বিদেশি ফলের দামে দিশেহারা ক্রেতারা
অনলাইন ডেস্ক : রাজধানীর বাজারে আমদানি করা ফলের চড়া দামে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। একসময় নিয়মিত খাদ্যতালিকায় থাকা আপেল, কমলা ও আঙুরের মতো ফল এখন অনেকের কাছে বিলাসপণ্যে পরিণত হয়েছে। কেজিপ্রতি অধিকাংশ বিদেশি ফলের দাম ৪০০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় পুষ্টির চাহিদা মেটাতে দেশি ফলের দিকে ঝুঁকছেন ক্রেতারা।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল, কারওয়ান বাজার ও শ্যামলীর ফলের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, আকার ও মানভেদে লাল আপেল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা, সবুজ আপেল ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং মাল্টা ৪০০ থেকে ৪২০ টাকায়। কমলার কেজি ৪৫০ টাকা, সবুজ আঙুর ৫০০ থেকে ৫২০ টাকা এবং লাল আঙুর ৪৬০ থেকে ৪৮০ টাকা। নাশপাতি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকা এবং বেদানা ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায়।
খেজুরের দামেও রয়েছে বড় ব্যবধান। সাধারণ বাংলা খেজুরের কেজি ২৫০ টাকা হলেও উন্নত মানের খেজুরের দাম উঠেছে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত।
কেজিপ্রতি দামের পাশাপাশি একটি ফল কিনতেও ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে উল্লেখযোগ্য অর্থ। বাজারের হিসাব অনুযায়ী, একটি আমদানি করা মাল্টার দাম পড়ছে প্রায় ৭০ থেকে ৮৪ টাকা। সবুজ আপেল ৪৪ থেকে ৫০ টাকা এবং লাল আপেল ৪২ থেকে ৫৬ টাকা। আকারভেদে একটি বেদানার দাম দাঁড়াচ্ছে ১২৫ থেকে ১৬২ টাকা পর্যন্ত।
ফলে সীমিত আয়ের পরিবারের জন্য ফল কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক ক্রেতাই চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পছন্দের ফল না কিনে ফিরে যাচ্ছেন।
দেশি ফলেই স্বস্তি খুঁজছেন ক্রেতারা
বিদেশি ফলের তুলনায় কম দামে পাওয়া যাওয়ায় দেশি ফল এখন অনেক পরিবারের বিকল্প হয়ে উঠেছে। বাজারে দেশি মাল্টা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি প্রায় ১২০ টাকায়, যেখানে আমদানি করা মাল্টার দাম ৪০০ টাকার বেশি। দেশি মাল্টার আকার অনুযায়ী প্রতিটির দাম পড়ছে প্রায় ২০ থেকে ৩০ টাকা। ড্রাগন ফলের কেজি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।
মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে আমলকী বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি, পাকা আমড়া ৮০ টাকা এবং কাঁচা আমড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। এ ছাড়া পানিফল ৪০ টাকা, জাম্বুরা ৯০ থেকে ১০০ টাকা, পেঁপে ৬০ টাকা এবং কদবেল ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কামরাঙার কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকা। চালতা পাওয়া যাচ্ছে প্রতিটি পাঁচ টাকায়। আনারসের দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং তালের দাম ১০০ থেকে ১২০ টাকা।
এসব ফলের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক পরিবার আপেল-কমলার পরিবর্তে কলা, পেয়ারা, আমলকী ও অন্যান্য দেশি ফল কিনছেন।
পুষ্টির জন্য দামি ফল অপরিহার্য নয়
চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ থাকতে নিয়মিত ফল খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও পুষ্টি পেতে বেশি দামি ফল কেনার বাধ্যবাধকতা নেই।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, কলা, পেয়ারা, আমলকী ও লটকনের মতো সহজলভ্য দেশি ফলেও পর্যাপ্ত পুষ্টিগুণ রয়েছে। দামি আপেলের পরিবর্তে প্রতিদিন একটি কলা খেলেও পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়তা পাওয়া যায়।
তার পরামর্শ, মানুষের সামর্থ্য অনুযায়ী কম দামের ও সহজলভ্য ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। কারণ বিভিন্ন ফল থেকে শরীর নানা ধরনের পুষ্টি উপাদান পেতে পারে।
ফল কেনা কমিয়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা
ফলের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার তাদের নিয়মিত কেনাকাটার তালিকা থেকে আপেল ও কমলার মতো ফল বাদ দিচ্ছে।
হাজারীবাগের এক পোশাকশ্রমিক জানান, এখন আপেল কেনার পরিবর্তে আমড়া ও কদবেল কেনেন। তার ভাষায়, পরিবারের সামর্থ্যের মধ্যে থাকা ফলই এখন তাদের ভরসা।
মিরপুরের এক গৃহিণীও জানান, আগে মাসে অন্তত একবার সন্তানদের জন্য আপেল ও মাল্টা কিনতেন। তখন আপেল কেজিপ্রতি ২৪০ টাকা এবং মাল্টা ২৮০ টাকায় পাওয়া যেত। বর্তমানে দাম বেড়ে যাওয়ায় দুই মাসেও একবার ফল কেনা সম্ভব হচ্ছে না। এখন পরিবারের জন্য নিয়মিত কলা ও পেয়ারা কেনেন তিনি।
আমদানি ও খুচরা দামের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন
ফলের বাজারে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পেছনে আমদানি পর্যায় থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত দামের ব্যবধান এবং শুল্কসংক্রান্ত স্বচ্ছতার অভাবকে দায়ী করছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, আমদানি করা ফলের গ্রেডিং ও শুল্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কোন ধরনের ফলের ওপর কত শুল্ক প্রযোজ্য এবং আমদানি মূল্য কত, তা পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা জরুরি।
তিনি ফলের বাজারে কার্যকর নজরদারির জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তদারকি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন। আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, বিদেশি ফলের উচ্চমূল্য শুধু ভোক্তার ব্যয় বাড়াচ্ছে না, বরং অনেক পরিবারের নিয়মিত খাদ্যতালিকায় ফল রাখার সুযোগও সীমিত করছে। দেশি ফল তুলনামূলক সাশ্রয়ী বিকল্প হলেও সেগুলোর দামও বাড়তে থাকলে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।











