুই সিটির বহু ওয়ার্ডে

জবি শিক্ষার্থী জোবায়েদ হত্যা মামলায় তিন আসামির বিচার শুরু

হামের উপসর্গে আরও ২ মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ১ হাজার ২৮২

ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বাড়ছে, এক দিনে মৃত্যু ৩

পিকআপের ধাক্কায় প্রাণ গেল ১৫ বছর বয়সী ছাত্রদল নেতার

সৌদিতে দুর্ঘটনায় নিহত ৮ জনের রোহিঙ্গা পরিচয়ের তথ্য

ঢাকায় বাসে আগুন-ককটেল বিস্ফোরণ, নাশকতার সন্দেহ ডিএমপির