ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি কেন, জানালেন জিএস ফরহাদ
নিজস্ব প্রতিবেদক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি রাখা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। এ নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ।
আজ সোমবার বিকেল ৪টার দিকে ডাকসু ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে তিনি আলাপ করেন। এর আগে দুপুরে সংগ্রহশালায় রাখা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সেই ছবি ভেঙে দিয়েছেন আবু তৈয়ব হাবিলদার নামে সাবেক এক শিক্ষার্থী।
সাংবাদিকদের এস এম ফরহাদ বলেন, ‘আমরা দেখেছি, ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে একটি টিম উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। তারা একটি দাবি জানিয়েছে। সেটির কপি আমাদের কাছেও এসেছে। একই সঙ্গে তারা বিবৃতিও দিয়েছে যে, ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর একটি ছবি আছে, সেই ছবি সরাতে হবে। এ নিয়ে একটি আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাদের পেছনে যে যুক্তি আছে, আমাদের কাছে মনে হয়েছে সেই যুক্তি এবং তাদের অবস্থানের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। কেন, সেটা আমি একটু বলি।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন হঠাৎ করে হয়নি। এর আগে অনেকগুলো প্রেক্ষাপট ছিল। ধারাবাহিকভাবে জিন্নাহ সরাসরি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এই অঞ্চলের পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। সেই বক্তব্যটি আমরা ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে উল্লেখ করেছি। ছবির নিচে ক্যাপশনটি ইংরেজিতে ছিল এবং সেখানে তার বক্তব্য সরাসরি কোট করে লেখা ছিল। আমরা দেখিয়েছি, এর পরেই ভাষা আন্দোলনের বাকি প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।’
ডাকসু জিএস বলেন, ‘আমি বুঝিনি, ছাত্রদলকে যদি আমরা জিন্নাহর ছবিটা না দিতাম, তাহলে কী হতো? আমরা যদি জিন্নাহর ছবিটা না দিতাম, তখন আপনারা আলোচনা করতেন যে, জিন্নাহ বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন, সেটা আপনারা লুকিয়েছেন। এটাই বলতেন। নিশ্চয়ই আপনারা এটাই বলতেন। আর যদি আমরা জিন্নাহর ছবি দিয়ে নিচে ক্যাপশন দিতাম যে, তার বক্তব্য ছিল এই অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে, তাহলে সেই ছবি ও ক্যাপশন যদি আমরা না দিতাম, তখন হয়তো আপনারা বলতেন, জিন্নাহ যে বাংলা ভাষার বিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন, আমরা সেটা লুকিয়েছি। লুকানোর চেষ্টা করেছি, তাকে দায়মুক্তি দিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন যখন আমরা সেটা দিয়েছি, তখন একটি বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, ছাত্রদল তাদের বিবৃতির মাধ্যমে বিপক্ষ অবস্থান নিয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, ছাত্রদল এখানে পক্ষান্তরে জিন্নাহর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তারা চায় জিন্নাহকে দায়মুক্তি দিতে, তারা চায় ছবিটা এখান থেকে সরিয়ে নিতে। তারা ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটামও দিয়েছে যে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এটা না সরালে তারা ব্যবস্থা নেবে। তার মানে তারা চায়, জিন্নাহ যে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন, সেটা লুকাতে। তারা দেখাতে চায়, জিন্নাহ এখানে কোনো ভূমিকা পালন করেননি।’
ফরহাদ বলেন, ‘পক্ষ-বিপক্ষের বিষয় নয়, আমরা হুবহু ইতিহাসটা উল্লেখ করেছি। তারা ভুল বুঝেছেন। দুটি বিষয় হতে পারে। হয় তারা ইতিহাস কিছুই জানেন না, পড়াশোনা করেন না, জানেনই না যে জিন্নাহ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন, সেটা বলা দরকার। অথবা তারা ইচ্ছাকৃতভাবে জিন্নাহকে লুকানোর চেষ্টা করছেন। অর্থাৎ জিন্নাহ যে বাংলাদেশের বিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের সম্ভবত জিন্নাহপ্রীতি আছে, জিন্নাহর প্রতি আলাদা ভালোবাসা আছে। ছাত্রদল সে কারণে এটা করেছে।’
এর আগে, আজ দুপুরে ডাকসুর সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদস্বরূপ সেখানে গোলাম আজমকে জুতাপেটার ছবি টাঙিয়েছেন ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতারা। সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী এ ছবি লাগান।
পরে সংগ্রহশালায় গিয়ে দেখা যায়, যে স্থানে জিন্নাহর ছবি লাগানো হয়েছিল ঠিক সে স্থানের ওপরে ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমে গোলাম আজমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি লাগানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গতকাল রোববার ডাকসু ভবনের নিচতলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক সংগ্রহশালার সংস্কারকাজ শেষে পুনরায় উদ্বোধন করেন ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা। এ সময় ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ উপস্থিত ছিলেন।
সংগ্রহশালায় ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বক্তব্য দেওয়ার সময়কার মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর একক ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের একটি দলীয় ছবি এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনসংক্রান্ত মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি-সম্বলিত পাকিস্তানের ডন পত্রিকার একটি সংবাদও সেখানে টাঙানো হয়। এ নিয়ে বিতর্ক চলমান রয়েছে।











