মৃত্যুতে নতুন রহস্য, মিলল নম্বরপ্লেটহীন বাইক
অনলাইন ডেস্ক : বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল পাওয়া গেছে। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, মোটরসাইকেলটির সঙ্গে তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া ও মৃত্যুর ঘটনার যোগসূত্র থাকতে পারে।
এদিকে ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে থাকা বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের বক্তব্যে একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে। দীপের দাবি, পুলিশের ধাওয়ার মুখে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তবে নিহতের বাবা জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে সাঁতারে দক্ষ ছিলেন এবং পাইলট প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সাঁতারের সনদও অর্জন করেছিলেন। ফলে এটি দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—তা নিয়ে তদন্তে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের একটি বাসা থেকে দীপকে আটক করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরে তাঁকে ঢাকা মেট্রো উত্তর কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঘটনার রাতে তিনি ও তাহসিফ মোটরসাইকেলে করে উত্তরা থেকে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। এলাকাটি মাদক কেনাবেচার স্থান হিসেবে পরিচিত। সেখানে অবস্থানের সময় কয়েকজন ব্যক্তি তাঁদের ধাওয়া করেন বলে দাবি করেছেন দীপ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তুরাগ নদীর তীরে বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে আশ্রয় নেন। অন্যদিকে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। পরে রাত আড়াইটার দিকে তিনি বাড়িতে ফিরে যান।
তবে এর আগে দীপ জানিয়েছিলেন, রাত ১২টার দিকে উত্তরা হাউস বিল্ডিং এলাকায় একসঙ্গে খাবার খাওয়ার পর তাহসিফের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। দুই বক্তব্যের এই পার্থক্য তদন্তকারীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করেছে।
পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে কিছু পরিবর্তন ও তথ্যের অসংগতি পাওয়া গেছে। প্রথমে কয়েকজন ব্যক্তি ধাওয়া করার কথা বললেও পরে দীপ দাবি করেন, ধাওয়াকারীদের পোশাক পুলিশের মতো ছিল।
তিনি আরও জানান, দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কালো রঙের একটি সুজুকি জিক্সার ১৫০ সিসির মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সেটি তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল কি না এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মোটরসাইকেলটির মালিকানাও যাচাই করা হচ্ছে।
পিবিআই কর্মকর্তা বলেন, দীপের দেওয়া প্রতিটি তথ্য সরাসরি বিশ্বাস না করে তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। তাঁদের ধাওয়া করা ব্যক্তিরা প্রকৃতপক্ষে পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না, তাঁদের কোনো দায়িত্ব ছিল কি না, এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাহসিফের মৃত্যু হত্যা, দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা—তা নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে।
এদিকে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তাহসিফের বাবা একেএম এনায়েতুল করিম। তিনি জানান, তাঁর ছেলে সাঁতার জানতেন। এমনকি বিমানচালক হিসেবে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে সাঁতারের বিশেষ কোর্স সম্পন্ন করে সনদও পেয়েছিলেন।
তাহসিফের বাবার দাবি, ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে অন্যদিকে তদন্তের মোড় ঘোরানোর চেষ্টা চলছে। তাঁর মতে, একজন সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা পুলিশের ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন—এমন বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। ওই এলাকায় তাঁর ছেলে কখনো গিয়েছিলেন বলেও তিনি মনে করেন না।
তিনি আরও বলেন, ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার এখনো নিজ উদ্যোগে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে মামলা করা হোক বা না হোক, সরকার ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত নিজস্ব আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা। প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে নৌ-পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, তাহসিফের পরিবার এখনো মামলা করেনি। তবে পরিবার মামলা না করলে আইন অনুযায়ী পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। নৌ-পুলিশের পাশাপাশি পিবিআইও ঘটনাটি তদন্ত করছে। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই করা হচ্ছে।
অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানান, ঘটনার আগে তাহসিফ ও দীপ কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং তাঁদের সর্বশেষ অবস্থান কোথায় ছিল—এসব তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেল, দীপের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং পরিবারের অভিযোগ—সবকিছু মিলিয়ে তদন্তের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা ও মৃত্যুর পেছনের কারণ বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনরা।











