জাতিসংঘে ট্রাম্পের বক্তব্যের একাধিক দাবি নিয়ে প্রশ্ন: সিএনএন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কয়েকটি দাবিকে অসত্য, বিভ্রান্তিকর বা অতিরঞ্জিত হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিএনএনের ফ্যাক্টচেক।
মঙ্গলবারের প্রায় ৩৭ মিনিটের ভাষণে ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি বিনিয়োগ, সামরিক অস্ত্রের মজুত এবং ওয়াশিংটন ডিসির অপরাধ পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দেন।
ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আটটি যুদ্ধ বন্ধ করেছেন। এর মধ্যে কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড, কসোভো-সার্বিয়া, রুয়ান্ডা-ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ভারত-পাকিস্তান, আর্মেনিয়া-আজারবাইজান এবং গাজার সংঘাতের কথা উল্লেখ করেন।
তবে সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মিসর-ইথিওপিয়ার বিরোধটি মূলত বাঁধ নির্মাণকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক বিরোধ ছিল, যুদ্ধ নয়। একইভাবে ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদে কসোভো ও সার্বিয়ার মধ্যে কোনো যুদ্ধ হয়নি। রুয়ান্ডা ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর সংঘাতও পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গাজায় যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকার কথা বলা হয়েছে।
ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের স্বল্পমেয়াদি সংঘাত থামলেও ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবার ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছে বলে সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দাবি
ট্রাম্প তার বক্তব্যে দাবি করেন, একসময় বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে। পরে পৃথিবী উষ্ণ না হয়ে ঠান্ডা হতে থাকায় ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’-এর নাম বদলে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিএনএনের ফ্যাক্টচেক বলছে, এ বক্তব্যের কয়েকটি অংশ সঠিক নয়। ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ ও ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যবহৃত দুটি পৃথক শব্দ। প্রথমটি মূলত দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে বোঝায়, আর দ্বিতীয়টি জলবায়ুর বিস্তৃত পরিবর্তনকে নির্দেশ করে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা ১১ বছর রেকর্ডের উষ্ণতম বছরগুলোর তালিকায় ছিল। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ ছিল রেকর্ডের তিন উষ্ণতম বছর। ফলে পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার দাবি সাম্প্রতিক তাপমাত্রার তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
২০১৮ সালের একটি জলবায়ু প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার সুযোগ বজায় রাখতে দ্রুত কার্বন নিঃসরণ কমানো প্রয়োজন। সেখানে ১২ বছরের মধ্যে মানুষ মারা যাবে—এমন কোনো বক্তব্য ছিল না।
২১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের দাবি
ট্রাম্প আরও বলেন, তার প্রশাসন বিভিন্ন দেশ থেকে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। তবে এই অঙ্কের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি পাওয়া যায়নি বলে সিএনএনের ফ্যাক্টচেকে উল্লেখ করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বড় বিনিয়োগের ঘোষণার পরিমাণ হিসেবে ১১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের কথা বলা হয়েছিল। ওই হিসাবের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক ঘোষণা, বাণিজ্যিক প্রতিশ্রুতি ও সরাসরি বিনিয়োগ নয়—এমন কিছু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অস্ত্রের মজুত নিয়ে ভিন্ন তথ্য
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রসঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত এত বেশি যে তা পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে নজিরবিহীন হারে নতুন অস্ত্র উৎপাদনের কথাও বলেন তিনি।
তবে সাম্প্রতিক সরকারি কিছু প্রতিবেদনে মার্কিন অস্ত্রের নির্দিষ্ট কয়েকটি মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। প্রতিরক্ষা বিভাগের মহাপরিদর্শকের এক প্রতিবেদনে যুদ্ধের কারণে কিছু অস্ত্রের কৌশলগত মজুত কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতির কথা জানিয়েছে।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ সামগ্রিক অস্ত্রভাণ্ডারে ঘাটতির দাবি নাকচ করেছে।
ওয়াশিংটনে অপরাধ কমার দাবিও বিতর্কিত
ওয়াশিংটন ডিসিতে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে বলে জাতিসংঘে দাবি করেন ট্রাম্প। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার সময় শহরটি অপরাধে জর্জরিত থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে।
তবে স্থানীয় পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সোমবার পর্যন্ত ওয়াশিংটনে ১৫ হাজারের বেশি অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় মোট অপরাধ কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ। ফলে সামগ্রিক অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমার দাবির সঙ্গে এসব পরিসংখ্যানের মিল নেই।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউস কিছু নির্দিষ্ট অপরাধের হার কমার তথ্য তুলে ধরলেও সেগুলো দিয়ে শহরের সামগ্রিক অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে—এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরান-ইসরায়েল সংঘাত, ইউক্রেন, অভিবাসন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়েও বিভিন্ন বক্তব্য দেন। সিএনএনের ফ্যাক্টচেকে এসব বক্তব্যের কয়েকটির তথ্যগত ভিত্তি ও উপস্থাপন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।











