শিল্পে গ্যাস সংযোগের অগ্রাধিকার ঠিক করতে কমিটি গঠন
অনলাইন ডেস্ক : দেশে গ্যাসের সংকটের মধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নতুন সংযোগ ও বিদ্যমান সংযোগের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গঠন করেছে সরকার। শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছ থেকে পাওয়া আবেদন পর্যালোচনা করে কোন প্রতিষ্ঠানকে আগে গ্যাস সরবরাহ করা যেতে পারে, সে বিষয়ে সুপারিশ দেবে কমিটি। আগামী সাত দিনের মধ্যে সুপারিশ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ১৩ অক্টোবর জারি করা এক অফিস আদেশে এ কমিটি গঠনের কথা জানায়। এর আগে ৮ অক্টোবর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রীর সভাপতিত্বে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় গ্যাস সরবরাহের আবেদনগুলো পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ও পেট্রোবাংলায় নতুন সংযোগ এবং বিদ্যমান সংযোগের লোড বাড়ানোর জন্য প্রায় দুই হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আবেদন জমা রয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এসব আবেদন নিষ্পত্তি এবং গ্যাস বণ্টনের অগ্রাধিকার নির্ধারণে জটিলতা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের মতামত নিয়ে সুপারিশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন বিকেএমইএ ও বিজিএমইএর একজন করে পরিচালক, বিটিএমইএর একজন প্রতিনিধি, বিটিএলএমইএর সভাপতি, বিটিএমএর সভাপতি, সাবেক পরিচালক প্রকৌশলী রাজীব হায়দার, গ্যাস বিতরণ ও বিপণন কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং জিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
কমিটির কার্যপরিধি অনুযায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর গ্যাস সংযোগসংক্রান্ত প্রস্তাব পর্যালোচনা করে সাত দিনের মধ্যে সুপারিশ দিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট এক বা একাধিক ব্যক্তিকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
এর ফলে গ্যাস সংযোগের আবেদন যাচাই এবং কোন প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা নির্ধারণে শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের মতামত গুরুত্ব পাবে। তবে চূড়ান্তভাবে কোন প্রতিষ্ঠান কতটুকু গ্যাস পাবে এবং কখন সরবরাহ শুরু হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও বাস্তব সরবরাহ সক্ষমতার ওপর।
গ্যাসসংকটে বাধাগ্রস্ত নতুন বিনিয়োগ
শিল্প খাতে গ্যাসের ঘাটতি উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ ও কারখানা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ না থাকলে উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে বস্ত্র, স্পিনিং, ডাইং, ওয়াশিং, সিরামিক, ইস্পাত, কাচ ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর শিল্পে সরবরাহের ঘাটতি উৎপাদন সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। গ্যাসের চাপ কমে গেলে অনেক কারখানায় যন্ত্রপাতি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎপাদন কমাতে হয়, আবার বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় ব্যয়ও বেড়ে যায়।
উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমার আশঙ্কা থাকে। রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা এবং নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়াও কঠিন হতে পারে।
এ ছাড়া জমি, অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের পরও গ্যাস সংযোগের নিশ্চয়তা না থাকলে উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে সতর্ক অবস্থান নিতে পারেন। এতে শিল্প স্থাপন ও বিদ্যমান কারখানার সম্প্রসারণ বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সীমিত গ্যাসে অগ্রাধিকার নির্ধারণের চ্যালেঞ্জ
নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সংযোগ দেওয়া এবং পুরোনো কারখানার উৎপাদন বাড়াতে অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহের চাহিদা থাকলেও সীমিত জোগানের কারণে সব আবেদন একসঙ্গে পূরণ করা কঠিন। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানির মাধ্যমে পাওয়া গ্যাস দিয়ে বিভিন্ন খাতের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে সরকারকে।
এ অবস্থায় কোন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অবদান বেশি, কোন আবেদন দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় গ্যাস সরবরাহের অবকাঠামোগত সক্ষমতা কতটুকু—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
শুধু আবেদন জমার ক্রমানুসারে সিদ্ধান্ত নিলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বাস্তব চাহিদা ও উৎপাদনগত গুরুত্ব যথাযথভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে। আবার সুস্পষ্ট মানদণ্ড ছাড়া অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হলে সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। এ কারণে যাচাইযোগ্য তথ্য ও অভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে সুপারিশ প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কমিটির সুপারিশেই কি কাটবে সংকট?
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি গঠনের ফলে শিল্প খাতের বাস্তব সমস্যা ও জ্বালানির চাহিদা সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণে এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করলেই গ্যাসসংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। এ জন্য গ্যাসের জোগান বাড়ানো, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন জোরদার, সরবরাহ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং বিদ্যমান গ্যাসের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।
পাশাপাশি আবেদন নিষ্পত্তিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং অনুমোদনের পর বাস্তবে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কতটি আবেদন নিষ্পত্তি হলো এবং কতটি প্রতিষ্ঠান গ্যাস পেল, তা প্রকাশ করা হলে উদ্যোগটির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা সহজ হবে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, নতুন কমিটির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা আবেদনগুলো নিষ্পত্তির পথ সহজ হবে। তবে সীমিত সরবরাহের মধ্যে শিল্পের চাহিদা পূরণ এবং নতুন বিনিয়োগের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করাই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।











