অনলাইন ডেস্ক : নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রচারের নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন আচরণবিধিতে মিছিল, পোস্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাইক, বিলবোর্ড, নির্বাচনী ক্যাম্প, সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহারসহ বিভিন্ন প্রচার কার্যক্রমে নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আচরণবিধির গেজেটে এসব বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচনের আচরণবিধিও শিগগির গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভিন্ন ধরনের আচরণবিধি ছিল। এবার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ায় নতুন করে বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থক সিটি নির্বাচনী এলাকায় পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উপকরণে তৈরি লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ব্যানার বা প্রচারসামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে। ভবন, দেয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুতের খুঁটি, সরকারি স্থাপনা, সেতু, কালভার্ট, মেট্রোরেল পিলার ও ফ্লাইওভারসহ বিভিন্ন স্থানে প্রচারসামগ্রী লাগানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের ফল গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত প্রকাশ্য মিছিল বা শোভাযাত্রাও করা যাবে না। একই সঙ্গে ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল, নৌযান, ট্রেনসহ বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করে নির্বাচনী মিছিল আয়োজন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচারের ক্ষেত্রেও কঠোরতা আনা হয়েছে। ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমানজনক বক্তব্য, মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করতে পারে—এমন কোনো কনটেন্ট প্রচার করা যাবে না। এআই ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্টও নিষিদ্ধ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, লিঙ্গ বা সামাজিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়াও আচরণবিধির আওতায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ভোটার স্লিপ বিতরণের ক্ষেত্রেও সীমা নির্ধারণ করেছে ইসি। ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে ভোটার স্লিপ বিতরণ করা যাবে না। স্লিপে প্রার্থীর নাম, ঠিকানা, প্রতীক ও ভোটের সময়ের মতো তথ্য রাখা গেলেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নাম, ছবি বা প্রতীক এমনভাবে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ, যাতে ভোটার বিভ্রান্ত হন।
মাইক ও শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহারের সময়ও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। দুপুর ১২টার আগে এবং সূর্যাস্তের পর মাইক ব্যবহার করা যাবে না। শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৬০ ডেসিবেলের মধ্যে রাখতে হবে এবং একটি ওয়ার্ডে একটির বেশি মাইক ব্যবহার করা যাবে না।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রার্থীর পক্ষে সরকারি গাড়ি, প্রচারযন্ত্র বা সরকারি অন্য কোনো সুবিধা ব্যবহার করা যাবে না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও নির্বাচনী কাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, মেয়র, প্রশাসক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও প্রার্থী ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।
বিলবোর্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমা রাখা হয়েছে। একটি বিলবোর্ডের সর্বোচ্চ আকার হতে পারবে ১৬ ফুট বাই ৮ ফুট এবং প্রতি ওয়ার্ডে একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ একটি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন। জনসাধারণ ও যানবাহনের চলাচল কিংবা পরিবেশের ক্ষতি হয়—এমন স্থানে বিলবোর্ড স্থাপন করা যাবে না।
নির্বাচনী প্রচারে হেলিকপ্টার বা অন্য কোনো আকাশযান ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয়নি। ভোটের দিন ভোটারদের আনা-নেওয়ার জন্য যানবাহন ভাড়া বা ব্যবহার করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া নির্বাচনী ব্যয়সীমা মেনে চলা, সভা আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া এবং ঘরোয়া সভার নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পেশিশক্তির ব্যবহার, অপপ্রচার, ধর্মের অপব্যবহার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনী প্রচারও নিষিদ্ধ।
আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা ইসিকে দেওয়া হয়েছে। রেকর্ড বা লিখিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো মেয়র বা কাউন্সিলর প্রার্থী কিংবা তার নির্বাচনী এজেন্ট আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন বা ভঙ্গের চেষ্টা করেছেন বলে মনে হলে কমিশন তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রার্থিতা বাতিলের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ছয় মাস কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
ইসি জানিয়েছে, আগামী নভেম্বরের শেষ দিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু হতে পারে।