চাল-তেলের দামে বাড়তি চাপ, বছরে ১৯ হাজার কোটি টাকার বোঝা
অনলাইন ডেস্ক : চাল ও ভোজ্যতেলের ক্রমবর্ধমান দামে চাপে পড়েছেন দেশের সাধারণ ভোক্তারা। আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কমলেও দেশের বাজারে তার সুফল মিলছে না। অন্যদিকে, কয়েক দফায় ভোজ্যতেলের দাম বাড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দুটি কিনতে পরিবারগুলোর ব্যয় বেড়েছে।
বাজারের গত তিন বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মোটা চালের দাম কেজিতে প্রায় ২ টাকা ৭ পয়সা এবং সরু চালের দাম ৪ টাকা ৮৩ পয়সা বেড়েছে। এদিকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ২০২৪ সালের এপ্রিলে লিটারপ্রতি ১৬৭ টাকা থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ২০৪ টাকা হয়েছে।
পরিবারের মাসিক খরচের হিসাব অনুযায়ী, চাল ও তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বছরে বাড়তি ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৪ হাজার ৬২০ টাকা। দেশের প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবারের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক সমান ধরে হিসাব করলে জাতীয় পর্যায়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
চালের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা
রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন খুচরা বাজারে বর্তমানে মোটা চাল প্রতি কেজি ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, মাঝারি চাল ৬২ থেকে ৬৫ টাকা এবং সরু চাল ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মোটা চালের গড় দাম ৫১ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে বেড়ে ৫২ টাকা ২৮ পয়সা হয়। একই সময়ে মাঝারি চালের দাম ৬১ টাকা ২৫ পয়সা থেকে বেড়ে ৬২ টাকা ৪৩ পয়সা এবং সরু চালের দাম ৭২ টাকা ৬৭ পয়সা থেকে বেড়ে ৭৭ টাকা ১০ পয়সায় পৌঁছায়।
বর্তমান গড় দরের সঙ্গে তুলনা করলে মোটা চালের দাম ২০২৪ সালের অক্টোবরের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ এবং সরু চালের দাম ৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি ধানের দাম বাড়ায় চালের বাজারেও তার প্রভাব পড়ছে।
কারওয়ান বাজারের চাটখিল রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী আব্দুস সত্তার জানান, ট্রাকভাড়া বেড়ে যাওয়ায় চাল পরিবহনে খরচ বেশি হচ্ছে। এতে কয়েক ধরনের চালের বস্তাপ্রতি দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বিশ্ববাজারে চালের দাম কমলেও স্বস্তি নেই
আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কমার পরও দেশের ভোক্তারা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। ২০২৪ সালের আগস্টে থাইল্যান্ডের ৫ শতাংশ ভাঙা চালের দাম টনপ্রতি ৫৮৯ ডলার থাকলেও ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা কমে ৩৯২ ডলারে নেমে আসে। অর্থাৎ, দাম কমেছিল প্রায় ৩৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারের এই দরপতনের সঙ্গে দেশের খুচরা বাজারের দামের সামঞ্জস্য দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি শুল্কের সমন্বয়ে বিলম্ব, জাহাজভাড়া, বীমা ও বন্দরের খরচ এবং দেশীয় সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে দাম অপরিবর্তিত রাখার প্রবণতা এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান মনে করেন, চাল ও ভোজ্যতেলের বাজারে ব্যবসায়ীদের একটি অংশের প্রভাব এবং বাজার তদারকির ঘাটতি দামের ওপর চাপ তৈরি করছে। তাঁর মতে, শুধু মূল্যস্ফীতি নয়, বাজারে অনিয়মের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ২২ শতাংশের বেশি
ভোজ্যতেলের বাজারেও গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ছিল ১৬৭ টাকা। পরবর্তী সময়ে দাম বাড়তে বাড়তে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তা ২০৪ টাকায় দাঁড়ায়।
দুই সময়ের ব্যবধানে প্রতি লিটারে দাম বেড়েছে ৩৭ টাকা বা ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ। পাঁচ লিটারের বোতল কিনতে এখন আগের দরের তুলনায় ১৮৫ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে।
অন্যদিকে, বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি কেজি ১৮২ থেকে ১৮৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে বাজার ঘুরে পাওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, শুল্ক-কর, পরিশোধন ও পরিবহন খরচ মূল্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। তবে খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত তেলের সরবরাহ ও বিক্রিতেও কিছু সমস্যা দেখা যাচ্ছে।
মানিকনগরের মুন্না জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী একরাম উদ্দিন জানান, এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি করে বর্তমানে মাত্র এক টাকা কমিশন পাওয়া যায়। আগে এই কমিশন ছিল পাঁচ থেকে সাত টাকা। এ কারণে বোতলজাত তেল বিক্রিতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কমেছে বলে তিনি জানান।
পরিবারপ্রতি বছরে বাড়তি ব্যয় ৪ হাজার ৬২০ টাকা
চাল ও তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব বোঝাতে মাসে ৪০ কেজি চাল ও পাঁচ লিটার সয়াবিন তেল ব্যবহার করে এমন একটি পরিবারের হিসাব ধরা হয়েছে।
এই হিসাবে চালের দাম কেজিতে পাঁচ টাকা বাড়লে মাসে অতিরিক্ত খরচ হয় ২০০ টাকা। বছরে তা দাঁড়ায় ২ হাজার ৪০০ টাকা।
অন্যদিকে, সয়াবিন তেলের লিটারপ্রতি দাম ১৬৭ টাকা থেকে ২০৪ টাকা হওয়ায় পাঁচ লিটারে মাসিক বাড়তি ব্যয় হয় ১৮৫ টাকা। বছরে এই খাতে অতিরিক্ত খরচ ২ হাজার ২২০ টাকা।
দুই পণ্য মিলিয়ে পরিবারটির বছরে বাড়তি ব্যয় দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬২০ টাকা। ২০২২ সালের জনশুমারিতে দেশের পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ ধরে একই অঙ্কের বাড়তি ব্যয় সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলে জাতীয় পর্যায়ে মোট অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১৮ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা হতে পারে। এটি একটি উদাহরণভিত্তিক হিসাব; সব পরিবারের প্রকৃত ব্যয় এক রকম নয়।
বাড়তি অর্থ যাচ্ছে সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে
পণ্যের দাম বাড়লে ভোক্তাকে একই পরিমাণ খাদ্য কিনতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এর ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টি, যাতায়াত ও সঞ্চয়ের মতো অন্যান্য খাতে পরিবারের হাতে অর্থ কমে যায়।
দাম বৃদ্ধির অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে বণ্টিত হয়। এর একটি অংশ কৃষক ও উৎপাদকদের কাছে যেতে পারে। অন্য অংশ চালকল মালিক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী, তেল আমদানিকারক, পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান এবং পরিবেশকদের মধ্যে বণ্টিত হয়। তবে কার কাছে কতটা মুনাফা যাচ্ছে, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পর্যায়গুলোর প্রকৃত ব্যয় ও আয়ের বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।
ক্যাব সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বাজার তদারকি জোরদার এবং নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সরকারি উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, চাল-তেলের পাশাপাশি সার, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণেও নজর দিতে হবে।
সব মিলিয়ে, চাল ও ভোজ্যতেলের বাড়তি দাম সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের দরপতনের সুবিধা দেশের ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো, আমদানি ও সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বাজারে কার্যকর নজরদারি বাড়ানো গেলে নিত্যপণ্যের দামের চাপ কমাতে সহায়তা মিলতে পারে।











