,

আইনের সুফল পান না গর্ভবতী শ্রমিকরা

news-image

আফসানা আক্তার ও জান্নাতুল ফেরদৌসি
কিশোরী বয়সে একটি তৈরি পোশাক কারখানায় অপারেটর সহযোগী (হেলপার) হিসেবে চাকরি নেন আবেদা বেগম (২৬)। ১১ বছরের চাকরিজীবনে দুইবার গর্ভধারণ করেছেন। তবে একবারও মাতৃত্বকালীন ছুটি কিংবা ভাতা পাননি।

প্রথমবার গর্ভাবস্থায় ৮ মাস কাজ করেছেন আবেদা। দ্বিতীয়বার গর্ভকালের শুরুতেই চাকরি ছেড়ে দেন। সন্তান প্রসবের পর আবার কাজ শুরু করেন। গর্ভাবস্থায় সহকর্মীদের কাছে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতা সম্পর্কে শুনেছিলেন। তবে তাদের কারখানায় মাতৃত্বকালীন ছুটি বা ভাতা দেয়ার নিয়ম না থাকায় নিজের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এই নারী শ্রমিক।

আবেদা বেগমের জা সুমি আক্তারও (২৪) তার মতো তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক। ‘গর্ভাবস্থায় অসুস্থ হলে চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হবে’ কারখানা কর্তৃপক্ষের এমন হুঁশিয়ারি শুনে আগেই চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। তাদের প্রতিবেশী টুম্পা আক্তারও গর্ভাবস্থায় ৩ মাস কাজ করে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

আবেদা, সুমি ও টুম্পার মতো এমন হাজারো তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক প্রতিবছর তাদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময়টুকুতে পড়তে হচ্ছে শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক সংকটে।

গত ১ সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জের ১১টি তৈরি পোশাক কারখানার অন্তত ৩৭ জন নারী শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। দেখা গেছে, অধিকাংশ শ্রমিকই মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতা সম্পর্কে জানেন। তবে মালিকপক্ষের অনীহা ও অসহযোগিতার কারণে বঞ্চিত থেকে যান।

আবেদা জানান, ভাতা ও ছুটির বিষয় তিনি জানতেন। তবে কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, তাদের কারখানায় এসব সুবিধা দেওয়া হয় না। এ নিয়ে আর কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাননি আবেদাও।

সুমি বলেন, ‘কারখানা মালিক প্রথমেই বলে দিছে গর্ভাবস্থায় অসুস্থ হলে বের করে দেবে। তাই আমি আগেই কাজ ছেড়ে দিয়েছিলাম।’ টুম্পা আক্তারও একই কথা জানান। বলেন, ‘বাচ্চা পেটে আসার পর ৩ মাস কাজ করেছিলাম। কোয়ালিটি ডিপার্টমেন্টে কাজ করতাম। সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকতে হইতো। একটু বসলেই গালিগালাজ শুনতে হইতো। সইতে না পাইরা কাজ ছেড়ে দিছিলাম।’

অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী মাাতৃত্বকালীন সময়ে নানান সুযোগ সুবিধা পাবার কথা এসব শ্রমিকদের। শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, শ্রমিক কোন প্রতিষ্ঠানে ৬ মাস কাজ করলে সে মাতৃত্বকালীন সুবিধা পাওয়ার অধিকারী। অন্তঃসত্ত্বা শ্রমিক প্রসবের পূর্বে ৮ সপ্তাহ ও পরে ৮ সপ্তাহ মোট ১৬ সপ্তাহের বেতন-ছুটি পাবেন। একটি নির্দিষ্ট হারে ভাতাও দেওয়ার বিধান রয়েছে। অন্তঃসত্ত্বা শ্রমিককে দীর্ঘক্ষণ ও ভারী কাজ করানো যাবে না। শ্রমিক এ সুবিধা সর্বোচ্চ দুইবার ভোগ করতে পারবে। আর নিয়োগকর্তা শ্রমিককে এসব সুবিধা দিতে বাধ্য।

 

শ্রমিক কল্যাণে করা আইন তদারকির জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ৬টি পৃথক বিভাগ রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও এনজিও।

নারায়ণগঞ্জের বিভাগীয় শ্রম অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) তথ্যমতে, নারায়ণগঞ্জ জেলায় ছোট-বড় সহস্রাধিক তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। যার মধ্যে আটশতাধিক কারখানা কমপ্লায়েন্স তালিকাভুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের সকল সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৫৫ শতাংশ শ্রমিক নারী। প্রতিবছর তাদের অন্তত ১ শতাংশ অর্থাৎ ৫ হাজার শ্রমিক গর্ভধারণ করেন।

শ্রমিকরা জানিয়েছেন, গর্ভকালীন সময় কাজ করার ক্ষেত্রে তাদের অনুৎসাহিত ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। গর্ভবতী নারী কর্মীকে ভারী ও অধিক কাজ দেয়াসহ বিভিন্ন কৌশলে কর্মীদের চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এ কৌশলে কাজ না হলে ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া এবং পরবর্তীতে কোনো অজুহাতে ছাঁটাই করা হয়। এমন একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে গর্ভধারণের খবর পাওয়ার পরপরই নানা অজুহাতে কর্মীদের ছাঁটাই করা হয়। কিছুক্ষেত্রে গর্ভকালীন ছুটি দিলেও বেতন ও ভাতা নিয়ে তালবাহানা করে মালিকপক্ষ। যদিও শ্রম আইনে বলা হয়েছে, কোনো শ্রমিক সুবিধাবঞ্চিত হলে নির্দিষ্ট অধিদপ্তরে অভিযোগ ও পরবর্তীতে মামলার মাধ্যমে তার অধিকার আদায় করতে পারবে।

কিন্তু নারায়ণগঞ্জ কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বছরে ৫ থেকে ৭ জন শ্রমিক মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতার জন্য অভিযোগ করেন। যা মামলা পর্যন্ত গড়ায় না। এছাড়া পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র কাছে বছরে দু-একজন অভিযোগ করেন। অন্যদিকে শ্রম কল্যাণ অফিস থেকে বছরে সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৬ জন শ্রমিক মাতৃত্বকালীন অনুদান গ্রহণ করেন। প্রতি বছর জেলায় গর্ভধারণ করা শ্রমিকদের তুলনায় এই সংখ্যায় নেহায়েত অনেক কম।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শ্যামলী শীল সম্প্রতি নারী পোশাক শ্রমিকদের নিয়ে করা তার পিএইচডি গবেষণাপত্র জমা দিয়েছেন। শ্যামলী শীল বলেন, ‘গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি শুধু বড় বড় কমপ্লায়েন্স কারখানাগুলো বিদেশি ক্রেতাদের জন্য আইনের কিছুটা মেনে চলে। এর বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানে শ্রম আইনের যথার্থ পালন হয় না। শ্রম আইনে ৬ মাস কাজ করলে মাতৃত্বকালীন সুবিধা দেয়ার কথা বললেও বাস্তবে কমপ্লায়েন্স গার্মেন্টসগুলো এক বছর কাজের পর শ্রমিককে এ সুবিধা দেয়। সেটাও সম্পূর্ণ দেয়া হয় না। নানা কৌশলে তারা শ্রমিকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বঞ্চিত শ্রমিক বিভিন্ন কারণে অভিযোগ ও মামলা করেন না। তার মধ্যে অন্যতম কারণ আইন ও অধিকার সম্পর্কে কম জানা। এছাড়া মালিকপক্ষের অসহযোগিতা, ভয়, ইয়্যালো শ্রমিক ইউনিয়ন, অস্থায়ী নিয়োগসহ একাধিক কারণ আছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অভিযোগ করার কারণে শ্রমিক চাকরি পর্যন্ত হারায়।’

এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন নগরীর থানা পুকুরপাড় এলাকার রাসেল গার্মেন্টসের কর্মী শারমিন আক্তার, সাথী, জান্নাতুল, রোকসানা ও নাসিমা। দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের প্রথম পর্যায়ে গর্ভধারণ করেন তারা। লকডাউনে প্রতিষ্ঠান বন্ধের পর খোলা হলে তাদের চাকরিতে ফিরিয়ে নেয়নি মালিকপক্ষ। কিছুদিন পরে তারা জানতে পারেন, বিনা নোটিশে তাদের ছাঁটাই করা হয়েছে। মাতৃত্বকলীন ভাতাসহ বকেয়ার দাবিতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন তারা। দিনের পর দিন ঘোরাঘুরির পর মীমাংসায় আসে মালিকপক্ষ। কিছু টাকা দিয়ে মালিকপক্ষ তাদের মাতৃত্বকালীন ছুটির পর যোগাযোগ করতে বলে। পরবর্তীতে তারা জানতে পারেন, অভিযোগ করায় ক্ষুব্ধ মালিকপক্ষ তাদের আর চাকরিতে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শারমিন আক্তার (২৫) বলেন বলেন, ‘মীমাংসার সময় আমাদের সবাইকে ১২ হাজার টাকার একটা চেক দিয়ে সাদা কাগজে দস্তখত নেয়। বাচ্চা হওয়ার পর কারখানায় যেতে বলে। আমি গেছিলাম, অনেকবার গেছিলাম। আমারে কইছে অভিযোগ করছি দেইখা আমাগো আর কাজে নিবো না। এরপর থেকে বেকার আমি।’

নারায়ণগঞ্জের আদমজীতে অবস্থিত ইপিজেডের সুপ্রিম স্মার্টওয়্যান লিমিটেডের কোয়ালিটি বিভাগের কিউআর হিসেবে ৭ বছর কাজ করেছেন আনজুমান আরা। তিনি বলেন, ‘মাতৃত্বকালীন ভাতাসহ প্রায় লাখ টাকা বকেয়া ছিল। গতবছর ঈদের ছুটি শেষে হঠাৎ জানতে পারি আমার চাকরি নেই। একই সময়ে আমার স্বামীর ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। কী কষ্টে আমাদের দিন যায় বলে বুঝাতে পারবো না। লিখিত অভিযোগ করেছি কিন্তু তারও কোনো সমাধান দেখছি না।’

বাংলাদেশে শ্রম আইনে শ্রমিকদের অনেক সুযোগ-সুবিধার কথা উল্লেখ থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন নেই বলে অভিমত শ্যামলী শীলের। তিনি বলেন, ‘মালিকপক্ষের তালবাহানাই এর মূল কারণ। এছাড়া আইন অনুযায়ী গর্ভবতী শ্রমিকের সম্পূর্ণ খরচ প্রতিষ্ঠান বহন করার কথা। কিন্তু বাইরের দেশে আইনে বলে, এ খরচ প্রতিষ্ঠান ও সরকার সমানভাবে বহন করবে এবং এর জন্য স্বাস্থ্য বীমাসহ বেশকিছু অর্থনৈতিক পদক্ষেপ রয়েছে। ফলে মালিকপক্ষ শ্রমিদের ন্যায্য পাওনা দিতে এত অসুবিধা হয় না। আমাদের দেশেও এই ব্যবস্থা চালু করতে হবে।’

বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘শ্রমিকের মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতার বিষয়ে বিকেএমইএ’র অবস্থান স্পষ্ট। কোনো শ্রমিক এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলে বা কোনো অভিযোগ আসলে এক্ষেত্রে আমরা কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করি। কিন্তু এ বিষয়ে তেমন কোনো বড় অভিযোগ আমাদের কাছে আসে না। বছরে এক থেকে দুইটা।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব ঘটনায় মালিক ও শ্রমিক উভয়ের কিছু সংকট আছে। এমনও হয়, ঘটনা মালিকের কানেও যায় না, মিড লেভেল কর্মকর্তারা ছাঁটাই করে দেয়। এর মূল কারণ শ্রম আইন বিষয়ে অজ্ঞতা। অজ্ঞতার কারণে শ্রমিকরা মূল কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে চাকরি ছেড়ে দেয়। পরে জানা যায় সে গর্ভবতী আর কাজ করবে না। মাতৃত্বকালীন ছুটির পর শ্রমিকের কাজে ফেরার কথা থাকলেও অনেক শ্রমিক তা করেন না। এ সমস্যা সমাধানের প্রধান উপায় শ্রম আইন সম্পর্কে মালিক-শ্রমিক উভয়কে সচেতন করা। তদারকি নিশ্চিত করা। সরকার যদি সোশ্যাল সেফটি নেট চালু করতে পারে তাহলে আমার বিশ্বাস এ জায়গাগুলো সংশোধন হয়ে যাবে।’

বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার বলেন, ‘গর্ভবতী গার্মেন্টস শ্রমিকরা শুধু তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় না। পুরো গর্ভাবস্থায় শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন জটিলটায়ও ভোগে। শ্রমিকদের তাদের অধিকার ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও সচেতন করতে হবে। এজন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিক সংগঠন ও সরকারিভাবে ব্যাপক প্রচারণার দরকার। একইসঙ্গে সমস্যা সমাধানে সরকার, মালিকপক্ষ ও বিদেশী ক্রেতা সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা আবশ্যক।’

[ডিডব্লিউ একাডেমি আয়োজিত নারী সাংবাদিকদের মেন্টরশিপ প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে]

 

এ জাতীয় আরও খবর

বিদায়ি বক্তব্যে কাঁদলেন মির্জা ফখরুল

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ১৪ কার্গো এলএনজি কিনবে সরকার

১২ জেলায় ঝড়ো হাওয়ার সতর্কতা

ময়মনসিংহে এনসিসি ব্যাংকের স্টুডেন্ট ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন ও বৃক্ষবিতরণ অনুষ্ঠিত

বিএসইসির ১৭ কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশকে ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেকের সভা

জিয়া-খালেদার সমাধিতে বিএনপির নতুন ৪ নেতার শ্রদ্ধা

সমাজের সবাই এগিয়ে এলে বড় সমস্যার সমাধান সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতে বড় পতন

রাষ্ট্রপতি হলেও জনগণের পাশে থেকে সেবা করতে চাই: মির্জা ফখরুল

গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে যা করবেন, যা করবেন না