গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদে ব্রিটেনে জোরালো হচ্ছে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ঘিরে ব্রিটেনে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিক্ষোভ, তহবিল সংগ্রহ ও নাগরিক আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার ও আইনি পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্কও বাড়ছে।
স্কটল্যান্ডের এডিনবরার কাছে বসবাসকারী ৫২ বছর বয়সী ক্লেয়ার কয়েক বছর আগেও নিজেকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় মনে করতেন না। প্রশাসনিক চাকরি, কুকুর নিয়ে সময় কাটানো, বই পড়া ও বেকিং নিয়েই ছিল তাঁর জীবন। গাজা যুদ্ধের পর সেই অবস্থান বদলে যায়।
ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-এর প্রতি সমর্থনের অভিযোগে বর্তমানে আইনি জটিলতার মুখে রয়েছেন ক্লেয়ার। তাঁর বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হওয়া এবং অন্যদের সংগঠনটিতে যুক্ত হতে উৎসাহিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ক্লেয়ারের ভাষ্য, ২০২৩ সালে গাজা নিয়ে লেখা একটি বই পড়ার পর তিনি সংঘাতের ঘটনাপ্রবাহ আরও গভীরভাবে অনুসরণ করতে শুরু করেন। পরে ফিলিস্তিনপন্থী সমাবেশে যোগ দেওয়া, আইনপ্রণেতাদের কাছে চিঠি লেখা এবং ফিলিস্তিনি ত্রাণ কার্যক্রমে অর্থ সংগ্রহের মতো কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন তিনি।
২০২৫ সালে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের পর সেই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও অংশ নেন ক্লেয়ার। তাঁর দাবি, জীবনে আগে কোনো অপরাধে জড়িত না থাকলেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শুধু ক্লেয়ার নন, অবসরপ্রাপ্ত ৭০ বছর বয়সী মার্জিও গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন। ২০২৩ সালের আর্মিস্টিস ডেতে ‘এখনই যুদ্ধবিরতি’ দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভে অংশ নেন তিনি। পরে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের কারণে তাঁর ও তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধেও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
মার্জির পরিবারে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক থাকলেও গাজা ইস্যুতে তাঁর অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। তিনি মনে করেন, যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানানো এবং ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের পক্ষে কথা বলা অপরাধ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
ব্রিটেনে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে আন্দোলনে এখন শিল্পী, শ্রমিক, রেলকর্মী, আর্থিক খাতের কর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের অন্যতম দাবির মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করা এবং দেশটির সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করা।
‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নিষিদ্ধ হওয়ার পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে অহিংস অসহযোগ ও নাগরিক অবাধ্যতার কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্রিটেনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। লন্ডনে একটি ইহুদি সংগঠনের কার্যালয়ের বাইরে বিক্ষোভের ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।
গাজা যুদ্ধ ব্রিটিশ সমাজের একটি অংশের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এনেছে। আন্দোলনকারীদের অনেকে মনে করছেন, ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডে ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা নিয়ে আরও কঠোর প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া আর ইহুদিবিদ্বেষকে এক করে দেখার বিরোধিতা করছেন আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ। তাঁদের বক্তব্য, ইহুদি জনগোষ্ঠী ও ইসরায়েলি সরকারের নীতির সমালোচনাকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
২০২৩ সালের শেষ দিকে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নের অংশগ্রহণে ‘ওয়ার্কার্স ফর ফ্রি প্যালেস্টাইন’ নামে একটি প্ল্যাটফর্মও গড়ে ওঠে। সংগঠনটির দাবি, নিজেদের শ্রম ও পেশাগত ভূমিকা কীভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়ে অনেক কর্মীর উদ্বেগ রয়েছে।
আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ আইনি ঝুঁকি ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। তাঁদের মতে, নীরব থাকার চেয়ে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করাকেই তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।
ফলে গাজা যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত হিসেবে নয়, ব্রিটেনের রাজনীতি, নাগরিক স্বাধীনতা, প্রতিবাদ করার অধিকার এবং সরকারের পররাষ্ট্রনীতিকে ঘিরেও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।











