,

নজিরবিহীন সংকটে যুক্তরাজ্যের রাজনীতি ও অর্থনীতি

news-image

অনলাইন ডেস্ক : ক্ষমতা পাওয়ার মাত্র দেড় মাসের মাথায় পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস। লিজ ট্রাসের পদত্যাগের ঘোষণা যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে গভীর সংকট তৈরি করেছে। আর লিজ ট্রাসের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে থেকেই দেশটির অর্থনীতিও টালমাটাল অবস্থায় ছিল। ফলে এক নজিরবিহীন সংকটে পড়েছে যুক্তরাজ্য।

ট্রাস ক্ষমতায় আসার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সময়ের অশান্ত অবস্থা শেষ হবে বলে মনে করা হচ্ছিল। তবে আদতে তা হয়নি। ট্রাসের নেতৃত্বকালে বিশৃঙ্খলা যে গতিতে বেড়েছে, তা যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি।

গত জুলাইয়ে বরিস জনসন পদত্যাগ করার পর ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্ব কে দেবেন এবং প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা নিয়ে দলটিতে ভোটাভুটি হয়। সেখানে ট্রাসের পক্ষে ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পড়ে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ঋষি সুনাক পেয়েছিলেন ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট। ভোটে জয় পেয়ে দলের প্রধান হিসেবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হন ৪৭ বছর বয়সী ট্রাস।

লিজ ট্রাস যখন ক্ষমতায় এলেন, তখন যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির অবস্থা ছিল টালমাটাল। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞায় জ্বালানি তেলের যে মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে, তার বিরাট প্রভাব পড়েছে যুক্তরাজ্যে। দলীয় ভোটের প্রচারণায় জ্বালানির দামে লাগাম টানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাস। এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে গিয়ে নানা পরিকল্পনার আশ্রয় নেন তিনি।

সেগুলোর একটি গত শতকের আশির দশকে বেশ সফলভাবেই কাজে লাগিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান। পরিকল্পনাটি হলো করহার কমানো, বিশেষ করে ধনীদের জন্য কর কমিয়ে তাদের বিনিয়োগে উৎসাহী করা। একই পরিকল্পনা নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রেও কাজে লাগবে বলে মনে করতেন লিজ ট্রাস। তার ধারণা ছিল, এতে করে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে।

কয়েক সপ্তাহ আগে লিজ ট্রাসের মন্ত্রিসভার প্রথম অর্থমন্ত্রী কোয়াজি কোয়ার্টাঙ ট্রাসের ওই পরিকল্পনাগুলোই একটি সংক্ষিপ্ত বাজেটের মাধ্যমে উত্থাপন করেন। বাজেটে গৃহস্থালির কর ছাড় ও অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতে জনগণকে জ্বালানি বিল দেওয়ার প্রস্তাব করেন কোয়ারতেং। যা ছিল ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ কর ছাড়। এসব ট্রাসের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু এর জন্য অর্থসংস্থান করতে সরকারকে হাজার হাজার কোটি পাউন্ড ঋণ নিতে হতো। এতে দেশটির বন্ড ও মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। পড়ে যায় ব্রিটিশ পাউন্ডের দাম। বিনিয়োগকারীদের সরকারি বন্ড ছেড়ে দেওয়ার হিড়িক পড়ে।

এমন পরিস্থিতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণে পরদিন হস্তক্ষেপ করে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে বাজার নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না। বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে বন্ড কিনতে শুরু করে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। এরই মধ্যে আবার বাড়তে থাকে গৃহঋণের সুদ। আগে থেকেই জীবনযাপনের খরচ জোগাতে হিমশিম খাওয়া যুক্তরাজ্যবাসীর কাছে তা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়ায়।

একপর্যায়ে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড বন্ড কেনা বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। ব্যাংকটির এই সিদ্ধান্তের জেরে কিছু পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হন লিজ ট্রাস। অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে কোয়াজি কোয়ার্টাঙকে সরিয়ে দেন তিনি। এরপর করপোরেশন কর না বাড়ানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন। অথচ এই সিদ্ধান্তকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বাধা হিসেবে চিহ্নিত করতেন তিনি। ট্রাসের এই ভোলবদল তার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

যেদিন কোয়াজি কোয়ার্টাঙ পদত্যাগ করেন, সেদিনই অর্থমন্ত্রী হিসেবে জেরেমি হান্টকে নিয়োগ দেন লিজ ট্রাস। জেরেমি হান্ট গত সোমবার ট্রাসের অনেক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাতিলের ঘোষণা দেন। হান্টের পদক্ষেপগুলো যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে কাজে দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সেগুলো আবার ট্রাসের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের কারণ হয়ে দাঁড়াল।

যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ প্রভাষক লুইস থমসন বলেছেন, অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বিষয়ে লিজ ট্রাসকে আগেই অনেকে সতর্ক করেছিলেন। তবে তিনি তা কানে তোলেননি বলেই ধারণা করা হচ্ছে। লিজ ট্রাস কনজারভেটিভ সরকারের অনেক অভিজ্ঞ উপদেষ্টাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। তবে সেরা প্রধানমন্ত্রীদেরও আশপাশে এমন লোকজন থাকা প্রয়োজন, যারা তাদের পরিকল্পনাগুলো চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। সেখানে হান্টকে অর্থমন্ত্রী করার আগপর্যন্ত ট্রাসের সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলার মতো কেউ ছিলেন না। ততদিনে অবশ্য ট্রাসের পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে। কনজারভেটিভ পার্টির জনপ্রিয়তায়ও ধস নেমেছে।

থমসন বলেন, ‘ছয় সপ্তাহ আগে একজন আইপ্রণেতা হিসেবে লিজ ট্রাসের বেশ জনপ্রিয়তা ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের হাল ধরতে কিছুই করতে পারেননি। তার নেতৃত্বে করজারভেটিভ পার্টি আরও টালমাটাল মনে হয়েছে। আর বরিস জনসনের সময় দলটি থেকে মানুষ যত দূরে সরে গিয়েছিল, এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে’।

থমসনের মতে, লিজ ট্রাসের পদত্যাগেও কনজারভেটিভ পার্টির প্রতি যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে খুব একটা পরিবর্তন আসবে না। জরিপে দেখা গেছে, কনজারভেটিভদের চেয়ে লেবার পার্টি বহু এগিয়ে আছে। দিন যতই গড়াচ্ছে, যুক্তরাজ্যে কনজারভেটিভদের ধসে পড়ার সম্ভাবনাও বাড়ছে।

সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, জনপ্রিয়তায় কনজারভেটিভদের চেয়ে ১৭ শতাংশ এগিয়ে লেবার পার্টি। ২০০১ সালে যখন টনি ব্লেয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তারপর থেকে এত জনপ্রিয়তা পায়নি লেবার পার্টি। লিজ ট্রাসের পদত্যাগের পর কনজারভেটিভ পার্টি যেন এক অথৈ সাগরে পড়ে গেছে।

ওদিকে, ব্রিটিশ মুদ্রা পাউন্ডের দর পড়ে যায়, তার সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার বৃদ্ধি, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া – এসব যুক্ত হয়ে ব্রিটেনের অর্থনীতির সংকট মাত্র অল্প কয়েকদিনের মধ্যে এক গুরুতর চেহারা নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রার সংকট মোকাবিলায় এক-দুই বেলা না খেয়ে থাকছে লাখ লাখ ব্রিটিশ নাগরিক।

সম্প্রতি ফরাসি বার্তা সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ভোক্তা অধিকার গোষ্ঠী ‘হুইচ?’ জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের অর্ধেক পরিবার এখন খাবারের সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। ৩ হাজার মানুষের ওপর একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে এই তথ্য জানিয়েছে গোষ্ঠীটি।

এছাড়া একই পরিমাণ পরিবার অর্থনৈতিক সংকটের আগের তুলনায় স্বাস্থ্যকরভাবে খাওয়া কঠিন বলে মনে করছে। আর এর মধ্যে ৮০ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে আর্থিকভাবে বাধার মুখে পড়ছেন।

 

ভোক্তা অধিকার গোষ্ঠী ‘হুইচ?’-এর খাদ্য নীতির প্রধান স্যু ডেভিস বলছেন, ‘উদ্বেগজনকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়-সংকটের বিধ্বংসী প্রভাব হলো- লাখ লাখ মানুষ খাবার এড়িয়ে যাচ্ছে বা টেবিলে স্বাস্থ্যকর খাবার রাখতে সংগ্রাম করছে’।

অন্যদিকে, জনগণকে সরকারের জ্বালানি সহায়তা বাতিল করার সিদ্ধান্তে লাখ লাখ পরিবার তাদের ঘর পর্যাপ্তভাবে গরম রাখতে সক্ষম হবে না বলেও জানিয়েছে ভোক্তা গোষ্ঠীটি।

‘হুইচ?’-এর নীতি ও অ্যাডভোকেসি প্রধান রোসিও কনচা সতর্ক করেছেন,‘আগামী এপ্রিল মাস থেকেই সার্বজনীন জ্বালানি সহায়তা বন্ধ করার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে লাখ লাখ পরিবারকে শুধু আর্থিকভাবে দুর্বল নয়, জ্বালানি দারিদ্র্যের দিকেও ছুঁড়ে ফেলতে পারে’।

 

এ জাতীয় আরও খবর

বিদায়ি বক্তব্যে কাঁদলেন মির্জা ফখরুল

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ১৪ কার্গো এলএনজি কিনবে সরকার

১২ জেলায় ঝড়ো হাওয়ার সতর্কতা

ময়মনসিংহে এনসিসি ব্যাংকের স্টুডেন্ট ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন ও বৃক্ষবিতরণ অনুষ্ঠিত

বিএসইসির ১৭ কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশকে ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকের সভা

জিয়া-খালেদার সমাধিতে বিএনপির নতুন ৪ নেতার শ্রদ্ধা

সমাজের সবাই এগিয়ে এলে বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতে বড় পতন

রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থেকে সেবা করতে চাই: মির্জা ফখরুল

গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে যা করবেন, যা করবেন না