,

সালমান শাহ, আজও দর্শকের হৃদয়ে অমলিন

news-image

বিনোদন ডেস্ক : বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ। পর্দায় তার উপস্থিতি, অভিনয়ের স্বাভাবিকতা ও নিজস্ব ফ্যাশন-স্টাইল নব্বইয়ের দশকে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। অল্প সময়ের ক্যারিয়ারেই তিনি এমন জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, যা মৃত্যুর তিন দশক পরও অটুট রয়েছে।

১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় সালমান শাহর। প্রথম ছবিতেই দর্শকদের নজর কাড়েন তিনি। তার অভিনয়ে ছিল সাবলীলতা, চেহারায় তারুণ্যের ছাপ আর পোশাক-পরিচ্ছদে ছিল সময়ের তুলনায় আধুনিকতার প্রকাশ।

সালমান শাহর প্রকৃত নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরীর বড় ছেলে সালমানের অভিনয়জীবনের শুরু অবশ্য চলচ্চিত্র দিয়ে নয়। ১৯৮৫ সালে বিটিভির ‘আকাশ ছোঁয়া’ নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশনে তার পথচলা শুরু হয়।

এরপর ‘দেয়াল’, ‘সব পাখি ঘরে ফেরে’, ‘সৈকতে সারস’, ‘নয়ন’সহ বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেন তিনি। তবে চলচ্চিত্রে পা রাখার পরই তার জনপ্রিয়তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

অভিনয়ের পাশাপাশি সালমান শাহর ফ্যাশনও তাকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। শার্ট, টি-শার্ট, জিনস, সানগ্লাস কিংবা চুলের নানা স্টাইল—সবকিছুতেই ছিল তার নিজস্ব ছাপ। নব্বইয়ের দশকের তরুণদের পোশাক ও চুলের স্টাইলে তার প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার পুরোনো ছবি ও ফ্যাশন নতুন করে আলোচনায় আসে।

চলচ্চিত্রে সালমান শাহর অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় তার বিভিন্ন নায়িকার সঙ্গে জুটি। ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমায় মৌসুমীর সঙ্গে তার জুটি দর্শকপ্রিয়তা পায়। পরে ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘দেনমোহর’ ও ‘স্নেহ’ সিনেমাতেও তারা একসঙ্গে অভিনয় করেন।

তবে শাবনূরের সঙ্গে সালমান শাহর জুটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত। ‘তুমি আমার’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘বিক্ষোভ’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘জীবন সংসার’, ‘মহামিলন’, ‘বিচার হবে’ ও ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’সহ একাধিক সিনেমায় তারা একসঙ্গে অভিনয় করেন। তাদের রোমান্টিক জুটি এখনো ঢাকাই চলচ্চিত্রের দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

এ ছাড়া শাবনাজের সঙ্গে ‘আঞ্জুমান’, ‘আশা ভালোবাসা’ ও ‘মায়ের অধিকার’, লিমার সঙ্গে ‘প্রেমযুদ্ধ’ ও ‘কন্যাদান’, শাহনাজের সঙ্গে ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ এবং সোনিয়ার সঙ্গে ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ ও ‘প্রিয়জন’ সিনেমায় অভিনয় করেন সালমান। বিভিন্ন নায়িকার সঙ্গে তার জুটি দর্শকের মধ্যে আলাদা জনপ্রিয়তা তৈরি করেছিল।

তার অভিনীত সিনেমাগুলোর গানের জনপ্রিয়তাও ছিল ব্যাপক। নব্বইয়ের দশকের তরুণদের কাছে এসব গান শুধু সিনেমার অংশ ছিল না, বরং ব্যক্তিগত আবেগ ও স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে ছিল।

সালমান শাহর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় তার আকস্মিক মৃত্যু। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়। তখন তিনি ছিলেন ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়ের একজন তারকা।

মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্রজীবনে সালমান শাহ যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তার মৃত্যুর পর সেটিই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে কোনো সংশয় নেই—বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তার চলে যাওয়া তৈরি করেছে এমন এক শূন্যতা, যা আর পূরণ হয়নি।

নির্মাতা ছটকু আহমেদের মতে, চরিত্রকে নিজের মধ্যে ধারণ করার ক্ষেত্রে সালমান শাহর তুলনা ছিল না। প্রতিটি চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে তার পরিশ্রম, প্রস্তুতি ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল। একই কারণে তিনি তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুসরণীয় একজন তারকায় পরিণত হয়েছিলেন।

চিত্রনায়ক অমিত হাসানও সালমানের আন্তরিকতার কথা স্মরণ করেছেন। তার ভাষ্য, সালমানের সঙ্গে কয়েকবার দেখা হলেও প্রতিবারই তার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। আর চিত্রনায়িকা শাবনাজ জানিয়েছেন, সিনিয়র শিল্পীদের প্রতি সালমানের সম্মান ছিল উল্লেখ করার মতো। শুটিং সেটে তার উপস্থিতি মানেই ছিল হাসি-আনন্দ আর আড্ডায় প্রাণবন্ত পরিবেশ।

সালমান শাহ নেই, নতুন কোনো সিনেমায় তার অভিনয়ও দেখা যায় না। তবু দর্শকের ভালোবাসায় তিনি এখনো জীবন্ত। সময় বদলেছে, চলচ্চিত্রের ধরন বদলেছে, নতুন প্রজন্ম এসেছে—কিন্তু সালমান শাহর তারুণ্য, অভিনয় ও স্টাইলের আবেদন এখনো ম্লান হয়নি।