রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাল্যবিয়ে ঠেকাতে এগিয়ে শিশুরাই
অনলাইন ডেস্ক : কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, শিক্ষা বিস্তার ও স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে শিশুরা। নিজেদের অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্রে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তারা সহপাঠী, ভাই-বোন এবং প্রতিবেশীদের সচেতন করছে। শিশুদের এমন উদ্যোগে ক্যাম্পের পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
১২ বছর বয়সে পরিবারের সিদ্ধান্তে বিয়ের আয়োজন প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল সালেমার (ছদ্মনাম)। কিন্তু বিয়েতে সম্মতি না থাকায় নিজের উদ্বেগের কথা সহপাঠীদের জানায় সে। পরে কিশোরী বন্ধু, শিক্ষিকা ও শিশুসুরক্ষাকর্মীদের সহযোগিতায় পরিবারের সঙ্গে আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায় তার বাল্যবিয়ের আয়োজন।
নিজের জীবনে পাওয়া সহযোগিতা থেকে সাহস নিয়ে এখন অন্য কিশোরীদেরও সচেতন করছে সালেমা। বাল্যবিয়ের চাপ এলে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, কীভাবে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং কখন সহায়তা চাইতে হবে—এসব বিষয়ে অন্যদের জানাচ্ছে সে।
জাতিসংঘের শিশুসুরক্ষা সাব-সেক্টরের তথ্য এবং চাইল্ড প্রটেকশন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের ড্যাশবোর্ড অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শনাক্ত শিশু সুরক্ষাসংক্রান্ত ঝুঁকির প্রায় ৮ শতাংশ বাল্যবিয়ে বা এ-সম্পর্কিত ঘটনা। এসব ঝুঁকির মুখে থাকা শিশুদের প্রায় ৯৯ শতাংশই কিশোরী বা মেয়েশিশু।
সংশ্লিষ্ট জরিপ অনুযায়ী, বাল্যবিয়ের পেছনে পরিবারের আর্থিক সংকট, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বড় ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী রোহিঙ্গা তরুণ-তরুণীদের একটি বড় অংশ সামাজিক বাধার কারণে শিক্ষার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে শিশুদের নিয়ে গঠিত বিভিন্ন ক্লাব ও কিশোরী দল সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কাজ করছে। কোনো শিশুর বিয়ের আশঙ্কা দেখা দিলে তারা বিষয়টি সুরক্ষাকর্মীদের জানাচ্ছে। আবার শিক্ষাকেন্দ্রে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া শিশুদের বাড়িতে গিয়ে পড়াশোনায় ফিরতে উৎসাহিত করছে।
শিক্ষা বিস্তারে এমন উদ্যোগের একটি উদাহরণ শামীমা (ছদ্মনাম)। ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আশপাশের শিশুদেরও শেখানোর উদ্যোগ নেয় সে। শুরুতে নিজেদের ছোট ঘরে শিশুদের পড়াত শামীমা। পরে শিক্ষাকেন্দ্র চালু হলে অন্যদের সেখানে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করে। বর্তমানে যে শিক্ষাকেন্দ্রে একসময় সে নিজে পড়তে যেত, সেখানেই অন্য শিশুদের শেখানোর দায়িত্ব পালন করছে।
শিশুদের নেতৃত্বে স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। ইউনিসেফ ও অংশীদার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩২০টির বেশি শিশু নেতৃত্ব দল গঠন করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ২০০ শিশু-কিশোর, যাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৪০ জনের বেশি মেয়ে। তারা খেলাধুলা, ছড়া ও গানের মাধ্যমে ছোটদের পরিচ্ছন্নতার নিয়ম শেখাচ্ছে। পাশাপাশি এলাকার নালা বন্ধ হওয়া কিংবা পানির কল নষ্ট হওয়ার মতো সমস্যাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছে।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সংস্থাও কাজ করছে। ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট অফিসার মিঠু প্রভাকর জানান, শিশুদের বিপদের সময় কোথায় এবং কীভাবে সহায়তা চাইতে হবে, সে বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে। এ জন্য শিক্ষাকেন্দ্রে হটলাইন ও নিরাপদ অভিযোগ বাক্সের ব্যবস্থা রয়েছে। শিশুদের পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
ব্র্যাকের চাইল্ড প্রটেকশন টিমের ফোকাল পারসন মো. মাজেদুল ইসলামের মতে, শিশুদের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে বাল্যবিয়ের আশঙ্কা বা এ ধরনের ঘটনা সম্পর্কে সুরক্ষাকর্মীদের কাছে তথ্য পৌঁছানোর সুযোগ বাড়ছে। তবে এই উদ্যোগ আরও কার্যকর করতে পরিবার, কমিউনিটি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।
শিশুদের পরিবর্তনে অভিভাবকদের মধ্যেও ইতিবাচক সাড়া দেখা যাচ্ছে। উঠান বৈঠক ও ইতিবাচক অভিভাবকত্ববিষয়ক সেশনের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে শিশুদের কথা শোনা, তাদের পড়াশোনায় উৎসাহ দেওয়া এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।
অভিবাসন ও শরণার্থী-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতার মতো কাজে শিশুদের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। তবে অর্থায়নের সংকটে কিছু কার্যক্রম ও শিক্ষাকেন্দ্রের পরিসর সীমিত হয়ে পড়ছে। তাই শিশুদের গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখার সুযোগ অব্যাহত রাখা জরুরি।
কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারও সহযোগিতা করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাল্যবিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করা এবং সব শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে এখনও অনেক কাজ বাকি। তবে শিশুদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা, তাদের উদ্যোগকে উৎসাহ দেওয়া এবং পরিবার ও কমিউনিটির সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে এই পরিবর্তন আরও বিস্তৃত হতে পারে।











