,

নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকিতে তেহরানের ক্ষোভ

news-image

অনলাইন ডেস্ক : ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিতে চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি চীনসহ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই মার্কিন পরিকল্পনাকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, অন্য দেশের ওপর সীমান্তের বাইরে গিয়ে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়ার কোনো বৈধ ভিত্তি নেই।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আগামী সোমবার নতুন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর’ নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুঁশিয়ারি দেন। একই সঙ্গে ইরানের প্রধান তেল ক্রেতা চীনকে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সমুদ্রপথে ইরান থেকে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি কিনেছে চীন। তবে চলমান সংকট নিরসনে বেইজিং কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ইরান সতর্ক করেছে, বিশেষ অনুমতি ছাড়া তেলবাহী জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করলে সেগুলো হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে। এর মধ্যে কোনো বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ বা এলএনজি পরিবহনকারী ছিল না। এতে বিপুলসংখ্যক জাহাজ ও নাবিক জলপথটিতে আটকা পড়েছেন।

তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, বাগদাদের অনুরোধের পর কয়েকটি ইরাকি তেলবাহী ট্যাংকারকে হরমুজ দিয়ে চলাচলের বিশেষ অনুমতি দিয়েছে তেহরান। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের ইরাক সফরের সময় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।

মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের দাবি, মার্কিন সামরিক সহায়তায় হরমুজ দিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছে। যুদ্ধের আগে এই জলপথে প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল পরিবহন হতো, যা বিশ্বের দৈনিক তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়িও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নেওয়া দেশগুলোকে সতর্ক করেছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি বলেন, যেসব দেশ ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক চাপের অংশ হবে, তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে তেহরান।

অন্যদিকে ইরানের সামরিক প্রস্তুতিও অব্যাহত রয়েছে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আবদোল্লাহি একটি ভূগর্ভস্থ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন করেছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, কারখানাটিতে আগের তুলনায় আরও উন্নত প্রযুক্তি ও সক্ষমতায় সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন করা হচ্ছে।

গালিবাফ বলেছেন, নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা গড়ে তোলার বিষয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছ থেকে তেহরান অনেক বার্তা পেয়েছে। তার অভিযোগ, ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

এদিকে সংঘাত শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস ও দেশটির ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্য ঘোষণা করেছিলেন। তবে এসব লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। জাতিসংঘের পরমাণু পরিদর্শকেরা ২০২৫ সাল থেকে ইরানে প্রবেশ করতে না পারায় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থাও অনিশ্চিত।

প্রায় ছয় মাসের সংঘাতে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। নিহতদের বড় অংশ ইরানের নাগরিক। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংঘাতে দেশটির ৭৫০ জনের বেশি সামরিক সদস্য আহত এবং ১৮ জন নিহত হয়েছেন।

তবে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। শুক্রবার ইরানি সংবাদ সংস্থা ইসনার প্রতিবেদনে তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, শক্ত অবস্থান ধরে রেখে এবং দেশের মর্যাদা বজায় রেখে যুদ্ধের অবসান ঘটানোই ইরানের জন্য ভালো হবে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়া, নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকি এবং তেহরানের পাল্টা সতর্কবার্তায় মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে। এর প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।