,

আস্থার ঘাটতিতে অনিশ্চিত প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর

news-image

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন তার প্রেস সচিব এএএম সালেহ। ভারতীয় কয়েকটি গণমাধ্যমে আগামী ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট তার নয়াদিল্লি সফরের খবর প্রকাশের পর গতকাল শুক্রবার সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। একই দিন দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানানোর প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেওয়া একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর তা দ্রুত প্রত্যাহার করা হয়। এসব ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকা-দিল্লির কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান আস্থার ঘাটতিই সফরের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর তার প্রত্যর্পণ, ভারতে পলাতক ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ডের আসামিদের ফেরত দেওয়া এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির অবস্থানে এখনও পুরোপুরি সমন্বয় হয়নি।

এসব কারণে সম্ভাব্য সফরটি কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়, দুই দেশের সম্পর্কের নতুন সমীকরণেরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঢাকার পক্ষ থেকে সফরের আগে একটি অনুকূল ও আস্থাপূর্ণ কূটনৈতিক পরিবেশ চাওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে নয়াদিল্লিও নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ এবং পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিচ্ছে। ফলে সফরের তারিখ ও আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি এখনও অনিশ্চিত।

তারেক রহমানের প্রেস সচিব এএএম সালেহ গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি জানান, শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক আসামির প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ভারত দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। আবার এ বিষয়ে ভারতের কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই তারেক রহমান ভারত সফর করলে সরকারকে দেশের অভ্যন্তরে প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে। ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনে অংশ নেওয়া একটি অংশ শেখ হাসিনার বিষয়ে সমাধান ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের উদ্যোগ নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়েছে। ফলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকÑ দুই দিক থেকেই সফরটি জটিল সমীকরণের মুখে পড়েছে। এ কারণে তাড়াহুড়া না করে সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে সরকার।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং গতকাল প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়া হুমায়ুন কবির বলেন, তাড়াহুড়া করে নয়; দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতেই ভারত সফর হতে পারে। সম্মানজনক আমন্ত্রণের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন।

রাষ্ট্রপতি ভবনের বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার : এদিকে গতকাল দুপুরে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর ঘিরে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এক ঘণ্টার মধ্যেই তা প্রত্যাহার করে নেয় ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন। বেলা ২টার দিকে ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে শনিবার রাষ্ট্রপতি ভবনে নিয়মিত ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান স্থগিত রাখার কথা জানানো হয়। সফর নিয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসার আগেই এমন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হওয়ায় কূটনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়।

বিজ্ঞপ্তিটির শিরোনাম ছিল, ‘এই শনিবার চেঞ্জ অব গার্ড অনুষ্ঠান হচ্ছে না।’ এতে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ও মহড়ার কারণে ২২ আগস্ট রাষ্ট্রপতি ভবনের ফোরকোর্টে অনুষ্ঠেয় নিয়মিত ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান স্থগিত রাখা হয়েছে।

তবে ঢাকা বা নয়াদিল্লি- কোনো পক্ষই তখন পর্যন্ত তারেক রহমানের সফরসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। ফলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও সফরসূচি চূড়ান্ত হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে সম্ভাব্য সফরের বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে।

প্রায় এক ঘণ্টা পর বেলা ৩টার দিকে রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে আরেকটি বার্তা পাঠিয়ে আগের বিজ্ঞপ্তিটি প্রত্যাহারের কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, ২১ আগস্ট ‘চলতি শনিবার চেঞ্জ অব গার্ড অনুষ্ঠান হচ্ছে না’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটি প্রত্যাহার করা হলো।

রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের ভারত সফরের সময় রাষ্ট্রপতি ভবনের ফোরকোর্টে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার আয়োজন দেশটির দীর্ঘদিনের সামরিক ও কূটনৈতিক ঐতিহ্য। এ অনুষ্ঠানে সফররত রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানকে ভারতের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বয়ে বিশেষ ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়।

ভারতও এখনও নিশ্চিত নয় : কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী সপ্তাহের শুরুতেই তার নয়াদিল্লিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে দুই দেশের সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে রাষ্ট্রপতি ভবনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং পরে তা প্রত্যাহারের ঘটনায় কূটনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

এদিকে গতকাল নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সম্ভাব্য সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হয় মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে। জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে এ মুহূর্তে তার কিছু বলার নেই। কোনো অগ্রগতি হলে তা জানানো হবে।