তপ্তদহনে পুড়ছে মানুষ, কমছে কর্মঘণ্টা, ক্ষয়ে যাচ্ছে জিডিপি
দুপুরের রোদে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন রিকশাচালকের জন্য ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস শুধু আবহাওয়ার একটি সংখ্যা নয়। এই তাপমাত্রা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ওপর চাপ বাড়ে, কাজের গতি কমে এবং বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। যে সময়টুকু তার রাস্তায় থাকার কথা, তার একটি অংশ চলে যায় ছায়া খুঁজতে কিংবা শরীর সামলাতে। একজন দিনমজুরের কাছে সেই বিরতির অর্থ সরাসরি আয় কমে যাওয়া। ছোট ছোট এই আয়হানিই এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে জাতীয় অর্থনীতির হিসাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত নিয়ে আলোচনা সাধারণত বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন কিংবা লবণাক্ততার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ তৈরি করছে আরেক ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি, যার বড় অংশই চোখে দেখা যায় না। কোনো কারখানা ভেঙে পড়ছে না, কোনো বাজার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। অথচ কমছে কর্মঘণ্টা ও শ্রম উৎপাদনশীলতা, বাড়ছে অসুস্থতা ও চিকিৎসা ব্যয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা, কৃষিতে অতিরিক্ত সেচ ব্যয় এবং অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের চাপ। অর্থাৎ তাপ এখন শুধু আবহাওয়ার বিষয় নয়, এটি অর্থনীতিরও একটি অদৃশ্য কর।
আইআইইডি ও ওকাপের যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, তীব্র গরমে অসুস্থতা ও উৎপাদনক্ষমতা কমে দেশে বছরে প্রায় ১১৮ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের হারানো মজুরি প্রায় ৪১০ কোটি মার্কিন ডলার। দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের কারণে কর্মক্ষমতা কমার ক্ষতি যোগ করলে হারানো মজুরির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬২২ কোটি ডলার। বর্তমান বিনিময় হারে এর পরিমাণ প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ৩৮ শতাংশের সমান।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে তীব্র গরমের কারণে বাংলাদেশে সরাসরি ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। দুই গবেষণার হিসাবের পদ্ধতি আলাদা হলেও বার্তাটি অভিন্ন—তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির ক্ষয়ও বাড়ছে।
৩৭ ডিগ্রির পর গরম আর শুধু গরম থাকে না
তাপমাত্রা বাড়লে মানুষের শরীরকে স্বাভাবিক রাখতে বেশি শক্তি ব্যয় করতে হয়। নির্দিষ্ট সীমা পার হলে শরীরের ওপর চাপ দ্রুত বাড়ে এবং কাজের সক্ষমতা কমতে শুরু করে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে অর্থনৈতিক ক্ষতির হার দ্রুত বাড়তে থাকে। উচ্চ তাপমাত্রায় শ্রমিককে বেশি বিরতি নিতে হয়, কাজের গতি কমে যায় এবং অসুস্থতার কারণে কর্মস্থলে অনুপস্থিতিও বাড়ে। এই ক্ষতি সবচেয়ে বেশি পড়ে এমন শ্রমিকদের ওপর, যাদের আয় কাজের দিনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, সড়ককর্মী কিংবা দিনমজুরের জন্য কর্মঘণ্টা হারানোর কোনো বিকল্প আয় নেই। এক ঘণ্টা কম কাজ মানে এক ঘণ্টার মজুরি কমে যাওয়া। একদিন কাজ না করতে পারা মানে পরিবারের খাবার, বাজার কিংবা চিকিৎসার বাজেটে কাটছাঁট। জাতীয় অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘উৎপাদনশীলতার ক্ষতি’। শ্রমিকের ভাষায়, এটি ‘আজকের আয় কমে যাওয়া’।
ঢাকায় তাপের কারণে সবচেয়ে বেশি কর্মঘণ্টা নষ্ট
দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরগুলোর মধ্যে তাপজনিত কর্মঘণ্টা হারানোর দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে অতিরিক্ত তাপের কারণে বছরে মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে। পূর্ণকালীন চাকরির হিসাবে এটি প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা।
চিত্রটি ভবিষ্যতে আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০৫০ সালে এই ক্ষতি প্রায় ৭ লাখ ৮ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ হতে পারে। ২০৮০ সালে তা বেড়ে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার চাকরির সমান হতে পারে। তখন ঢাকায় তাপের কারণে মোট কর্মঘণ্টা হারানোর হার দাঁড়াতে পারে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে।
সে তুলনায় ২০৮০ সালে কলকাতায় এই ক্ষতি প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার এবং নয়া দিল্লিতে প্রায় ৬ লাখ ২৯ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ হতে পারে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ঢাকার তাপঝুঁকি শুধু জনস্বাস্থ্যের সমস্যা নয়, ভবিষ্যৎ নগর অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতারও বড় প্রশ্ন।
গরমে কমছে শ্রমিকের আয়
আইআইইডি ও ওকাপের গবেষণায় ঢাকার ১৭৫টি শ্রমিক পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে ১২২টি পরিবার নির্মাণ, সড়কের কাজ ও রিকশা চালানোর মতো বাইরের কাজে এবং ৫৩টি পরিবার পোশাকশিল্পের মতো ঘরের ভেতরের কাজে যুক্ত।
গবেষণার হিসাবে, ঘরের বাইরে কাজ করা একজন শ্রমিক বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭ কর্মদিবস হারাচ্ছেন। ভেতরের কাজে থাকা শ্রমিকের ক্ষেত্রে হারানো কর্মদিবস ১৩ দশমিক ৫।
মজুরি হারানোর হিসাবও উল্লেখযোগ্য। বাইরে কাজ করা একজন শ্রমিক বছরে গড়ে ১৪৮ দশমিক ৯ ডলার এবং ভেতরের কাজে থাকা শ্রমিক ৮৯ দশমিক ১ ডলার মজুরি হারাচ্ছেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের বড় অংশের জন্য ‘পেইড লিভ’ বা বেতনসহ ছুটির ব্যবস্থা নেই। অসুস্থ হলে আয় বন্ধ, অতিরিক্ত গরমে কাজ বন্ধ রাখলেও আয় বন্ধ। অর্থাৎ তাপপ্রবাহের ঝুঁকি তাদের জন্য শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, এটি আয়-ঝুঁকিও।
তাপের সঙ্গে বাড়ছে চিকিৎসার বিল
কর্মঘণ্টা হারানোর পর তাপপ্রবাহের দ্বিতীয় আঘাত আসে স্বাস্থ্য ব্যয়ের মাধ্যমে। একটি গবেষণায় অংশ নেওয়া শ্রমিকদের ২৩ দশমিক ১ শতাংশ কিডনির সমস্যার কথা জানিয়েছেন। গবেষকদের অনুমান, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত তাপের মধ্যে কাজ করলে শ্রমিকদের একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।
হিটস্ট্রোকের অভিজ্ঞতা থাকা শ্রমিকদের বড় অংশ চিকিৎসা নেননি। এর অর্থ, তাপজনিত অসুস্থতার একটি বড় অংশ সরকারি স্বাস্থ্য বা অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাবের বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
একজন শ্রমিক অসুস্থ হলে শুধু তার চিকিৎসা খরচ বাড়ে না, পরিবারের আয়ও কমে। চিকিৎসার টাকা জোগাতে অনেক পরিবার সঞ্চয় ভাঙে বা ঋণ নেয়। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা হলে সেই ক্ষতি আরও দীর্ঘ হয়।
এভাবে তাপপ্রবাহ একটি পরিবারের অর্থনীতিতে একই সঙ্গে তিনটি চাপ তৈরি করে—আয় কমায়, ব্যয় বাড়ায় এবং সঞ্চয় কমায়।
দরিদ্র মানুষের ওপর তাপের আঘাত দ্বিগুণ
তাপপ্রবাহের ক্ষতি সবার জন্য সমান নয়। উচ্চ আয়ের পরিবার ঘরে এসি চালাতে পারে, পর্যাপ্ত পানি ও চিকিৎসা নিতে পারে। বিপরীতে নিম্ন আয়ের পরিবারকে অনেক সময় টিন বা অ্যাসবেস্টসের ছাদের নিচে গাদাগাদি করে থাকতে হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপ করা ঘরের ভেতরে কাজ করা শ্রমিক পরিবারের ৬৬ শতাংশ এবং বাইরের শ্রমিক পরিবারের ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ টিন বা অ্যাসবেস্টসের ছাদের নিচে বাস করে।
দিনের তাপ রাতে ঘরে আটকে থাকে। পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকলে ঘুম ব্যাহত হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ফলে একজন শ্রমিক পরদিন কাজে ফেরেন পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়াই।
এই পরিস্থিতি দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ায়। কারণ দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জায়গা এমনিতেই খুব সংকীর্ণ। সামান্য একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি বা কয়েক দিনের আয়হানি তাদের আবার দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
কৃষিতে তাপের ধাক্কা, বাজারেও তার প্রভাব
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তাপপ্রবাহের বড় অভিঘাত পড়ছে কৃষিতেও। অতিরিক্ত তাপে মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যায়। বাড়ে সেচের প্রয়োজন। অনেক ফসলের ফুল আসা, পরাগায়ন ও ফলনেও তাপের প্রভাব পড়ে। কৃষিশ্রমিকরা দীর্ঘ সময় মাঠে কাজ করতে না পারলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
কৃষি ও নির্মাণ খাতে তাপজনিত কর্মঘণ্টা হারানোর হার বর্তমানের ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে ২০৩০ সালে ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে একটি গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এর প্রভাব শুধু কৃষকের আয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উৎপাদন কমলে খাদ্যের সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে। সেচ ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে বাজারমূল্যও প্রভাবিত হতে পারে। অর্থাৎ তাপপ্রবাহের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার বাজারেও পৌঁছে যায়।
পোশাকশিল্পে তাপের ঝুঁকি মানে রফতানি ঝুঁকি
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পও তাপজনিত উৎপাদনশীলতা হ্রাসের ঝুঁকিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে, কার্যকর তাপ-সহনশীল ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক খাতে ২০৩০ সালের মধ্যে সম্মিলিতভাবে সর্বোচ্চ ৬৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার রফতানি ক্ষতি হতে পারে।
কারখানার তাপমাত্রা বেড়ে গেলে শ্রমিকের কাজের গতি কমে, ক্লান্তি বাড়ে এবং উৎপাদনশীলতা কমে। এর সঙ্গে যদি বিদ্যুৎ সংকট বা শীতলীকরণ ব্যয় যোগ হয়, তাহলে উৎপাদন খরচও বাড়ে।
তবে বাংলাদেশ এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করেছে। গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, জ্বালানি সাশ্রয় এবং উন্নত কর্মপরিবেশে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেশে ইতোমধ্যে ২৭০টির বেশি পোশাক কারখানা এলইইডি সনদ পেয়েছে।
এই বিনিয়োগকে শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতা রক্ষারও বিনিয়োগ।
গরম বাড়লে বিদ্যুতের অর্থনীতিও বদলায়
তাপপ্রবাহের সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের সম্পর্ক ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহে দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ১৬ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল। বিপরীতে গড় উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ৯৮৮ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হয়।
তবে সম্প্রতি দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। ২০ মে রাত ৯টায় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন রেকর্ড হয়েছে। এ সময় উৎপাদন হয় ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
এর আগে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড ছিল ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট, যা ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই অর্জিত হয়েছিল। তীব্র গরমে এসি ও অন্যান্য শীতলীকরণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার এসি বিক্রি হয়েছে, যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। মানুষের ব্যক্তিগত স্বস্তির জন্য এসি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠলেও এর বিপরীতে বাড়ছে বিদ্যুৎ খরচ এবং পরিবারের ব্যয়। অর্থাৎ গরমের সঙ্গে একটি নতুন অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হচ্ছে—তাপ বাড়ে, এসির ব্যবহার বাড়ে, বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।
তাপের চাপ পড়ছে অবকাঠামোতেও
চরম তাপ দেশের সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোর ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে। ২০২৪ সালের তীব্র গরমে কয়েকটি মহাসড়কে বিটুমিন গলে যাওয়ার ঘটনা সামনে এসেছিল। ভবিষ্যতে তাপমাত্রা আরও বাড়লে সড়ক, ভবন, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম এবং নগর অবকাঠামোর নকশা ও নির্মাণমান নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর অর্থ শুধু দুর্যোগের পর পুনর্গঠন নয়। অবকাঠামো তৈরির সময় থেকেই ভবিষ্যতের তাপমাত্রা বিবেচনায় নিতে হবে।
গবেষকেরা তাপমাত্রাভিত্তিক নগদ সহায়তা, কর্মস্থলে নিরাপদ পানি, ইলেকট্রোলাইট, ছায়া এবং বাধ্যতামূলক বিরতির মতো পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন। সম্ভাব্য সহায়তা প্যাকেজে বছরে প্রায় ৮৭৩ কোটি থেকে ১ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার ক্ষতি ধরে সম্ভাব্য মজুরি ক্ষতির অঙ্ক প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিরোধে কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের তুলনায় নিষ্ক্রিয় থাকার খরচ অনেক বেশি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকও আগাম প্রস্তুতির অর্থনৈতিক সুফলের ওপর জোর দিয়েছে। ভারতের আহমেদাবাদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতিতে প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগে প্রায় ৫০ ডলারের সমপরিমাণ সুফল পাওয়া সম্ভব।
শ্রমনীতিতেও দরকার ‘তাপের হিসাব’
বাংলাদেশের শ্রম আইন ও বিধিমালায় কর্মস্থলে বায়ু চলাচল, পানীয় জল ও বিশ্রামের সাধারণ বিধান রয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট তাপমাত্রার পর বাধ্যতামূলক বিরতি, নিরাপদ কর্মঘণ্টা কিংবা তাপজনিত অসুস্থতাকে পেশাগত রোগ হিসেবে বিবেচনার মতো কাঠামো এখনও যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। পরিবর্তিত জলবায়ু বাস্তবতায় এই ঘাটতি পূরণ করা জরুরি।
কর্মক্ষেত্রে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পরিমাপের ব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে কাজের সময় পুনর্বিন্যাস, বাধ্যতামূলক বিরতি, নিরাপদ পানি, ছায়া এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে তাপপ্রবাহের পূর্বাভাসকে শ্রম, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ ও নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
এখনই বিনিয়োগ, নাকি পরে বড় ক্ষতির বিল?
তাপপ্রবাহের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এর ক্ষতি ধীরে ধীরে জমা হয়। একজন শ্রমিকের এক ঘণ্টা কাজ কমে যাওয়া জাতীয় অর্থনীতিতে চোখে পড়ার মতো ঘটনা নয়। কিন্তু যখন একই ঘটনা লাখ লাখ শ্রমিকের ক্ষেত্রে ঘটে, তখন সেটি কোটি কোটি কর্মঘণ্টার ক্ষতি হয়ে দাঁড়ায়।
একটি পরিবার চিকিৎসার জন্য সঞ্চয় ভাঙলে সেটিও জাতীয় অর্থনীতির বড় ঘটনা বলে মনে হয় না। কিন্তু এমন পরিবার যখন হাজার, লাখ বা কোটি হয়, তখন তা সঞ্চয়, ভোগ ও বিনিয়োগের ওপরও প্রভাব ফেলে।
এই কারণেই তাপপ্রবাহকে আর শুধু জনস্বাস্থ্য বা পরিবেশের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি শ্রমবাজারের সমস্যা, উৎপাদনশীলতার সমস্যা, দারিদ্র্যের সমস্যা, বিদ্যুতের সমস্যা এবং শেষ পর্যন্ত জিডিপিরও সমস্যা।
গরমের বিল কে দেবে?
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হলো, যারা সবচেয়ে কম দায়ী, তারাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি মূল্য দেয়। একজন রিকশাচালক বেশি কার্বন নিঃসরণ করেননি। একজন নির্মাণশ্রমিকও করেননি। একজন কৃষিশ্রমিকও নয়। অথচ তাপ বাড়লে তাদেরই কর্মঘণ্টা কমে, আয় কমে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। অর্থনীতির বড় সংখ্যাগুলো তাই আসলে ছোট ছোট মানুষের গল্পের যোগফল।
বছরে ১১৮ কোটি কর্মদিবস হারানো, ৬২২ কোটি ডলারের সম্ভাব্য মজুরি ক্ষতি কিংবা জিডিপির ১ দশমিক ৩৮ শতাংশের সমপরিমাণ ক্ষতি—এগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে হারানো শ্রম, কমে যাওয়া আয় এবং একটি পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের সামনে তাই এখন সিদ্ধান্তটি পরিষ্কার—তাপকে উপেক্ষা করে ক্ষতির বিল দেওয়া, নাকি আগেই বিনিয়োগ করে সেই বিল কমানো। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়তো কোনো একদিনে দৃশ্যমান হবে না। তা জমতে থাকবে প্রতিটি হারানো কর্মঘণ্টায়, প্রতিটি অসুস্থ শ্রমিকে, প্রতিটি বাড়তি বিদ্যুৎ বিলে, প্রতিটি কম ফলনে। তাপ তাই শুধু শরীর পোড়াচ্ছে না; ধীরে ধীরে পুড়িয়ে দিচ্ছে অর্থনীতির কর্মক্ষমতাও।
এ প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব থাকলেও ঢাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সবুজ ও জলাশয় কমে যাওয়া, অতিরিক্ত কংক্রিটায়ন এবং পরিবেশদূষণ বড় ভূমিকা রাখছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, স্বাভাবিকভাবে মানুষের শরীরের তাপমাত্রা প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর বেশি তাপমাত্রা মানুষের কর্মক্ষমতা ও স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা কমছে, মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে, চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে।
অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন একটি বাস্তবতা এবং এর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে নেই। তবে দেশের নগর এলাকায় নিজেদের কর্মকাণ্ডের কারণে যে অতিরিক্ত তাপমাত্রা তৈরি হচ্ছে, সেটি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে। এজন্য সঠিক নগর পরিকল্পনা, ভবন নির্মাণ বিধিমালা বাস্তবায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং শিল্পকারখানা পরিবেশসম্মতভাবে স্থাপন নিশ্চিত করা জরুরি।
এই শিক্ষক বলেন, ঢাকাসহ শহরাঞ্চলে জলাশয়, জলাধার ও সবুজ এলাকা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। কোথাও সবুজ ও জলাধার থাকলে এবং কোথাও না থাকলে তাপমাত্রার পার্থক্য কয়েক ডিগ্রি পর্যন্ত হতে পারে। ফলে একটি এলাকায় ৩৭ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকলেও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে অন্য এলাকায় অনুভূত তাপমাত্রা ৪২ থেকে ৪৪ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তার ভাষায়, পরিকল্পনার ব্যর্থতা, ভবন নির্মাণ বিধিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় দুর্বলতার কারণে শহরের তাপমাত্রা আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা, যানবাহন ও ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে সৃষ্ট দূষণও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে।
অধ্যাপক আদিল বলেন, শিল্পকারখানার অভ্যন্তরীণ ও বাইরের পরিবেশ তুলনামূলকভাবে ভালো রাখা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মানুষের অনুভূত তাপমাত্রা কমানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই পরিবেশগত মানদণ্ডের সঙ্গে আপস করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও পরিবেশগত বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন ও তদারকিতে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য উন্নত দেশগুলোর দায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য উন্নত দেশগুলোর দায় অবশ্যই রয়েছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফোরামে ক্ষতিপূরণের দাবি তুলতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে যারা পরিবেশদূষণ করছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঢাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ি ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি, শিল্পকারখানার অতিরিক্ত দূষণ, সবুজ এলাকা ও জলাশয় কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত কংক্রিটায়ন ঢাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক উপাদানগুলো ক্রমেই কমে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, টেকসই নগর পরিকল্পনা, জলাশয় ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ, কংক্রিটায়ন নিয়ন্ত্রণ, দূষণ কমানো এবং পরিবেশগত আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমেই ঢাকার ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও এর অর্থনৈতিক-স্বাস্থ্যগত ক্ষতি মোকাবিলা করা সম্ভব।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক হেলাল আহমেদ জনি বলেন, বাংলাদেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ধীরে ধীরে উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, কৃষি, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ চাহিদা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করছে।
তিনি জানান, একটি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তাপজনিত স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে আনুমানিক ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এতে অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০ দশমিক ৩ থেকে ০ দশমিক ৪ শতাংশ।
এই অর্থনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ক্ষতি এখনই সরাসরি কোনো সম্পদ ধ্বংস হওয়া নয়; বরং ধীরে ধীরে মানুষের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া। তাই জলবায়ু অভিযোজনকে শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বিষয় হিসেবে না দেখে অর্থনীতি, শ্রম, কৃষি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য ও নগর উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বিত একটি কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক নীতি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।











