,

ফাঁসির অপেক্ষায় সাকা ও মুজাহিদ

news-image

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে সাবেক দুই মন্ত্রী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে দেশবাসী। অনেকের ধারণা, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশে যেসব নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটছে, তা এ দুই যুদ্ধাপরাধীর অনুসারীদেরই কাজ। তাঁদের ফাঁসি এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচাল করতেই স্বার্থান্বেষী মহল এসব নাশকতা চালাচ্ছে। তাই তাঁদের ফাঁসি কার্যকর হয়ে গেলে এসব অপতৎপরতা আপাতত বন্ধ হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদকে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। গত ৩০ সেপ্টেম্বর এ রায় প্রকাশের পরদিন এ দুজনকে মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শুনিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। এর পর থেকেই মৃত্যুর প্রহর গোনা শুরু হয়েছে ওই দুই রাজনৈতিক নেতার। কিন্তু এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে আইনগতভাবে দুটি ধাপ বাকি আছে। প্রথমত তাঁদের দাখিল করা রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি হতে হবে। এর আগে দণ্ড কার্যকর করা যাবে না। এ আবেদন খারিজ হলে সেই রায়ের অনুলিপি কারাগারে পাঠানো হবে। এরপর সাকা-মুজাহিদ রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চেয়ে আবেদন করার সুযোগ পাবেন। রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করলে এবং সেই আবেদন খারিজ হলে ফাঁসি কার্যকরে আর কোনো বাধা থাকবে না।

আগামী ২ নভেম্বর দুজনের রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। এদিন শুনানি হবে কি না, তা নির্ভর করছে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আসামিপক্ষ থেকে শুনানি পিছিয়ে দিতে সময়ের আবেদন করা হবে। এ আবেদন গ্রহণ করা হবে কি হবে না, তা নির্ভর করবে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। আগামী ২ নভেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩২ কার্যদিবস খোলা আছে সুপ্রিম কোর্ট। এ সময়ের মধ্যেই রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি হতে পারে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা।

নিয়ম অনুযায়ী যে বিচারপতিরা রায় দিয়েছিলেন তাঁরাই রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি নেবেন। মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরীর ক্ষেত্রে সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ শুনানি করেন। তাঁদের মধ্যে বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন এবং বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী অবসরে গেছেন। এখন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা এবং বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী আপিল বিভাগে রয়েছেন। এ তিনজনের মধ্যে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার আগামী ৫ থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় প্রধান বিচারপতিদের একটি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে এ দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দিন যতই ঘনিয়ে আসছে দেশে ততই নাশকতার ঘটনা বাড়বে বলে আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের ধারণা, গত শুক্রবার পুরান ঢাকায় তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিতে বোমা হামলার পেছনে এ ঘটনার যোগসূত্র রয়েছে। দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্যই ওই দুই নেতার অনুসারীরা এ ধরনের কাজ করছে। গাবতলীতে পুলিশের এএসআই ইব্রাহিম হত্যা মামলায় আটক এক আসামির কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন ধারণা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, আগামী মাসে রাজধানীতে কয়েকটি নাশকতামূলক ঘটনা ঘটানোর পরিকল্পনা করেছে শিবিরের ক্যাডাররা। ঢাকা, ঢাকার উপকণ্ঠ এবং বগুড়ায় বসে এ পরিকল্পনা করে তারা। এএসআই ইব্রাহিম হত্যায় গ্রেপ্তারকৃত মাসুদ রানা পুলিশকে জানিয়েছে, 'বগুড়ার আদমদীঘি জামায়াতের আমিরের নেতৃত্বে একটি পরিকল্পনা হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা শিবিরের সভাপতি এনামুল হকের নেতৃত্বে কিছু বিস্ফোরক ও অস্ত্র নিয়ে তারা ঢাকায় আসে। পথে বাধাপ্রাপ্ত হয়েই ইব্রাহিমকে ছুরিকাঘাত করে এনামুল।' এনামুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দুটি স্থানে অভিযান চালিয়ে পাঁচটি বোমাসহ জামায়াত-শিবিরের কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জামায়াত-শিবিরের নাশকতার বিষয়ে পাওয়া আগাম তথ্যের সত্যতা রয়েছে।

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ওয়ালিউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এটা সাধারণ কোনো অপরাধের বিচার নয়; এটা আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার। এ অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আমাদের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ এ সাজা বহাল রেখেছেন। সব কিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে সুচিন্তিতভাবেই আপিল বিভাগ রায় দিয়েছেন। তাই আমি মনে করি না যে রিভিউ আবেদনে সাজার কোনো পরিবর্তন হবে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে আপিল বিভাগ তাঁর রায় বহাল রাখুন।'

ওয়ালিউর রহমান বলেন, 'পৃথিবীর যেসব জায়গায় আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার হয়েছে তার কোথাও রিভিউ করার সুযোগ নেই। আমাদের আইনেও ছিল না। তবে আপিল বিভাগ একটি রায়ে রিভিউ করার সুযোগ দিয়েছেন।'

ওয়ালিউর রহমান আরো বলেন, 'মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত সব অপরাধীর বিচারের জন্য আমরা আন্দোলন করছি। তাই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে তাড়াতাড়ি তাদের দণ্ড কার্যকর করা হবে। রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার পর তাদের রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে বলে কেউ কেউ বলছেন। এ ক্ষেত্রে আমি মনে করি, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন-১৯৭৩-কে আমাদের সংবিধান দ্বারা সংরক্ষিত করা হয়েছে। তাই এ আইনের অপরাধীদের আর কোনো সাংবিধানিক সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।'

মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে কী কী আইনগত বাধা রয়েছে সে বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আগামী ২ নভেম্বর তাঁদের রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে। এদিন শুনানি হয় কি না সেটা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আদালতের ওপর। তবে আমরা দ্রুত শুনানির জন্য উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের আবেদনে আদালত এই দিন ধার্য করেছেন। এখন শুনানির অপেক্ষায় আছি।' শুনানি সম্পন্ন হতে কত দিন লাগতে পারে-এমন প্রশ্নের জবাবে মাহবুবে আলম বলেন, এটা নির্ভর করছে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। আগামী ১৬ ডিসেম্বরের আগে এ আবেদন নিষ্পত্তি হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এটা আশা করতেই পারি। কারণ আগামী পহেলা নভেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ আদালতে নিয়মিত বিচারকাজ পরিচালিত হবে। আর রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানির জন্য এত দিন লাগার কথা নয়।' তিনি আরো বলেন, 'শুনানি শুরু হওয়ার পর দুই-তিন কার্যদিবসের মধ্যেই এ আবেদনের ওপর শুনানি শেষ করা সম্ভব হবে বলে মনে করি। দিনের পর দিন এ আবেদনের ওপর শুনানির সুযোগ নেই। এ আবেদন আপিল বিভাগে খারিজ হলে সাকা ও মুজাহিদের সামনে একটি মাত্র পথ খোলা থাকবে। আর তা হলো, অপরাধ স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়া। তবে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন গেলে এত বড় অপরাধীদের রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করবেন বলে মনে হয় না। রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন না করলে একটি সময়ের মধ্যে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে সরকারের সামনে আর কোনো বাধা থাকবে না।'

তবে সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, এ দুজন এখনো বিশ্বাস করেন, আপিল বিভাগে তাঁদের রিভিউ আবেদন গৃহীত হবে এবং তাঁরা ন্যায়বিচার পাবেন। তাঁদের করা রিভিউ আবেদন খারিজ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রশ্ন আসতে পারে না। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে রিভিউ আবেদন খারিজ হলো, এর পরও কিন্তু তাঁদের একটি সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। আর সেটা হলো রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন করা। এ আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দণ্ড কার্যকর করা যাবে না।

আইনগত এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কত দিন লাগতে পারে-এমন প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মাহবুব বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। আইনগত কোনো ভুলের জন্য যেন কারো জীবন না যায়, সেটা দেখতে হবে। রিভিউ আবেদনে খালাস পাওয়ার নজির আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমাদের দেশে তেমন একটা নেই। তবে হতে কতক্ষণ? কারণ মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরী রিভিউ আবেদনে যে তথ্য দিয়েছেন, আদালত তা বিশ্বাস করলে তাঁরা খালাস পেয়ে যাবেন।'

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এএসআই ইব্রাহিম হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে আমরা জামায়াত-শিবিরের নাশকতার পরিকল্পনার ব্যাপারে তথ্য পেয়েছি। ফলে হোসেনী দালানের ঘটনার সঙ্গে এর যোগসূত্র থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। পূর্বাপর ঘটনা বিশ্লেষণ করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি নাশকতা চালাতে পারে-এমন অনেক তথ্যই আমাদের কাছে রয়েছে।'

আইনজীবীর নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন : নিজেদের আইনজীবীর নিরাপত্তা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। গতকাল রবিবার আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালতে এ আবেদন করা হয়েছে। আবেদনে অ্যাডভোকেট শিশির মনির ও অ্যাডভোকেট আসাদ উদ্দিনকে হয়রানি না করার জন্য আদালতের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

এদিকে আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন গতকাল দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, মানসিক চাপ সৃস্টির জন্যই আসামিপক্ষের আইনজীবীদের হয়রানি করা হচ্ছে।

kalerkantho.com

 

এ জাতীয় আরও খবর

পূজার আয়োজনে ঘরেই বানান নারিকেলের নাড়ু

লোকসান ও বিদ্যুৎ বিলের চাপে বন্ধ হচ্ছে উল্কা সিনেমা হল

সব সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার কথা বলল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ: রিজভী

মঙ্গলবার থেকে টানা ৫ দিনের ছুটি, ছুটিতে থাকবেন না যারা

ঢাকায় তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকার আভাস

ফ্রান্সে বিক্ষোভ-সহিংসতা, গ্রেপ্তার ২ হাজার ৪০০

সেঞ্চুরির পর ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রশংসায় আগা সালমান

টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি, অল্পের জন্য রক্ষা

জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও আধুনিক ওসমানী উদ্যান উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর

ফ্রান্সে সহিংসতা, অপরাধীদের শাস্তির হুঁশিয়ারি ম্যাক্রনের

এমবাপ্পের জোড়া গোলে সেভিয়াকে উড়িয়ে দিল রিয়াল

জুলাইকে ধারণ করে না বিরোধীদল, তাই অনুষ্ঠানে আসেনি: প্রধানমন্ত্রী