,

ডলারের বাজার টালমাটাল অবৈধ মানিচেঞ্জারে

news-image

সাজ্জাদ মাহমুদ খান
রাজধানীর বিমানবন্দরের আশকোনার মুক্তিযোদ্ধা শপিং কমপ্লেক্সের একই ভবনে ১৭টি মানিচেঞ্জার গড়ে উঠেছে, যার ১৬টিই অবৈধ। বিদেশ থেকে আসা যাত্রীরা এই মার্কেটে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা মূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি করে। ডলারসহ সেই বৈদেশিক মুদ্রার বড় অংশই খোলাবাজার থেকে আবার বিদেশে পাচার হয়ে যায়। সারাদেশে ২৩৫টি নিবন্ধিত মানি এক্সচেঞ্জের আড়ালে অন্তত ১ হাজার ২০০টি অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জ বিদেশি মুদ্রা বেচাকেনা করছে। বৈধ ও অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে। নিবন্ধিত মানি এক্সচেঞ্জগুলো আইন ভেঙে ২ থেকে ১০টি পর্যন্ত শাখা করে অবৈধভাবে ভাড়া দিচ্ছে। যাদের বড় অংশই হুন্ডি ব্যবসায় জড়িত। মানি এক্সচেঞ্জের অবৈধ লেনদেনে ডলারের বাজার টালমাটাল হয়েছে। আমাদের সময়ের অনুসন্ধান ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়েই বছরের পর বছর মানি এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠানগুলো অবৈধ ব্যবসা করছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ও গোয়েন্দা সংস্থার অভিযানে কিছু অবৈধ দোকানে তালা দিয়ে পালিয়ে যায়। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান আবার একই পন্থায় অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

ঢাকা কাস্টম হাউজের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত এক বছরে বৈদেশিক মুদ্রা জব্দের হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭০ লাখ টাকা মূল্যের বৈদাশিক মুদ্রা জব্দ করে সংস্থাটি। কিন্তু ২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্থাটির বৈদেশিক

মুদ্রা জব্দের পরিমাণ ২৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ২০২০-২১ অর্থ বছরে ডলার জব্দের পরিমান শূন্যের কোটায় থাকলেও ২০২১ অর্থবছরে জব্দের পরিমাণ ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩৫ মার্কিন ডলার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবৈধ ডলার জব্দের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় প্রমাণ করছে ডলার পাচারের পরিমানও বেড়েছে। আর এসব ডলার অবৈধ ভাবে মানিচেঞ্জার থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে।

রাজধানীর আশকোনার মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটে দীর্ঘদিন ধরে নিবন্ধন না নিয়েই অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসা করছে ‘ইস্টল্যান্ড মানিচেঞ্জার, কসমিক মানিচেঞ্জার, কেএমসি মানিচেঞ্জার, সিএমসি মানিচেঞ্জার, সানসাইন মানিচেঞ্জার, ওয়াইএমসি মানিচেঞ্জার ও উত্তরা মানিচেঞ্জারসহ ১৬টি দোকান। গত সপ্তাহজুড়ে এসব দোকানের অধিকাংশই বন্ধ পাওয়া যায়।

মোবাইল ফোনে গতকাল বুধবার রাতে কথা হয় সানসাইন মানিচেঞ্জারের মালিক মো. নিয়াজ বিশ^াসের সঙ্গে। ডলারের বিনিময় দর চানতে চাইলে তিনি প্রথমে নাম পরিচয় জানতে চান। পরে জানেন ডলার আপাতত নেই। সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি বলেন, তার দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন।

গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, একেকটি প্রতিষ্ঠান মানিচেঞ্জারের নিবন্ধন নিয়ে দুই থেকে ১০টি পর্যন্ত শাখা খুলেছে। বেআইনিভাবে এসব শাখা খুলে অবৈধভাবে মানিচেঞ্জের রমরমা ব্যবসা করছে। এসব শাখা নিজের চালানোর পাশাপাশি বিপুল টাকার বিনিময়ে ভাড়াও দেওয়া হচ্ছে। সারাদেশে মানি এক্সচেঞ্জের এমন অন্তত ১২০০টি অবৈধ শাখা গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার ও প্রশাসনকে নিয়মিত মাসহারা দিয়েই এসব অবৈধ শাখা চলছে।

রাজধানীর মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার আদমজী কোর্টের তৃতীয় তলার ঠিকানায় উত্তরা মানিচেঞ্জারের ১৯৯৭ সালে নিবন্ধন নেওয়া। সেখানে তারা ব্যবসা পরিচালনা করছেন। আমাদের সময়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজধানীর আকশোনা মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের একই নামে একটি মানিচেঞ্জার পরিচালনা করা হচ্ছে। দোকান নম্বর জি-৬২। একই নামে একাধিক মানিচেঞ্জারের ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের মালিক ইরান আমাদের সময়কে বলেন, তারা কয়েক মাস ধরে মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটে প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন। মতিঝিলের দোকান তারা এখানে নিয়ে আসবেন। সেই কাগজপত্রও তৈরি হচ্ছে। একই নামে একাধিক দোকান চালানো অবৈধ তিনি নিজের স্বাীকার করে বলেন, কাগজপত্র হাতে পেলে শুধু আশকোনার দোকানটি চালাবেন। আপাতত দোকান বন্ধ রেখেছেন।

শুধু মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট নয়, ঢাকার মতিঝিল, ফার্মগেট ও গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সংখ্যক অবৈধ মানিচেঞ্জার বছরের পর বছর তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এসব অবৈধ মানিচেঞ্জারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- মতিঝিল বাণিজ্য এলাকার দোহার মানি এক্সচেঞ্জ, ওয়েলকাম মানি এক্সচেঞ্জ, গুলশান-২ এর মেট্রোপলিটন শপিং প্লাজার খান অ্যান্ড চৌধুরী মানিচেঞ্জার, প্লাডিয়াম মার্কেটের সোনারগাঁও ট্রাভেল ইন্টারন্যাশনাল, ল্যান্ড ভিউ শপিং সেন্টারের এজে মানিচেঞ্জারস লি., ফার্মগেটের এমএম মানি এক্সচেঞ্জ, ফার্মভিউ মার্কেটের জেএম মানিচেঞ্জার, এনবি মানিচেঞ্জার ও সেজান পয়েন্টের এসকে মানিচেঞ্জার।

মানিচেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মচারী ও মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি নিবন্ধন নিয়ে তারা একাধিক জায়গায় শাখা খুলেছে। কেউ নিজেই চালাচ্ছেন। আবার কেউ আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। অবৈধ এসব প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসা হুন্ডি। হুন্ডির মাধ্যমে তারা কোটি কোটি ডলার বিদেশে পাচার করে। হুন্ডি ব্যবসা করে তারা দ্রুতই বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেয়। টাকা যেভাবে আয় হয়, সেভাবে খরচও হয়। স্থানীয় প্রভাবশালীদের লাভের একটি অংশ দিতে হয়। স্থানীয় প্রশাসনও নিয়মিত মাসহারা নেয়। সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করেই এসব প্রতিষ্ঠান চলে। মাসহারা দিয়েই তারা বছরের পর বছর এসব প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রেখেছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তারা ঢাকাসহ সারাদেশে অবৈধ মানিচেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা তৈরি শুরু করেছে। এর মধ্যে বিপুলসংখ্যক অবৈধ মানিচেঞ্জার প্রতিষ্ঠান তারা খুঁজে পেয়েছে। এরমধ্যে হঠাৎ গজিয়ে উঠা অবৈধ মানিচেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আইন ভেঙ্গে শাখা খুলে অবৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সন্ধানও তারা পেয়েছে। শুধু নাম ভাড়া করেও বৈধ প্রতিষ্ঠান গুলো বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এসব বৈধ ও অবৈধ প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকা মূল্যের বৈদাশিক মুদ্রা পাচার করছে। এদের বড় অংশই হুন্ডির সঙ্গে জড়িত। মানি এক্সচেঞ্জের আড়ালে হুন্ডি ব্যবসা জমজমাট হওয়ায় হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদাশিক মুদ্রা কেন্দ্রী ব্যাংকের হিসাবে যোগ হচ্ছে না। আবার বিদেশ থেকে আসা বৈদাশিক মুদ্রা খোলা বাজার থেকে কিনে অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হচ্ছে।

গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশ ভ্রমণের সময় মানি এক্সচেঞ্জ থেকে কেনা অনেক যাত্রী অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ ডলার পাচার করছেন। ভিআইপি প্রটোকল নিয়ে বিদেশে যাওয়া যাত্রীরা নিবিঘেœ ঝক্কিঝামেলা ছাড়াই এসব ডলার বিদেশে নিয়ে যায়। এ ছাড়া ভ্রমণ, চাকরি, চিকিৎসা, ব্যবসাসহ নানা কারণে বাংলাদেশিদের বিদেশ যাওয়া যাত্রীরা অতিরিক্ত ডলার দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, নিবন্ধিত যেসব মানিচেঞ্জার অনিয়ম করছে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা অ্যাকশন নিচ্ছি। নিবন্ধনের বাইরে যারা আছেন, তাদের বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ব্যবস্থা নিচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা নিয়ম ভঙ্গকারী ও অবৈধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। ব্যাংকিং চ্যানেলে কেউ যাতে আন্ডার ইনভয়েস বা ওভার ইনভয়েসের মাধ্যমে ডলার পাচার করতে না পারে সেটি দেখভাল করা হচ্ছে। হুন্ডির মাধ্যমে ডলার পাচার ঠেকাতেও কাজ করা হচ্ছে।

নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের একাধিক শাখা খোলার ব্যাপারে তিনি বলেন, এটা খোলার কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি স্থান পরিবর্তন করতে চায় তা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমতি দিলেই কেবল স্থান পরিবর্তন করতে পারবে। যারা শাখা চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

এ জাতীয় আরও খবর

বিদায়ি বক্তব্যে কাঁদলেন মির্জা ফখরুল

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ১৪ কার্গো এলএনজি কিনবে সরকার

১২ জেলায় ঝড়ো হাওয়ার সতর্কতা

ময়মনসিংহে এনসিসি ব্যাংকের স্টুডেন্ট ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন ও বৃক্ষবিতরণ অনুষ্ঠিত

বিএসইসির ১৭ কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশকে ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকের সভা

জিয়া-খালেদার সমাধিতে বিএনপির নতুন ৪ নেতার শ্রদ্ধা

সমাজের সবাই এগিয়ে এলে বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতে বড় পতন

রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থেকে সেবা করতে চাই: মির্জা ফখরুল

গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে যা করবেন, যা করবেন না