,

অন্ধকার গর্তে হাতে-পায়ে শিকলবন্দী আব্দুল কাদেরের ৪ বছর

news-image

নাম আব্দুল কাদের। ৫৩ বছর বয়স। ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক এবং ১৯৮৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর স্নাতকে পড়া অবস্থায় এক দুর্ঘটনায় মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটে। এই আব্দুল কাদেরের বাড়ি সাদক্ষীরার তালা উপজেলার খেশরা ইউনিয়নের শাহাজাতপুর গ্রামে।

পারিবারিক সূত্রের মাধ্যমে জানা যায়, আব্দুল কাদের ওই এলাকার শওকত আলী মোড়লের ছয় সন্তানের মধ্যে সবার বড়। তারা তিন ভাই ও তিন বোন। প্রথম থেকেই তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না থাকায় শওকতের বিদ্যানুরাগী মনোভাব সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে। আর এ লক্ষ্যেই সামনের দিকে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছিলেন তারা।

বড় ছেলে আব্দুল কাদেরকে বাড়ির অদূরবর্তী হরিশচন্দ্র কলেজিয়েটে ইহ্নটিটিউটে ভর্তি করেন। সেখান থেকে ১৯৮২ সালে সুনামের সাথে মাধ্যমিক পাশ করার পর ভর্তি করান কপিলমুনি কলেজে। সেখান থেকে ১৯৮৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন একই কলেজে।

তবে ভাগ্য বিড়ম্বিত আব্দুল কাদেরকে আর এগুতে দেয়নি নির্মম নিয়তি। জমি-জমা সংক্রান্ত একটি পারিবারিক বিরোধ আকস্মিক থমকে দেয় তার গতিময় জীবন। যার জের ধরে তারই এক চাচাতো ভাই তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাল কাঠের রুল দিয়ে নির্মম নির্যাতন করে। এতে তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও চরমভাবে মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটে তার।

এরপর সর্বস্ব বিক্রি করে চিকিৎসায় সেবারের মত প্রাণে বেঁচে গেলেও আর ভালো হয়ে উঠেনি আব্দুল কাদের। বন্ধ হয়ে যায় তার পড়া-লেখা। এরপর কিছু দিন অন্তর অন্তর ঘটতে থাকে মাথায় গণ্ডগোল; স্থানীয় চিকিৎসায় আবার ভালো হয়ে ওঠা। এলাকাবাসীর পরামর্শে পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত আসে হয়ত দাম্পত্য জীবনে মস্তিষ্কের সফলতা অসতে পারে।

বিয়েও দেয়া হয় তাছলিমা নামে এক মেয়ের সাথে। দাম্পত্য জীবনে এক মেয়ে ফাতেমার জন্ম হয়। তবে মেয়ের জন্মের কিছুদিন পর তাছলিমার মৃত্যু ঘটে।

নিঃসঙ্গতায় ফের পাগলপ্রায় অবস্থা হয় তার। এরপর ফের তাকে জুলেখা নামে এক মেয়ের সাথে বিয়ে দেয়া হয়। নতুন করে দাম্পত্য জীবনে তাদের দু’কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। যার একজন আসমা খাতুন ও অপরজন চার বছরের ফাইম খাতুন।

আব্দুর কাদেরর দাম্পত্য জীবন শুরু হলেও সুখের হয়নি। ছোট মেয়ে ফাইমার জন্মের পরেই একেবারেই বিগড়ে যান কাদের। স্বজনদের ধরে মারপিট, ভাংচুর ও প্রতিবেশীদের ক্ষতিসাধন শুরু করতে থাকেন।

প্রতিদিন বাড়তে থাকে তার পাগলামি। এক পর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা বাধ্য হয়ে তাকে প্রথমে বারান্দায় হাতে-পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা শুরু করেন। তবে, সারাক্ষণ উচ্চস্বরে চিৎকার ও অশ্লীল বাক্যবানে বিরক্ত হয়ে পরিবারের লোকজন বাড়ি থেকে প্রায় ৩ শ’ ফুট দূরে বাগানের মধ্যে গাছে বেঁধে রাখা শুরু করেন। বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তানদের ফেলে এখন তার ঠাঁই হয়েছে বাড়ির পাশের বাগানের মধ্যে অন্ধকার গর্তে।

রাত-দিন ঝড়-বৃষ্টিতে এক হাত ও পায়ে শিকলে বাঁধা পড়েছে তার গদ্যময় নিঃসঙ্গ জীবন। সব আশা, আকাংখা, স্বপ্ন-সাধ আটকে গেছে আটো-সাটো একটি গর্ত ও তার উপর পড়ে থাকা একটি ছোট মেহগনি গাছের উপর। এভাবেই গত প্রায় ৪টি বছর অন্ধকার গর্তেই নিঃসঙ্গতায় কাটছে তার জীবন।

খবর পেয়ে বুধবার বিকেলে সরেজমিনে প্রতিবেদনকালে ঘটনাস্থলে গেলে চিরাচরিত স্বভাবেই দেখা যায় তাকে। তবে কথোপকথনে মোটেও মস্তিষ্ক বিকৃত বলে মনে হয়নি। প্রথম দেখাতেই সাংবাদিকদের দেখে সালাম দেন তিনি। তারপর একে একে তার জীবনের সব ঘটনার নির্ভুল বর্ণনা দিতে থাকেন। কখনো পুরনোকে মনে করে আবেগ আপ্লুত হতে দেখা যায় তাকে।

এসময় তিনি তার শৈশব-কৈশোরের সব স্মৃতির রোমন্থন করতে থাকেন। তবে তাকে করা সব প্রশ্নের উত্তর দেন মধুর কণ্ঠে সুরে সুরে। তবে কথার ফাঁকে ফাঁকে নিজের শিকলে বাঁধা জীবন থেকে ক্ষণিকের জন্য হলেও মুক্তির আকূতি জানান।

আব্দুল কাদের বলেন, আপনারা জানেন? আমি আমার ৪ বছরের মেয়ে ফাইমাকে কখনো কোলে নেইনি। আদর করা হয়নি কখনো তাকে। আমাকে দূর থেকে দেখেও ভয়ে পালিয়ে যায় বলে ফের কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি।

এক পর্যায়ে তার সরল স্বীকারোক্তির নির্ভুলতা যাচাই করতে তার ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি সুরে সুরে বলার পাশাপাশি খাতা-কলম চান লিখে দিতে। এরপর নির্ভুল ইংরেজিতে লেখেন তার বায়োডাটা। তবে কেন একজন সুস্থ-সবল মানুষকে ৪ বছর এভাবেই বেঁধে রাখা? এমন প্রশ্ন করতেই স্বজনদের কাদেরের মা ও স্ত্রীর মধ্যে শুরু হয় চোখাচোখি, কানাকানিসহ নানা ইশারা। যেন কিছু একটা গোপন করতে চাওয়া। তবে কেন তাদের এই গোপনীয়তা? নাকি নিরবতা?

একপর্যায়ে কাদেরের মা রহিমা বেগম (৭০) ছেলের উপর ঘটে যাওয়া নানা নির্যাতনের বর্ণনা শুরু করলে স্ত্রী জুলেখা তাতে বাঁধ সাধেন। যেন তাদের চোখে-মুখে তখন অন্য রকম এক ভীতি কাজ করছিল। কিছু একটা গোপন করতে চাইছেন তারা। তবে কথোপকথনের একপর্যায়ে মৃতপ্রায় কাদেরের একেবারে মৃত্যুর শঙ্কাটি বার বার সামনে এসে দাঁড়ায়। তবে কিসের সেই শঙ্কা?

এ ব্যাপারে কথা হয় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান প্রভাষক রাজিব হোসেন রাজুর সাথে। তিনি বলেন, এমন অবস্থায় একজন মানুষ তার ইউনিয়নে নির্মম জীবন-যাপন করছেন তা তার জানা ছিলো না। সম্প্রতি স্থানীয় এক ফায়ার সার্ভিস কর্মী শেখ আরিফুর রহমান আজগরের সহযোগিতায় দেখতে যান তাকে। তাৎক্ষণিক যৎসামান্য সহযোগিতাও করেছেন। তবে আব্দুল কাদেরের জন্য ভবিষ্যতে কিছু করার মানসিকতাও পোষণ করেন তিনি।

এ জাতীয় আরও খবর

কসবায় বিষাক্ত কেরির বড়ি সেবনে দুইজনের মৃত্যু

নবীনগরে এলসিএস কর্মীদের সঞ্চয়কৃত টাকার চেক বিতরণ

শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার: এমপি মান্নান

সংসদের তিন অধিবেশনে ব্যয় ৭০৩ কোটি টাকা, প্রতি সেকেন্ডে খরচ সাড়ে ৫ হাজারের বেশি

ট্রাইব্যুনালে বিস্ফোরক সাক্ষ্য: বিডিআর হত্যার প্রত্যক্ষদর্শীকে গুলি করে পেট চিরে নদীতে ফেলেন জিয়াউল আহসান

৫৫ বছর বয়স থেকেই তোলা যাবে পেনশনের টাকা

৫০ বছর পর ফের লজ্জার হারের সাক্ষী ইউনাইটেড

‘ইসলামবিরোধী’ হান্টকেই সৌদির রাষ্ট্রদূত বানাচ্ছেন ট্রাম্প

পুলিশের উচ্চপর্যায়ে বড় রদবদল

নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬: মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর ১১টি প্রধান পরিবর্তন

বাবা হারালেন সংগীতশিল্পী সালমা

বিশ্বজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে কমছে সঞ্চিত পানি : ডব্লিউএমও-র সতর্কবার্তা