প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত হচ্ছে ক্যানসার শনাক্তকরণ
অনলাইন ডেস্ক : নারীদের স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় নতুন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ পরিকল্পনার আওতায় কমিউনিটি পর্যায় থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত রোগ শনাক্তকরণ, পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর (রেফারেল) ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বিশ্ব স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস উপলক্ষে ঢাকার বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতালে আয়োজিত এক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার শাখাওয়াত হোসেন বকুল।
জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, বাংলাদেশে স্তন ক্যানসার মোকাবিলার বড় বাধাগুলোর একটি হলো রোগটি দেরিতে শনাক্ত হওয়া। সচেতনতার অভাব, সামাজিক সংকোচ এবং সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ সীমিত থাকায় অনেক নারী রোগের জটিল পর্যায়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। এতে চিকিৎসার ব্যয় ও জটিলতা বাড়ে এবং সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও কমতে পারে।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু আক্রান্ত নারীদের চিকিৎসা দেওয়া নয়; বরং এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নারীরা রোগের লক্ষণ সম্পর্কে জানবেন এবং প্রাথমিক পর্যায়েই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে পারবেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও দ্রুত রোগ শনাক্তকরণকেন্দ্রিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা এ পরিকল্পনার অন্যতম অগ্রাধিকার।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, নিয়মিত মাতৃস্বাস্থ্য ও গর্ভকালীন সেবার সঙ্গে স্তনস্বাস্থ্য মূল্যায়ন, ক্যানসারের সতর্কসংকেত সম্পর্কে পরামর্শ এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে জরায়ুমুখের ক্যানসার স্ক্রিনিং যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন এবং বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কমিউনিটি পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্যানসারের ঝুঁকি, প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীদের উপযুক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানোর বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও তুলে ধরেন জিয়াউদ্দিন হায়দার।
তিনি বলেন, নারীদের ক্যানসার শনাক্তকরণের প্রথম সুযোগ যেন শুধু রাজধানীর বিশেষায়িত হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং নিজস্ব এলাকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রেও তৈরি হয়—এটাই সরকারের লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের ২৫০ মিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর আশা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ক্যানসার প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ, রোগনির্ণয় এবং প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা জোরদার হবে। বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালের জনবল, প্রশিক্ষণ এবং রোগনির্ণয় সক্ষমতা বাড়াতে এটি ভূমিকা রাখবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার শাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, শুধু হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা বাড়িয়ে স্তন ক্যানসারের প্রকোপ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এ জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা দূর করাও জরুরি।
তিনি টেলিভিশন, বেতার, সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি এবং নারী সংগঠনের মাধ্যমে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর আহ্বান জানান।
মন্ত্রী বলেন, স্তনে অস্বাভাবিক চাকা বা গিঁট, আকৃতির পরিবর্তন, ত্বকে অস্বাভাবিকতা কিংবা স্তনবৃন্ত থেকে অস্বাভাবিক নিঃসরণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। তবে নিজে স্তন পরীক্ষা করাকে নিয়মিত চিকিৎসাভিত্তিক স্ক্রিনিংয়ের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, আর্থিক সামর্থ্য, সামাজিক অবস্থান কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কোনো নারী যেন প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন। হাসপাতালটির পরিচালকের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।











