বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল ঐতিহ্যের দেশ: রাষ্ট্রপতি
নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল ঐতিহ্যের দেশ বলে জানালেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ মঙ্গলবার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত পক্ষকালব্যাপী সিরাতুন্নবী (সা.) অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র ও মহিমান্বিত সময়। এই মহতি ও পবিত্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পেরে আমি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি জানাই অগণিত সালাম ও দরুদ। একই সঙ্গে ইসলামের সকল নবী ও রাসূল, নবী (সা)- এর পরিবার-পরিজন, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন, সকল মুমিন-মুসলমানের রুহের মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করছি।
তিনি বলেন, ‘প্রিয় মুমিন মুসলমানগণ, মহান আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির হেদায়েত, মুক্তি ও কল্যাণের জন্য সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তার আগমন ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় ঘটনা। তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন- “আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া:আয়াত ১০৭)।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ বিশ্ব মানবতার জন্য চিরন্তন পথনির্দেশ। তার চরিত্রে সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা, মানবিকতা ও পরম মমত্ববোধের অনন্য সমন্বয় ঘটেছিল। দরিদ্র, এতিম, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি তিনি ছিলেন মমতাশীল। নারী, শিশু, প্রতিবেশী ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি দিয়ে গেছেন সুষ্পষ্ট নির্দেশনা। তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন- ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা, অঞ্চল কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে কোনো মানুষকে অবজ্ঞা করা যাবে না। মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায় ও ইনসাফের সমাজ গঠনই ছিল তাঁর অন্যতম শিক্ষা।’
তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার চরিত্রে উত্তম।” আর মহান আল্লাহ রাসূল (সা.)-এর অনুপম চরিত্রের প্রশংসা করে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী (সুরা আল-আহআব, আয়াত ২১)।’’ মহানবী (সা.)-এর এই পবিত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও শিক্ষা আমাদের ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সততা, নৈতিকতা ও উত্তম চরিত্রের সর্বোচ্চ গুরুত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ বলেন, রাসুলে করিম (সা.) হলেন ‘‘উসওয়াতুন হাসানাহ’’ অর্থাৎ ‘‘সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ’’। আজকের বিশ্বে হিংসা, সংঘাত, অসহিষ্ণুতা, বৈষম্য, উগ্রতা, মিথ্যা ও নৈতিক অবক্ষয়ের যে বিস্তার ঘটছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। তার বিদায় হজের ভাষণে মানবমর্যাদা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক অধিকারের যে মহান শিক্ষা উচ্চারিত হয়েছিল, তা আজও সমগ্র মানবজাতির জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা সর্বজনীন, চিরন্তন ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান পবিত্র কুরআন নাজিল করেন। তার মাধ্যমে মানবজাতির শান্তি, ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার অনুপম বিধান ও আদর্শ ইসলাম ধর্মকে পরিপূর্ণতা দান করেন। মহানবী (সা.)-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশের উপায় হলো কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আমাদের জীবন, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিচালনা করা।’
উপস্থিত সুধীমণ্ডলীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল ঐতিহ্যের দেশ। এ দেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে। মহানবী (সা.) অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সমন্বয়ে যে সমাজব্যবস্থা, পারস্পরিক অধিকার ও শান্তিপূর্ণ অবস্থানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, আমাদের জাতীয় জীবনেও শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় তা অনুসরণীয়। সেই দৃষ্টান্তকে পাথেয় করেই আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে ধর্মপ্রাণ মানুষ স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করবেন, সকল ধর্মের মানুষ নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপন করবেন এবং ন্যায়বিচার, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও পারস্পরিক সৌহার্দ হবে রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তি।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও ইসলামী সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের জাতীয় জীবনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেই অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে সংবিধানের প্রস্তাবনায় “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” সংযোজন করেন। তিনি ৪টি বিভাগীয় শহরে ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন করেন। তার শাসনামলে ইমামদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি সমাজকল্যাণ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার কার্যক্রমও শুরু হয়। এজন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘‘ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি’’। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন এবং ২০০১ সালে ইমাম-মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে মসজিদ, ইমাম, ধর্মীয় শিক্ষা এবং সমাজে ইসলামী নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার পরিধি সম্প্রসারিত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার ধর্মীয় নেতাদের মর্যাদা বৃদ্ধি, তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রতিবদ্ধ। ইতোমধ্যে ইমাম, মুয়াজ্জিম ও খাদেম সাহেবদের মাসিক সম্মানি ভাতা দেওয়া শুরু হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে সেবাদানকারীদেরও সম্মানি ভাতা প্রদানের কাজ শুরু হয়েছে। আমি আশা করি, ২০৩০ সালের আগে প্রতিশ্রুতি অনুসারে দেশের সকল মসজিদসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপসানালয় মাসিক সম্মানী ভাতার আওতায় আসবে।’
উপস্থিত আলেম-ওলামা ও পীর-মাশায়েখদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আপনারা ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের পথপ্রদর্শক। মসজিদের মিম্বর থেকে আপনারা কোটি মানুষের কাছে সত্য, ন্যায়, সততা, ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার বাণী পৌঁছে দেন। তাই সমাজ থেকে দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, গুজব, হিংসা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং অসহিষ্ণুতা দূর করতে আপনাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি আশা করবো, ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও নবী করিম (সা.)-এর জীবনাদর্শ তুলে ধরে তরুণ প্রজন্মকে নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতে আপনারা অনুপ্রাণিত করবেন।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে, বিভেদ, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ কোনো জাতিকে শক্তিশালী করে না। অতীতের কর্তৃত্ববাদ, ফ্যাসিবাদ ও অন্যায় যেন আর কখনো ফিরে না আসে, সে জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে অনুসরণ করে, এবং ধর্মের শান্তি, ন্যায় ও সম্প্রীতির মর্মবাণীকে হৃদয়ে ধারণ করে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
আয়োজকদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এই অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আমি আবারো সবাইকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই। আপনারা বিশেষ করে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে দেশের ধর্মীয় শিক্ষা, ইসলামী সংস্কৃতি, গবেষণা, প্রকাশনা, মসজিদভিত্তিক কার্যক্রম এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আমার বিশ্বাস, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত এ ধরনের কর্মসূচি ইসলামের শান্তি, সৌহার্দ ও মানবকল্যাণের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’
তিনি বলেন, ‘পরিশেষে, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর এই মহিমান্বিত দিবস উপলক্ষে আমি সকলের প্রতি আহ্বান জানাই—আসুন, আমরা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সত্য, ন্যায়, সততা, সহিষ্ণুতা, ক্ষমা, সাম্য ও মানবপ্রেমের মহান আদর্শ নিজেদের জীবনে ধারণ করি। ধর্মের নামে বিভেদ-বৈষম্য নয়, ইসলামের শান্তি ও মানবতার বাণী ছড়িয়ে দিই। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমাদের দেশ ও জাতিকে সকল অনিষ্ট, বিভেদ ও অশান্তি থেকে রক্ষা করুন এবং বাংলাদেশকে শান্তি, ন্যায়, সাম্য, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যান।’
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ‘আমি পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত পক্ষকালব্যাপী অনুষ্ঠানমালার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি এবং সকল কর্মসূচির সার্বিক সফলতা কামনা করছি। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন।’
অনুষ্ঠানে ধর্মমন্ত্রী জী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ), ধর্ম প্রতিমন্ত্রীমোহাম্মদ শামীম কায়সারসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।











