বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নিয়ে গণশুনানি শুরু

লুৎফর রহমান কাকন
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী গণশুনানি শুরু হয়। শুনানিতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবসহ শিল্প খাতসংশ্লিষ্টরা। শুনানিতে অংশ নিয়ে তারা দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিভাগের বিদায়ী সচিব ফারজানা মমতাজ বিদ্যুতের দাম বাড়াতে সরকারের মন্ত্রিসভা কমিটিতে চিঠি প্রেরণ করেন। পরে সেই চিঠির প্রেক্ষিতে সরকার অধিকতর পর্যালোচনা করতে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সেই কমিটিতে বাণিজ্যমন্ত্রী, বিদ্যুৎ ও জ¦ালানিমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ বিভগের সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব, জ¦ালানি সচিব রয়েছেন। ওই কমিটির দ্বিতীয় সভা গত ২৭ এপ্রিল অর্থ বিভাগে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয় বিদ্যুৎতের পাইকারি ও খুচরা দাম সমন্বয়ের। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বিইআরসিতে দাম বাড়াতে প্রস্তাব করে।

ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির গণশুনানি।

দুই দিনব্যাপী আয়োজিত গণশুনানির প্রথম দিনে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বাবিউবো) পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করে। এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বিভিন্ন শ্রেণির ভোক্তরা বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে সব ধরনের পণ্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে। একই সঙ্গে শিল্প খাত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

দুই দিনব্যাপী গণশুনানির প্রথম দিনে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা বিপিডিবি পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে দেশের ছয়টি বিতরণ কোম্পানি খুচরা পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের জন্য ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির আবেদন জমা দিয়ে রেখেছে বিইআরসিতে। আজ বৃহস্পতিবার খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যহার নিয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

প্রথম দিনর শুনানিতে দেওয়া বক্তব্যে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করা হলে বিইআরসি ‘গণশত্রুতে’ পরিণত হবে। মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে বার বার বলা হচ্ছে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। কিন্তু সরকার তো জনগণের টাকাতেই ভর্তুকি দেয়। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে আইনের দোহাই দিয়ে সবচেয়ে বেশি বেআইনি কাজ করা হয়েছে এবং এতে বিইআরসি সহায়তা করেছে। ৫ আগস্টের পর দেশে অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও বিইআরসিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কমিশন বলছে আইন অনুযায়ী তাদের ক্ষমতা নেই। কিন্তু যেখানে সংবিধান পরিবর্তনের আলোচনা হতে পারে, সেখানে বিইআরসি আইন পরিবর্তন অসম্ভব নয়। বিইআরসি জনগণের পক্ষ না নিয়ে অবৈধ প্রস্তাবদাতাদের পক্ষ নিচ্ছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন মিয়া বলেন, এই মুহূর্তে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হবে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। বর্তমানে দেশের রপ্তানি খাত নিম্নমুখী অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে শিল্প খাত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারাবে। তিনি বলেন, একসময় তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ চীনের পরেই ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই অবস্থান দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তাই কোনো অবস্থাতেই বিদ্যুতের মূল্যহার বাড়ানোর সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, বর্তমান আইনে বিইআরসি শুধু দাম বাড়ানোর সুপারিশ নিয়েই শুনানি করতে পারে, দাম কমানোর সুপারিশ নিয়ে নয়। তাই বিইআরসি আইন সংশোধন করে জনগণের স্বার্থ রক্ষার আইন করতে হবে এবং কোনো অজুহাতেই বিদ্যুতের দাম যাতে বাড়ানো না হয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর গত দুই বছরের বেশি সময়ে বিদ্যুৎ উৎপানের মূল জ্বালানি গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে জ্বালানির মূল্য অনেক ক্ষেত্রে ডলারে পরিশোধ করতে হয়। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।

বিপিডিবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘ট্রান্সমিশন লসের বিষয়টিও বিপিডিবিকে বহন করতে হচ্ছে। বিপিডিবি প্রকৃত সিস্টেম লস ৩ দশমিক ০৭ শতাংশ ধরে হিসাব করেছে, যেখানে বিইআরসি ২ দশমিক ৭ শতাংশ বিবেচনা করেছে। এ ছাড়া উৎসে করসহ বিভিন্ন ব্যয়ও বিপিডিবির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বর্তমানে মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কোথাও কয়েক মিনিট বিদ্যুৎ না থাকলেও অভিযোগ আসে। তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে যথাযথ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করতে পারলে উৎপাদনে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। সরকারের পক্ষেও প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি বহন করা কঠিন। এ কারণে একটি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ তৈরি করতেই মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব আনা হয়েছে।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ নীতিমালায় কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে এবং সরকার এ বিষয়ে কাজ করছে। বিপিডিবির দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনা জরুরি। ইউরোপের অনেক দেশ ইতোমধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চলে গেছে। ভারতে শুধু সৌরবিদ্যুৎ ২০ শতাংশের বেশি এবং বায়ুবিদ্যুৎ ১০ শতাংশের বেশি। পাকিস্তানেও সৌরবিদ্যুতের অংশ ৩০ শতাংশের বেশি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুতের দিকে এগোতে পারলে ভবিষ্যতে উৎপাদন ব্যয় কমে আসবে। এতে জনগণের ওপর বিদ্যুতের মূল্যজনিত চাপও হ্রাস পাবে।

এদিকে পিডিবির গণশুনানির পর দুপুরে বিদ্যুতের সঞ্চালন চার্জ বা হুইলিং চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)। সংস্থাটি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের সঞ্চালন চার্জ বর্তমান ৩০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪৯ পয়সা করার আবেদন জানিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিটে ১৯ পয়সা বা প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সঞ্চালন চার্জ বাড়তে পারে। পিজিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং গ্রিড পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ এ প্রস্তাবনা উপস্থাপনা করেন।

 

এ জাতীয় আরও খবর

নবীনগরে সাড়ে তিন মাস পর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, গ্রেপ্তার ৬

নবীনগরে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নানকে আইনজীবী সমিতির সংবর্ধনা

ধর্মীয় নেতাকে ফাঁসানোর অভিযোগ, বরখাস্ত পুলিশ কর্মকর্তা

মঙ্গলবার শপথ নিচ্ছেন মির্জা ফয়সল ও এলিজা জামান

২০২৭ সালের সরকারি ছুটির তালিকা অনুমোদন, সাধারণ ছুটি ১৫ দিন

৩৫ হাজার টাকায় সিজার, কয়েক ঘণ্টা পর প্রসূতির মৃত্যু; উধাও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ

১২ হাজার ৫০০ টাকায় শ্রমিকের সংসার চলে কীভাবে? প্রশ্ন সাদিকের

১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ২২৩ টাকা

ভাঙ্গায় দুই মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে কলেজছাত্রসহ নিহত ২

সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে নতুন আইন, মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদন

মাঠ দখলে দলবদলের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের পর বিএনপির প্রভাব: নাহিদ

শ্রমিক আন্দোলনে স্কুলছাত্রের মৃত্যুর গুজব, সুস্থ আছে সামি