শুক্রবার, ২৪শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ৯ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিএম কনটেইনার ডিপোতে ছিল অনিয়ম

news-image

অনুমোদনহীন রাসায়নিক ফেলে রাখা হয়েছে দিনের পর দিন। বিস্ফোরক দ্রব্য মজুদ ও সংরক্ষণের নীতিমালা মানা হয়নি। ছিল না তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা বেহাল; নবায়ন হয়নি পরিবেশ ছাড়পত্রও। উপরন্তু ডিপোর ১০ মিটারের মধ্যেই নিরাপত্তা প্রাচীর ছাড়াই স্থানীয়দের বসবাস। ভয়াবহ অগ্নিকা- এবং দানবীয় বিস্ফোরণে বিপুল প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর চট্টগ্রামের সীতাকু-ের বিএম কনটেইনার ডিপোর সার্বিক অগ্নি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চরম ঘাটতি ও পরতে পরতে এমন অব্যবস্থাপনার চিত্র এখন সামনে চলে আসছে।

এদিকে গতকাল সোমবার তৃতীয় দিনেও ডিপোয় আগুন জ¦লতে দেখা গেছে। অগ্নিকা-ের ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময়েও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। কয়েকটি কনটেইনারে রাসায়নিক পদার্থ থাকায় ডিপোর ভেতরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সেনাবাহিনী। আগুন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের আশঙ্কা, ফের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তাই খুবই সতর্কতা ও সুপরিকল্পিতভাবে আগুন নেভানোর কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাদের। ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক (প্রশিক্ষণ শাখা) মনির হোসেন বলেন, ডিপোতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। পানির কোনো উৎস নেই; অনেক দূর থেকে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে করে পানি আনতে হচ্ছে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, রাসায়নিক সংরক্ষণ নীতিমালা অনুসরণ করে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড রাখা হয়নি। দুর্ঘটনা মোকাবিলায়ও কোনো প্রস্তুতি ছিল না।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বলছেন, আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে প্রতিটি ধাপে বেগ পেতে হচ্ছে। রাসায়নিক দ্রব্য মজুদের ক্ষেত্রে যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখতে হয়, তার কিছুই নেই। নিরাপত্তাজনিত সমস্যার কারণে ৪৮ ঘণ্টা পরও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যথাযথ প্রক্রিয়ায় কনটেইনার সরানোর কাজ না করলে আগুন নেভানো যাবে না। অত্যাধুনিক ‘হাজমত টেন্ডার’ তাদের কাছে রয়েছে। এই টেন্ডারে কেমিক্যাল থেকে সৃষ্ট আগুন নেভানোর ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে সেটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ডিপোর মালিকের ভুল তথ্যের কারণে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের প্রাণহানি ঘটেছে। তাই আগুন নিয়ন্ত্রণে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকি নিয়ে যাতে কোনো প্রাণহানি না হয়।

গতকাল সকাল থেকে বিএম ডিপোর সামনে অবস্থান করে দেখা গেছে, রাসায়নিকের আগুন নেভাতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ২০ জনের একটি দল অত্যাধুনিক ‘কেমিক্যাল টেন্ডার’ নিয়ে অবস্থান করছেন। কিন্তু ‘স্কেভেটর’ না থাকায় কনটেইনার সরানোর কাজ শুরু করা যায়নি।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলেছেন, ডিপোতে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতির কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ডিপোতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকলে শুরুতেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যেত। অগ্নিকা-ের সঙ্গে সঙ্গে জরুরি যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল, সেগুলো একেবারেই করেনি ডিপো কর্তৃপক্ষ। সেখানকার শ্রমিক ও অন্যদের যেভাবে বের করে আনা দরকার ছিল, সেটাও করা হয়নি। সেটা করা গেলে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটত না।

শ্রম আইন, ২০০৬ এবং শ্রম বিধিমালা ২০১৫ অনুযায়ী, বড় ধরনের কোনো স্থাপনা বা কোনো কারখানার একটি অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকতে হয়। এর অর্থ হচ্ছে কোনো প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের দাহ্য পদার্থ আছে, তার বিশদ বর্ণনা থাকতে হবে। এরপর প্রতিরোধের বিষয়। আছে ফায়ার ফাইটিংয়ের বিষয়টি। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার পরও দুর্ঘটনা ঘটে গেলে কীভাবে তার ব্যবস্থাপনা হবে, সেই বিষয়টিও পরিকল্পনায় থাকতে হবে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেন, ফায়ার সার্ভিসের বিশেষায়িত ‘হাজমত টিম’ ঘটনাস্থলে কাজ করছে। এ টিম বিদেশে প্রশিক্ষিত এবং তারা আগুনের ভেতরে থেকেও কাজ করতে পারে। ডিপোতে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড রাসায়নিক থাকার কারণে সেখানে এত বড় বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ডিপোতে অপ্রতুল অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ আরও কিছু অসংগতি লক্ষ করা গেছে।

ফায়ার সার্ভিসের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ডিপোতে হাইড্রেন্ট সিস্টেম ছিল না। পানির লাইন থাকলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল থাকলে তারাই নিভিয়ে ফেলতে পারতেন। এত বড় ডিপোতে হাইড্রেন্ট সিস্টেম থাকা উচিত।

জানা গেছে, বেসরকারি ডিপো পরিচালনার জন্য নৌ মন্ত্রণালয় (বন্দর কর্তৃপক্ষ) থেকে অনুমতি নিতে হয়। এরপর সেখানে পণ্য খালাসের অনুমতি দেওয়া হয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে। তবে চট্টগ্রাম বন্দরের আইসিডি নীতিমালা অনুযায়ী এটি পরিচালিত হয়। আমদানি-রপ্তানির বিষয়টি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দেখভাল করে।

দেশের শতভাগ রপ্তানি পণ্য ১৯টি আইসিডির মাধ্যমে জাহাজীকরণ হয় এবং ৩৭ ধরনের আমদানিপণ্য খালাস হয়। ডিপো থেকে রাসায়নিক রপ্তানির সুযোগ থাকলেও আমদানি করা রাসায়নিক ডিপোতে আনার সুযোগ নেই। ডিপো পরিচালনার জন্য বন্দর, কাস্টমস, ফায়ার, পরিবেশ এবং শ্রম অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। ডিপো মালিকদের দাবি, যে কোনো ধরনের পণ্য রপ্তানি করা যাবে; এজন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বিএম ডিপো বন্দরের নীতিমালা এবং আইএসপিএস কোড অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক। তবে কেমিক্যাল কমপ্লায়েন্স কিনা, সে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কমিটির সদস্যরা জানতে চেয়েছেন, তবে কর্তৃপক্ষ সঠিক কোনো উত্তর দিতে পারেননি।

ডিপো মালিকের দাবি অফডক পরিচালনার অনুমোদন পেলে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিতে হয় না। তবে চট্টগ্রাম বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন বলেছেন, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডসহ বিপজ্জনক পণ্যগুলি নিরাপদে কিভাবে সংরক্ষণ ও পরিবহন করতে হয়, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট গাইডলাইন আছে। সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ধরনের শেড নির্মাণ, জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে এবং হিট কন্ট্রোল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়। বিএম ডিপোর ১০ মিটারের মধ্যেই স্থানীয়দের বসবাস। ছিল না বিশেষ ধরনের শেডও।

বিএম ডিপোতে বিস্ফোরণের ঘটনায় কারও গাফিলতি প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বারাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গতকাল সোমবার দুপুরে বিএম ডিপো পরিদর্শন শেষে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, অবহেলা বা দায় থাকলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সে যতবড় শক্তিশালী হোক না কেন। বিএমপি ডিপো পরিদর্শনকালে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘটনার বিষয়ে কথা বলেন।

কারখানায় ফেরত যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল রাসায়নিক : বিএম ডিপোতে ২৩টি কনটেইনারে থাকা হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড বিস্ফোরণ ঘটে। মার্কেস লাইন ও ওয়ান শিপিং নামে দুটি শিপিং কোম্পানি পণ্যগুলো জাহাজীকরণের কথা। কিন্তু মার্কেস লাইন ২০টি কনটেইনারে থাকা রাসায়নিক আমদানিকারকের কাছে পাঠাতে অপারগতা প্রকাশ করে। ফলে সেগুলো কারখানায় ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বাকি ১৩টি কনটেইনারের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে কতদিন ধরে রাসায়নিক জারগুলো বিএম ডিপোতে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করতে পারেননি কাস্টমস কর্মকর্তারা। ওই ডিপোর দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার উত্তম চাকমা আমাদের সময়কে বলেন, ‘চালানগুলো কোন দেশে যেত, সে বিষয়ে আমরা জানি না। কারণ কাস্টমসে রপ্তানি দলিলাদি জমা দেয়নি।’

অতিরিক্ত ডাইড্রোজেন পারঅক্সাইড উৎপাদন: ‘বিএম কনটেইনার ডিপো’ স্মার্ট গ্রুপের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। গ্রুপের আরেকটি প্রতিষ্ঠান আল রাজি কেমিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিডেট। এটি হাটহাজারী উপজেলার ফতেয়াবাদ ঠান্ডাছড়ি এলাকায় অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটিকে বেশ কয়েকটি শর্তে রাসায়নিক উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। এরমধ্যে প্রধান একটি শর্ত হলো, বছরে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ছাড়া অন্য কোনো রাসায়নিক উৎপাদন নিষিদ্ধ এবং বছরে ১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি উৎপাদন করা যাবে না। কিন্তু চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, বিগত তিন বছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৯ হাজার মেট্রিক টন রপ্তানি করেছে। শর্ত অনুযায়ী ৩ হাজার টনের বেশি উৎপাদনের কথা নয়।

কারখানায় নেই ইটিপি, নবায়ন হয়নি পরিবেশ ছাড়পত্র: পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়ে আল রাজি কেমিক্যাল কমপ্লেস্ক হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড উৎপাদন শুরু করলেও বসেনি ইটিপি। অথচ কারখানা অনুমোদনের অন্যতম শর্ত ছিল ইটিপির মাধ্যমে তরল বর্জ্য পরিশোধন করতে হবে। এছাড়া ২০২১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। প্রতিবছর পরিবেশ ছাড়পত্র নবায়ন করতে হয়, সেই হিসাবে আবেদন করেছে কিন্তু ছাড়পত্র দেয়নি পরিবেশ অধিদপ্তর।

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যালয়ের উপপরিচালক মিয়া মাহমুদুল হাসান আমাদের সময়কে বলেন, পরিবেশ ছাড়পত্র নবায়নের আবেদন করেছিল; ইটিপি চালু না করায় নবায়ন করা হয়নি।

 

এ জাতীয় আরও খবর

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ হলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মালদ্বীপের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ হাইকমিশনারের বৈঠক

বোয়ালখালীতে ৫ শ্রমিকের মৃত্যু, মামলা ছাড়াই চলছে সমঝোতার চেষ্টা

১৭ বছর পর ইংল্যান্ড সফরে বাংলাদেশ, টেস্ট হবে লর্ডসে

২৭ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম বোর্ডের HSCপরীক্ষা শুরু

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে তারেক রহমানকে মোদির আমন্ত্রণ

গাজী নজরুলের বহিষ্কার জানিয়ে ইসিকে চিঠি জামায়াতের

ইরান ইস্যুতে কঠিন কূটনৈতিক চাপে ট্রাম্প

মানবিক সহায়তায় আলোচনায় ‘আমরা বিএনপি পরিবার’

২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য বাংলাদেশের

শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ড. খলিলুরের বৈঠক

তথ্যমন্ত্রীর নামে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, সতর্কবার্তা