,

নিরপেক্ষ নির্বাচনের উদ্দেশ্যে খালেদার জাতীয় ঐক্যের ‘ভিত্তি’ গড়ছেন রব!

 

নিজস্ব প্রতিবেদক : অনেকটাই নীরবে এগিয়ে চলেছে একটি তৃতীয় রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ‘ইশারায়’ এ জোটগঠনের ‘ভিত্তি’ গড়ার কাজ করছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আসম আবদুর রব। দৃশ্যত জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপনের চেষ্টা হলেও কার্যত এর উদ্দেশ্য হচ্ছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে বাধ্য করা। চলতি অক্টোবর নাগাদ এই প্রক্রিয়ার প্রতিফলন দেখা যাবে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তারা। ঐক্য-প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে আলাপকালে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

cb918bb2a4bf2c501346ebcf476ec2eb-57d0612f05800

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘আমাদের অনেক কথা হয়েছে। আমাদের মধ্যে অমিল থাকলেও সরকারের বিরুদ্ধে তো এক। সেক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক জোটের চিন্তা ছিল। আমরা বলেছি, ঐক্য হোক।’

জানতে চাইলে জাতীয় ঐক্য-প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম ২০ দলীয় জোটেই তারা কেউ কেউ আসুক। না হলে স্বতন্ত্র জোট হোক। আমাদের প্রত্যাশা, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হোক। এর ফল যেন হয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।’

তবে বিষয়টি নিয়ে সরাসরি উত্তর না দিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি আসম আবদুর রব ঐক্য-প্রক্রিয়া নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আমি ঐক্যে বিশ্বাসী। অতীতে যতবার দেশে সংকট এসেছে, ততবারই মানুষের ঐক্য হয়েছে। এবারও আশাবাদী। আমি ঐক্য-প্রক্রিয়া নিয়ে হতাশ নই। একটি রাজনৈতিক ঐক্য হবে মনে করি।’

ঐক্য-প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভাষ্য, খালেদা জিয়া জাতীয় ঐক্য করতে যেকোনও উপায় অবলম্বন করতে রাজি। এক্ষেত্রে তিনি সম্ভাবনার সব দরজা খুলে রেখেছেন। প্রাথমিকভাবে দল ও দলের বাইরে থেকে ঐক্যের প্রধান বাধা হিসেবে জামায়াতকে দেখানো হলেও এখনই এ বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেবেন না বিএনপি চেয়ারপারসন।

সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগের বাইরের দলগুলোর মধ্যে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), বিকল্প ধারা, গণফোরাম, বাসদ (জামান), নাগরিক ঐক্য উল্লেখযোগ্য। এই দলগুলোর মধ্যে তিনটি দলের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয় গত ৭ আগস্ট আ স ম আবদুর রবের বাসায়। এই দলগুলো ভোটের অঙ্কে জামায়াতের তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও খালেদা জিয়ার বিবেচনায় দুটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম কারণ হলো—দল ছোট হলেও দলীয় প্রধানরা রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত-জনগ্রহণযোগ্য। দ্বিতীয়ত, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা মামলার রায় তার বিরুদ্ধে গেলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করতে পারলে ওই নেতাদের তাদের দিয়ে জোটরক্ষা ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন ধরে রাখা সহজ হবে। যেটি জামায়াতকে পাশে রেখে মোটেও সম্ভব নয় বলেই মনে করে সূত্রটি।

সূত্র এও জানায়, ‘জোট গঠনে আসম রবের কাজ হচ্ছে সরকারের বাইরে থাকা জামায়াতবিরোধী সব দলকেই একত্রে নিয়ে একটি জঙ্গিবাদবিরোধী প্ল্যাটফরম গড়ে তোলা। এই জোটটি কর্মসূচি দেবে নিজেদের মতো করেই। এই প্রক্রিয়ায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটভুক্ত হওয়ার কৌশল নিয়েই আগাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতের সঙ্গেত্যাগ করতে হতে পারে বিএনপিকে। এই বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘শর্ত’ কাজ করবে। প্রথমত, জঙ্গিবাদবিরোধী জোটকে ‘নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের’ লক্ষ্য ঠিক করতে হবে; দ্বিতীয়ত, তৃতীয় জোটের সব দলকেই খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি জোটে সরাসরি যুক্ত হতে হবে বা উভয়জোটই যুগপৎ কর্মসূচিতে মার্চ করবে। কেবল এই শর্তেই বারো বছরের বেশি জোটবন্ধু জামায়াতকে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেবে বিএনপি। তবে এর পাশাপাশি জামায়াতকেও সুযোগ দিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চাইবেন খালেদা জিয়া। সব দল থেকে জামায়াতকে বাধা হিসেবে দেখলে দলটিকে শেষপর্যন্ত জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। এই পরামর্শ মানার ব্যাপারে দলটি গুরুত্ব না দিলে ছিন্ন হতে পারে বিএনপি-জামায়াতের বন্ধন।

সূত্রটি জানায়, খালেদা জিয়াসহ বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ধারণা—সাধারণ কথার ওপরে জামায়াতকে ছেড়ে দিলে আখেরে বিএনপিকেই পস্তাতে হতে পারে। এতে আওয়ামী লীগ নানা ধরনের রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণে তৎপর হবে। এ কারণে কাদের সিদ্দিকী সম্প্রতি খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে জামায়াত সঙ্গত্যাগের বিষয়ে পরামর্শ দিলেও কোনও মত দেননি বিএনপি-প্রধান। এমনকী দলের শুভাকাঙ্ক্ষী-বুদ্ধিজীবীদের মধ্য থেকেও সরাসরি জামায়াতবিরোধিতা করা হলে ২০ দলীয় জোটে নিয়মিত অংশগ্রহণ রয়েছে দলটির।

সূত্র জানায়, আসম রবের কমিটমেন্ট নিয়ে সুনাম রয়েছে রাজনৈতিক মহলে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সঙ্গে কমিটমেন্ট করে রেখেছিলেন তিনি। এর ফলে খালেদা জিয়ারও আত্মবিশ্বাস প্রবল যে, রবের নেতৃত্বে একটি জোট গড়ে উঠবে এবং শেষ পর্যন্ত এই জোটটিই নির্বাচনের পথ পরিষ্কার করবে।

বিএনপির পর্যবেক্ষক একটি রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, ‘এটি রব ও জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ডুয়েল গেম। রব থাকবেন ঐক্য নিয়ে আর জাফরুল্লাহ থাকবেন বিএনপির সংস্কার চেয়ে তৃতীয় শক্তি নিয়ে। এই দুই বলয়ের সমন্বয়ে এক পর্যায়ে আমেরিকা হয়ে ড. ইউনূস তৃতীয় শক্তি গড়ে তুলতে পারেন।’

ঐক্য-প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ একজন বুদ্ধিজীবী বলেন, ‘এই ঐক্য-প্রক্রিয়া শুরু করতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে পরামর্শ করেই আমরা আসম রবকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। চলতি বছরের অক্টোবরের মধ্যেই খানিকটা প্রতিফলন দেখা যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রক্রিয়া বাস্তবে রূপ নিলেই জামায়াত বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে। দলটিকে হয় নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হবে সরকার, না হয় ২০ দলীয় জোট থেকে সরে পড়তে বাধ্য হবে জামায়াত। এটা আমাদেরই একটা পরিকল্পনা ছিল। ওইভাবে অগ্রসর হয়েছিলাম আমরা।’

আসম রবের প্রক্রিয়াটি একটি ফলপ্রসূ লক্ষ্যস্থির করতে সক্ষম হবে বলে দাবি করেছেন বিএনপিপন্থী একজন প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী। তিনি বলেন, ‘এই প্রক্রিয়া ফলপ্রসূ হবে বলে আশা করছি। নির্বাচনটা মনে হয় পরবর্তী বছরের প্রথম এক-দুই মাসের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে—এ ব্যাপারে আমি আশাবাদী। তার আগে বেশ কিছু কাজ করতে হবে। ড. কামাল হোসেন, কাদের সিদ্দিকী, বি চৌধুরী এ প্রক্রিয়ায় থাকবেন বলে জানান। ইতোমধ্যে প্রেসক্লাবে বি চৌধুরী জানিয়েছেন, যেকোনও দল ডাকলেই তিনি সাড়া দেবেন।’

খালেদা জিয়ার এই মুহূর্তে চিন্তাভাবনা কী—এমন প্রশ্নের উত্তরে বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা বলেন, ‘আমরা তার সঙ্গে কথা বলেই এই প্রক্রিয়া শুরু করেছিলাম। রবের উদ্যোগ চলছে।’

জাতীয় ঐক্য-প্রক্রিয়া নিয়ে একটি উদ্যোগের নেতৃত্বে আছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তো কথা বলেছি। সবাই তো একটা উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে ঐক্য দরকার। সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলুক। বিষয়টিকে একটি সমন্বিত উদ্যোগের নিয়ে দিকে নিয়ে যেতে হবে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মানুষ কথা বলছে। দেশটাকে তো শেষ হতে দেওয়া যায় না। আমি আশা করি, একটি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে।’

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের যুগ্ম সম্পাদক অধ্যক্ষ ইকবাল সিদ্দিকী বলেন, ‘আসম আবদুর রব জাতীয় নেতা। এ হিসেবে তার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়। তিনিও আমাদের অনুষ্ঠানে আসেন। আমরাও চাই জাতীয় ঐক্য হোক। তিনিও একমত আমাদের সঙ্গে। মূল বিষয় হচ্ছে ড্রাইভিং সিটে যারা থাকেন, তারাই উদ্যোগটা নেবেন। আমরা তো আশা করেছিলাম যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু উনি নেননি। এরপর খালেদা জিয়া উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু দৃশ্যত কোনও অগ্রগতি চোখে পড়েনি। আমাদের পরে আর কারও সঙ্গেই তো বৈঠক করেননি তিনি। আর হলেও জানা নেই।’

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ এক সদস্য বলেন, ‘স্পষ্টভাবে জানি না, ঐক্য নিয়ে কী হচ্ছে। তবে রবের বিষয়ে আমার অভিমত নেতিবাচক। তার তো সেকেন্ডম্যান নেই। কাদের সিদ্দিকী, অলি আহমদ, বি চৌধুরীর নিজেদের কয়েকজন ছাড়া দলে কেউ নেই। কিন্তু সরকারের চেষ্টা থাকবে, তাদের নির্বাচনে নিয়ে আসা। সরকার গঠনে তাদের সঙ্গে রাখা।’

স্থায়ী কমিটির এই সদস্য আরও বলেন, ‘মনে হয় না রবকে এ ধরনের সম্মতি দেবেন খালেদা জিয়া। তিনি জোটে এলে স্বাগত। কিন্তু শেখ হাসিনা যেভাবে রোলার চালাচ্ছেন, তাতে উগ্রপন্থী দল ছাড়া তাকে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। আর বিএনপি তো উগ্রপন্থী দল নয়।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দু্লাহ আল নোমান বলেন, ‘নিজেদের মতো মাঠে নামতে চাইলেও আমরা নামব। বিভিন্ন ইস্যুতে তো আমাদের মধ্যে মতের মিল আছে। এটাই আলোচনা করেছি। আমরা তো ঐক্যের ব্যাপারে বদ্ধপরিকর।’ সেক্ষেত্রে জামায়াত বাধা কিনা—এমন প্রশ্নের উত্তরে নোমান বলেন, ‘এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না। এটা যখন হবে, তখন দেখা যাবে।’

রবের উদ্যোগে ঐক্য-প্রক্রিয়া খালেদা জিয়ার ইশারায় হচ্ছে কিনা—এই বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমি এ ধরনের কিছু শুনিনি। দলেও এমন আলোচনা নেই।’ তবে খালেদা জিয়ার ডাকা জাতীয় ঐক্যের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাবেক এই স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ‘যতটুকু হয়েছে সেটি কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে আলোচনা পর্যন্ত। এরপর ওই বিষয়টি অগ্রসর হয়নি।’

এ জাতীয় আরও খবর

ঘরেই বানান জিভে জল আনা ‘চিড়া-মুগ ক্ষীর’

হাঁটতে বেরিয়ে সড়কে প্রাণ গেল ২ নারীর

‘সুখের মতো অসুখ’র দিনগুলোতে রবীন্দ্রনাথ

দুর্গাপূজাকে ঘিরে অপশক্তি চক্রান্ত করতে পারে: রিজভী

নবীনগরে সততা ব্রিকস ফিল্ডে ডাকাতি, নাইটগার্ড ও ম্যানেজারদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি, মামলা করলে হত্যার হুমকি

ঢাকায় আজ বৃষ্টি হবে কি?

জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা রোববার

দুর্নীতিবাজ গ্রেপ্তারে আবার সক্রিয় হচ্ছে দুদক

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান

সংখ্যালঘু নয়, সবার পরিচয় হবে বাংলাদেশি: মাহ্‌দী আমিন

কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী হত্যায় অটোরিকশাচালক গ্রেপ্তার

প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত, বিক্ষোভে প্রার্থীরা