সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্রের সময় বাড়ল
অনলাইন ডেস্ক : বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র জমা দেওয়ার সময় বাড়িয়েছে পেট্রোবাংলা। আগামী ৩০ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দরপত্র জমা দিতে পারবেন আগ্রহী আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলো। কোম্পানিগুলোর অনুরোধ এবং তাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলার প্রত্যাশা, অনুসন্ধানসংক্রান্ত তথ্য ও উপাত্ত সহজে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়বে। এতে দেশের সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
গত ২৪ মে গভীর সমুদ্রের ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রের ১১টি ব্লকে অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্রের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার ডলার। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট কোনো ব্লক কিংবা পুরো অফশোর এলাকার জন্য প্রস্তাব জমা দিতে পারবে। ইতোমধ্যে টার্কিশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (টিপিএও), চায়না ন্যাশনাল অফশোর অয়েল করপোরেশন (সিএনওওসি)সহ তিনটি কোম্পানি দরপত্র কিনেছে।
এর আগে ২০২৪ সালের মার্চে একই ধরনের দরপত্র আহ্বান করা হলে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সনমবিলসহ সাতটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি আগ্রহ দেখিয়ে দরপত্র কিনেছিল। এর মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান অনুসন্ধানসংক্রান্ত তথ্যও সংগ্রহ করে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে শেষ পর্যন্ত কোনো কোম্পানি দরপত্র জমা দেয়নি। ফলে ওই প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়।
পরে দরপত্রে কোম্পানিগুলোর অংশ না নেওয়ার কারণ খতিয়ে দেখতে অন্তর্বর্তী সরকার একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে উৎপাদন ও বণ্টন চুক্তিতে (পিএসসি) বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যে গভীর সমুদ্র থেকে স্থলভাগ পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের ব্যয়, ডব্লিউপিপিএফ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করা এবং গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের শর্ত সংশোধন উল্লেখযোগ্য।
সংশোধিত শর্ত অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দামের ভিত্তিতে গভীর সমুদ্রের গ্যাসের মূল্য ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ শতাংশ করা হয়েছে। অগভীর সমুদ্রের ক্ষেত্রে এ হার নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ১০ শতাংশ। আগের মডেল পিএসসি-২০১৯ অনুযায়ী, অগভীর ও গভীর সমুদ্রের গ্যাসের জন্য যথাক্রমে ৫ দশমিক ৬ ও ৭ দশমিক ২৫ ডলার স্থির মূল্য নির্ধারিত ছিল।
২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্রাঞ্চলের অধিকার পায়। তবে বিশাল এই এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে এখনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার কাছাকাছি অঞ্চল থেকে মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস উত্তোলন করছে।
বাংলাদেশ এর আগে বিভিন্ন সময়ে সমুদ্রাঞ্চলে অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিলেও প্রত্যাশিত ফল পায়নি। ২০০৮ সালে ডিএস-১০ ও ডিএস-১১ ব্লকে মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি হয়। গ্যাসের দামসহ কয়েকটি শর্ত পরিবর্তনের দাবি পূরণ না হওয়ায় ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম ছেড়ে চলে যায়।
২০১২ সালের দরপত্র প্রক্রিয়ায় ওএনজিসি ভিদেশ লিমিটেডের সঙ্গে এসএস-৪ ও এসএস-৯ ব্লকের চুক্তি হয়। পরে ২০১৭ সালে এসএস-১২ ব্লকে পসকো দাইয়ুর সঙ্গে চুক্তি হলেও ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি ব্লক ছেড়ে দেয়। ২০১৬ সালে সর্বশেষ দরপত্র আহ্বানের পর ২০১৯ সালে উৎপাদন ও বণ্টন চুক্তি হালনাগাদ করা হয়। এরপর নতুন দরপত্র আহ্বান করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।
এদিকে দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বাড়ছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, আট শ্রেণির গ্রাহকের অনুমোদিত দৈনিক গ্যাস লোড ৫ হাজার ৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে প্রকৃত চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। দেশীয় উৎস ও আমদানি মিলিয়ে প্রতিদিন সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে দৈনিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
একসময় দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন প্রায় ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছিল। বর্তমানে তা কমে প্রায় ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়া এবং চাহিদা বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গ্যাসের সংকটে নতুন সংযোগ ও শিল্প সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ অবস্থায় সমুদ্রাঞ্চলে অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময় বাড়ানোর মাধ্যমে আরও বেশি বিদেশি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করা এবং দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নতুন উৎস খুঁজে পাওয়ার প্রত্যাশা করছে পেট্রোবাংলা।










