,

আদায় অযোগ্য খেলাপি ঋণ লাখ কোটি টাকা

news-image

জিয়াদুল ইসলাম
ব্যাংক খাতে আদায় অযোগ্য মন্দমানের খেলাপি ঋণ বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত তিন মাসেই এ মানের খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৯ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। শুধু পরিমাণের দিক থেকেই নয়, শতকরা হিসাবেও মন্দমাণের ঋণের অংশ বাড়ছে প্রতিবছর। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের সাড়ে ৮৮ শতাংশই মন্দমানের। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ এখন ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি। দেশের ১৬টি ব্যাংকে এই মানের ঋণের আধিক্য বেশি। ব্যাংকগুলোর ৮ থেকে ৯৯ শতাংশ ঋণই এখন মন্দমানের। এসব ঋণের বেশিরভাগই বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম, জাল-জালিয়াতি ও যোগসাজশের মাধ্যমে বের করে নেওয়া হয়েছে। এই মানের ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুব কম থাকে। মন্দ ঋণ বৃদ্ধির জন্য বাছ-বিচার ছাড়া ঋণ অনুমোদন, ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনে ছাড় ও সুশাসনের অভাবকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, মন্দ ঋণ বাড়লে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যায়। কারণ এর বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়, যা তাদের নিট আয়ে প্রভাব ফেলে। এতে দুর্বল হয়ে পড়ে

ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি। অন্যদিকে মন্দ ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনার ব্যয়ও বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ঋণ শ্রেণীকরণের তিনটি পর্যায় রয়েছে। তা হলো নিম্নমান, সন্দেহজনক এবং মন্দমান বা ক্ষতিজনক। এই তিনটি পর্যায় বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ করতে হয়। এর মধ্যে নিম্নমান ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনকের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দমান বা ক্ষতিজনক ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, কোনো ব্যাংকের মন্দ ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া ওই ব্যাংকের জন্য অগ্রিম সতর্কবার্তা। মন্দ ঋণ বাড়লে ব্যাংকের দুই ধরনের ক্ষতি হয়। একটি হচ্ছে- ব্যাংকের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে, যা পরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে, এ মানের ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। আর এটা করতে গিয়ে সরাসরি প্রেসার পড়ে ওই প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর। ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার সময় যোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনায় রাখলে এ ঋণের পরিমাণ এমন হারে বাড়ত না।

২০২০ সালের মার্চে দেশে করোনার আঘাত আসার পর ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে ব্যবসায়ীদের স্বল্পসুদে প্রণোদনার ঋণ দিয়ে সহযোগিতার পাশাপাশি ওই বছরজুড়েই ঋণ পরিশোধে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। ফলে ওই বছর বকেয়া ঋণের কোনো কিস্তি পরিশোধ না করেও কেউ খেলাপি হননি। ২০২১ সালে এই সুবিধা বহাল রাখা না হলেও বকেয়ার ঋণের মাত্র ১৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধে করলেই খেলাপিমুক্ত থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসায় ব্যবসায়ীদের খেলাপিমুক্ত থাকার সব ধরনের শিথিলতা চলতি বছর থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। আর তাতেই ব্যাংক খাতে ব্যাপক হারে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ ১০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা বেড়ে গত মার্চে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা বা ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এই খেলাপি ঋণের মধ্যে আদায় অযোগ্য মন্দমানের খেলাপির পরিমাণ ১ লাখ ৩৭৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা বা ৮৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। তিন মাস আগে ২০২১ সালে ডিসেম্বরে ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকার খেলাপি ঋণের মধ্যে মন্দঋণের পরিমাণ ছিল ৯১ হাজার ৫৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বা ৮৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়ার মূল কারণ খেলাপিদের বারবার সুবিধা দেওয়া হয়। এসব সুবিধা পেয়ে তারা আর ঋণ শোধ করেন না। খেলাপিরা মনে করেন, খেলাপি হলেই বেশি সুবিধা পাওয়া যায়। তাদের দেখে ভালো গ্রাহকরাও সেই পথে হাঁটছেন। তাই আমি বলব খেলাপি রোধের একটাই সমাধান শাস্তি। খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে খেলাপি কমানোর যতই নির্দেশনা দেওয়া হোক, কাজ হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি খাতের ১৬টি ব্যাংকে মন্দমানের খেলাপির অংশ বেশি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ মন্দ ঋণ রয়েছে বিদেশি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের। ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের ৯৯ শতাংশই মন্দমানে পরিণত হয়েছে। মন্দ ঋণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। এ ব্যাংকের ৮০ দশমিক ৩৪ শতাংশই এখন মন্দমানের। তৃতীয় অবস্থানে থাকা পদ্মা ব্যাংকের মন্দ ঋণের অংশ ৬৭ শতাংশ। অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের ৫৪ দশমিক ৫২ শতাংশ, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৪১ দশমিক ৪৭ শতাংশ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ৩৩ শতাংশ, জনতা ব্যাংকের ১৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, সোনালী ব্যাংকের ১৭ দশমিক ২৬ শতাংশ, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ১৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংকের ১৫ দশমিক ২৯ শতাংশ, রূপালী ব্যাংকের ১৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ, এবি ব্যাংকের ১৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ, হাবিব ব্যাংকের ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ ও ওয়ান ব্যাংকের ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

শতকরা অংশ হিসাবেও মন্দমানের ঋণ বাড়ছে প্রতিবছর। যেমন ২০১৯ সালে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের মধ্যে মন্দমানের ঋণ ছিল ৮১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা বা ৮৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ। করোনার বছর ২০২০ সালে ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের মধ্যে মন্দ ঋণ ছিল ৮৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ। আর ২০২১ সালে ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকার খেলাপি ঋণের মধ্যে মন্দ ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।

এদিকে, গত মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরণে ব্যর্থ হয়েছে ৯টি ব্যাংক। এ তালিকায় আছে সরকারি খাতের ৪টি ও বেসরকারি খাতের ৪টি। এসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা।

 

এ জাতীয় আরও খবর

ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি কেন, জানালেন জিএস ফরহাদ

শিশুদের সম্ভাবনা বিকশিত করতে মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতের আহ্বান জুবাইদা রহমানের

‘বৃত্তি-উপবৃত্তিতে সমতা নয়, প্রয়োজনের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার’

রাজউকে দুদকের হানা

বীমা খাতে ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া

অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্বারস্থ ৭ সাবেক অধিনায়ক

ট্রাম্পের সমঝোতার ঘোষণার পরই কিয়েভে পেট্রল স্টেশনে হামলা

এস কে সুরের স্ত্রীর দুই বছরের কারাদণ্ড

সাদ্দাম-ইনানসহ ৭ আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়ে ঢাবিতে মিষ্টি বিতরণ

সৎ থাকাটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ: আসিফ মাহমুদ

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রভাবে সংকটে গরুর মাংসের বাজার

যেসব অভিযোগে ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড