শুক্রবার, ২৪শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৯ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরাদ্দে বিধি লঙ্ঘন, পানির দরে গৃহায়নের জমি বিক্রি

news-image

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল
লোকে বলে, রাজধানীর বুকে একখণ্ড জমি ‘সোনার চেয়ে দামি’। মিরপুর ১৪ নম্বর সেকশনে স্থানভেদে কাঠাপ্রতি জমির দাম প্রায় কোটি টাকা। ঠিক সেই জায়গায় আলোচ্য জমিটির মালিক একটি সরকারি সংস্থা। তারা ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানকে সেই জমি কাঠাপ্রতি মোটামুটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বরাদ্দ দিয়েছে। প্রায় ১১২ কাঠা জমি ১৩ কোটি ৯৯ লাখ ৬ হাজার ২৫০ টাকায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

যথাযথ বিধান মেনে বাজারদর যাচাই করে এ জমি বিক্রি করলে প্রায় ১০০ কোটি টাকা পাওয়া যেত। অথচ সেই জমি উল্লিখিত দামে বরাদ্দ দিয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) প্রায় ৮৬ কোটি টাকা গচ্চা দিয়েছে। পদে পদে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কাজটি করা হয়েছে জাগৃকের ভূমি-ব্যবস্থাপনা শাখার এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার যোগসাজশে। মাস দুয়েক আগে মালিকানাসংক্রান্ত সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টদের কাছে। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধান ও বরাদ্দসংক্রান্ত সব নথিপত্র পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে।

সরকারের গচ্চা ৮৬ কোটি টাকা : মিরপুর ১৪ নম্বর সেকশনের যে প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এর পরিমাণ ১ দশমিক ৮৫ একর অর্থাৎ প্রায় ১১২ কাঠা (১.৬৫ শতক = ১ কাঠা হিসাবে)। প্রতিকাঠা জমি কমবেশি কোটি টাকা দরে বিক্রি হওয়ার মতো। সেই হিসাবে জমির দাম আনুমানিক শতকোটি টাকা। অথচ ১১২ কাঠা জমির দাম ১৩ কোটি ৯৯ লাখ ৬ হাজার ২৫০ টাকা ধরা হয়েছে। এ হিসাব ধরেই চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি জমি হস্তান্তর দেখিয়ে সংস্থাটির উপপরিচালক (অর্থ ও হিসাব) গুলরুখ খাদিজা জাহান জমির মূল্য নির্ধারণের একটি চিঠি স্কলার্সের চেয়ারম্যানের কাছে দেন। প্রতিকাঠা জমির দাম সরকারি এ সংস্থাটি পেয়েছে মাত্র ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গৃহায়নের জমির মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত একটি নির্দেশিকা রয়েছে। উন্মুক্ত দর পদ্ধতিতে বিক্রি করতে চাইলে এ জমির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দরদাতা পাওয়া সম্ভব ছিল। জমিটি বরাদ্দের ক্ষেত্রে (বর্তমান বাজার মূল্যের সঙ্গে তুলনা করলে) ৮৬ কোটি টাকা বঞ্চিত হয়েছে সরকার।

বরাদ্দে মানা হয়নি বিধান : গৃহায়নের জমি বরাদ্দসংক্রান্ত বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ‘বরাদ্দ নির্দেশিকা ২০০৮, (সংশোধনী ২০১৬)’-এ এই সব বিষয় স্পষ্ট করে বলা আছে। সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত ধারা ৭.১-এ বলা হয়েছে, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব প্রেরণ করবে। এরপর গৃহায়নের বোর্ডসভায় তা অনুমোদন হবে।’ যে প্রতিষ্ঠানের নামে আলোচিত প্লটটি বরাদ্দ করা হয়েছে তা ব্যক্তিমালিকানাধীন।

গৃহায়নের নথি অনুযায়ী, সংস্থাটির (জাগৃক) সাবেক উপপরিচালক মো. তাজিম উর রহমান প্রথম দফায় ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি স্কলার্সের নামে বরাদ্দপত্র জারি করেন। এরপর এ কর্মকর্তার দায়িত্বে আসেন কমল কুমার ঘোষ। তিনি সংশোধিত বরাদ্দপত্র জারি করেন। তার জারি করা পত্রে বলা হয়, ‘কর্তৃপক্ষের ২২৩তম বোর্ডসভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য মিরপুরস্থ সেকশন-১৪-এর প্রাতিষ্ঠানিক প্লট নং-এ/৯-এর ১ দশমিক ৮৫ একর বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পত্র পাঠানো দরকার।’

সেই পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় চিঠির মাধ্যমে জানায়, ‘জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ২২৩তম বোর্ডসভার সুপারিশ ও সিদ্ধান্তের আলোকে বিবেচ্য স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য সংশোধিত নকশা ও বরাদ্দপত্র দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।’ কিন্তু গৃহায়নের কর্মকর্তারা জানান, বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। অথচ বিধান হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য জমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব আকারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় হয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে সুপারিশ আসবে। পরে বোর্ড তা অনুমোদন করবে। তবে প্রতিষ্ঠানটিকে হতে হবে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দ দিতে হলে প্রথমে এ সংক্রান্ত একটি কমিটি করতে হবে। কমিটি প্লট-বরাদ্দের বিষয়টি উল্লেখ করে একাধিক জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দেবে। অবাধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্লটের দাম নির্ধারণ করতে হবে। সর্বোচ্চ দরদাতাকে জমি বরাদ্দ দিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, ‘পুরো মিরপুর নিয়ে গৃহায়নের মাস্টারপ্ল্যান বা বিশদ পরিকল্পনা রয়েছে। কোথায় স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, খেলার মাঠ ও রাস্তা হবে তার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। যেখানে স্কলার্স স্কুলকে জমি দেওয়া হয়েছে তার আশপাশে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।’

নকশায় ঘষামাজা : অনুসন্ধানে জানা যায়, মিরপুর ১৪ নম্বর সেকশনের এ/৮ এবং এ/৯ নম্বরের দুটি প্রাতিষ্ঠানিক প্লট স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রথমে দশমিক ৪১ একর এবং পরে ১ দশমিক ৪৪ একর জমি মিলে মোট ১ দশমিক ৮৫ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে। এ জন্য দুটি প্লটকে একত্রিত করে একটি ফরম্যাট-নকশাও করা হয়। যদিও এর আগে দশমিক ১১ একর ও ১ দশমিক ১৩ একর মিলে মোট ১ দশমিক ২৪ একরের একটি ফরম্যাট-নকশা অনুমোদন করা ছিল জাগৃকের। পরে জমির পরিমাণ বাড়িয়ে আগের ফরম্যাট-নকশা বাতিল করে নতুন নকশা তৈরি করে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।

জাগৃকের কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা জানান, মিরপুর ১৪ নম্বর এলাকা ঘিরে তাদের একটি মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে। মূল মাস্টারপ্ল্যানে সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য জায়গাও রয়েছে। তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য নকশা তৈরি করে জমি দেওয়ার আইনগত সুযোগ নেই। ফরম্যাট-নকশা তৈরিতে নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হোরায়রা ও সংস্থাটির পরিকল্পনা শাখার দায়িত্বশীলরা জড়িত। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ‘এ প্রতিষ্ঠানের নামে রাস্তার জন্য জমি বরাদ্দ করা হয়েছে, তাও ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা, ২০০৮ আমলে না নিয়ে। সেখানে মনগড়া হিসাবে রাস্তার প্রশস্ততা বিবেচনা করা হয়েছে।’

কর্তৃপক্ষীয় বক্তব্য : জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এ কে এম শামিমুল হক ছিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি জাগৃকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছি অল্প কিছুদিন হলো। যে জমির কথা বলা হচ্ছে, সেই জমির বিষয়ে আমার তেমন কিছু জানা না থাকায় মন্তব্য করতে পারছি না।’

গৃহায়নের পরিচালক মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এখানে যোগদানের শেষের দিকে কিছু কার্যক্রম হয়ে থাকতে পারে। ফাইল না দেখে কিছু বলতে পারছি না।’

গৃহায়নের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু হোরায়রা বলেন, ‘জমি আগেই বরাদ্দ করা হয়েছে। পরে ফরম্যাট-নকশা করা হয়েছে। আমি কোনো অনিয়ম করিনি।’

সাবেক উপপরিচালক (বর্তমানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব) মো. তাজিম উর রহমানের বর্তমান কর্মস্থলে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

সাবেক উপপরিচালক কমল কুমার ঘোষ (বর্তমানে সিনিয়র সহকারী সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) বলেন, ‘আমি হাউজিং থেকে চলে এসেছি। ফাইল না দেখে তো মন্তব্য করতে পারছি না।’

 

এ জাতীয় আরও খবর

গ্যাস সংকটে সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, বিপাকে চালকরা

দুই দফা বাড়ার পর স্বর্ণের দামে বড় পতন

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আজ পদত্যাগ করছেন

আলুর নাগেট তৈরির রেসিপি জেনে নিন

ভালোবাসা পেলাম, এবার তার যোগ্য হওয়ার পালা : ফারিয়া

অবশেষে অনশন ভাঙলেন সোনাম ওয়াংচুক

ফ্ল্যাট থেকে গৃহকর্মীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

মাংস, ডিম ও ব্রয়লারের দাম স্থিতিশীল থাকলেও বেড়েছে মাছের দাম

নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ : শিক্ষা সচিবকে অপসারণ করল ভারত

বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপ

বাগেরহাটে খানজাহান আলী মিশনের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন

নারীদের আত্মনির্ভরশীল করতে সমবায় সমিতির উদ্যোগ