টরন্টো উৎসবে নাগাল্যান্ডের ‘আংহ’র বড় সাফল্য
অনলাইন ডেস্ক : ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য নাগাল্যান্ডের কোন্যাক ভাষার চলচ্চিত্র ‘আংহ’ টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্ল্যাটফর্ম পুরস্কার পেয়েছে। স্বতন্ত্র নির্মাণশৈলী ও ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ছবিটিকে এই জুরি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
পরিচালক থেজা রিওর এটি প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ছবির অভিনয়শিল্পীদের বড় একটি অংশেরও আগে চলচ্চিত্রে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল না। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন স্বীকৃতি ছবিটির জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
জুরির পক্ষ থেকে ছবিটির নতুন ধরনের উপস্থাপন এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত একটি জনগোষ্ঠীর জীবন তুলে ধরার প্রশংসা করা হয়েছে। এই পুরস্কারের কারণে ‘আংহ’ ২০২৭ সালের অস্কারের আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তবে এর অর্থ ছবিটি ইতোমধ্যে অস্কারে মনোনয়ন পেয়েছে—এমন নয়।
‘আংহ’র গল্পের সময়কাল ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকের নাগাল্যান্ড। এতে কোন্যাক সম্প্রদায়ের এক প্রবীণ বংশানুক্রমিক প্রধান আহংবা এবং তার তরুণ ছেলের জীবন ও পারস্পরিক সম্পর্কের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। তখন নাগা সমাজে দ্রুত পরিবর্তন আসছিল এবং পুরোনো বিশ্বাস ও নতুন ধর্মীয়-সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে তৈরি হচ্ছিল নানা টানাপোড়েন।
গল্পে আহংবা পূর্বপুরুষদের বিশ্বাস ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে চান। অন্যদিকে তার ছেলে নতুন সময়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে এক মার্কিন ধর্মপ্রচারকের আগমন বাবা-ছেলের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
পরিচালক থেজা রিও জানান, কয়েক বছর আগে নাগাল্যান্ডের মোন এলাকায় যাওয়ার সময় তিনি গল্পটির ভাবনা পান। সেখানে একই পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্মের জীবনযাত্রায় অতীত ও বর্তমানের পাশাপাশি অবস্থান তাকে ভাবিয়ে তোলে।
কোন্যাকরা নাগাল্যান্ডের প্রধান জনগোষ্ঠীগুলোর একটি এবং মূলত রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের মোন জেলায় তাদের বসবাস। খ্রিষ্টধর্মের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাস, সামাজিক রীতি ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসে। চলচ্চিত্রটিতে সেই পরিবর্তনের সময়কে কেন্দ্র করেই গল্প এগিয়েছে।
কোন্যাক সমাজের গবেষক ড. বি আমো কোন্যাকের মতে, ওই সময়ের পরিবর্তনে কিছু পুরোনো ঐতিহ্য হারিয়ে যায়, আবার কিছু প্রথা প্রবীণদের স্মৃতি ও পারিবারিক সামগ্রীর মাধ্যমে টিকে থাকে। সময়ের সঙ্গে এসব ঐতিহ্যের অর্থ ও ব্যবহারও বদলে যায়।
চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে কোন্যাক জনগোষ্ঠীকে শুধু অতীতের একটি বিচ্ছিন্ন সম্প্রদায় হিসেবে নয়, বরং ভালোবাসা, শোক, বিশ্বাস, দ্বন্দ্ব ও প্রজন্মগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন পরিচালক।
রিও আরও জানান, নাগাল্যান্ড নিয়ে নির্মিত অনেক কাজেই বাইরের পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেয়েছে। ‘আংহ’-এ তিনি সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসে কোন্যাক চরিত্রগুলোর অবস্থান থেকে গল্প বলার চেষ্টা করেছেন। স্থানীয় পরামর্শদাতারা সংলাপ, পোশাক ও শিল্প নির্দেশনার কাজে যুক্ত ছিলেন।
ছবিটির দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে ১৬ মিলিমিটার ফিল্মে। পরিচালক ও চিত্রগ্রাহক অ্যাডাম পিয়েতকেভিচ ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে নাগা সমাজ এবং ধর্মপ্রচারকদের ধারণ করা পুরোনো ছবি ও ভিডিও থেকে দৃশ্যগত অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। সেই সময়ের ছবির দানাদার আবহ ধরে রাখার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরাই ছিল তাদের লক্ষ্য।
ফিল্মে শুটিংয়ের কারণে নির্মাণকাজে বেশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে নির্মাতাদের। ধারণ করা ফুটেজ তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যেত না। কয়েক দিন পর পর ফিল্ম মুম্বাইয়ে পাঠিয়ে প্রক্রিয়াজাত করতে হতো। ফলে শুটিং শেষ হওয়ার আগে অনেক দৃশ্যের ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ ছিল না।
প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি হয়েও ‘আংহ’র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। সমালোচকদের আলোচনায় আসামের রিমা দাস ও মেঘালয়ের ডমিনিক সাংমার মতো নির্মাতাদের কাজও উঠে এসেছে।
পরিচালক রিও মনে করেন, নাগাল্যান্ডের চলচ্চিত্রশিল্প এখনো বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে। সেখানে অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা সীমিত হলেও অনেক নির্মাতার কাছে বলার মতো গল্প রয়েছে। ‘আংহ’কে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ ভবিষ্যতে নাগাল্যান্ডের চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করছেন তিনি।











