সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়াই ইসরায়েলের নির্বাচন, সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা
অনলাইন ডেস্ক : ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে দেশটিতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট এবং গাদি আইজেনকটের বিরোধী জোট—কেউই এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার মতো আসন পায়নি। এখন সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দেশটির আরব রাজনৈতিক দলগুলো।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে। এতে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, ১২০ আসনের ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের ঝুলিতে গেছে ৪৮টি আসন। বাকি ১৯টি আসন পেয়েছে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী ইউনাইটেড আরব লিস্ট (রাআম) ও জয়েন্ট লিস্ট।
ইসরায়েলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। ফলে কোনো জোটের পক্ষেই এককভাবে সরকার গঠন সম্ভব হচ্ছে না। দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসেও কোনো একক দল একা এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।
সরকার গঠনের পরবর্তী প্রক্রিয়া
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে জোট গঠনের আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সমঝোতা না হলে দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ সরকার গঠনের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় কোনো নেতাকে দায়িত্ব দিতে পারেন।
প্রাথমিকভাবে দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তি সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজন হলে এ সময় বাড়ানো সম্ভব। তিনি ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য কোনো নেতাকে দায়িত্ব দিতে পারবেন।
দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলে নেসেটের ৬১ জন সদস্য একত্র হয়ে কোনো একজন সংসদ সদস্যকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে আবেদন করতে পারবেন। এসব উদ্যোগও সফল না হলে দেশটিতে আবারও জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করতে হতে পারে।
আরব দলগুলোর সমর্থন কি নির্ধারক হবে?
সরকার গঠনের সমীকরণে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে নেতানিয়াহু ও আইজেনকট—দুজনই এসব দলের সঙ্গে সরাসরি জোট গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন। অন্যদিকে আইজেনকট জানিয়েছেন, ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং দেশটির স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল্যবোধ সমর্থন করে—এমন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গেই তিনি জোটের বিষয়ে আলোচনা করবেন।
বিরোধী শিবিরের নেতা ও ইসরায়েল বেইতেনু দলের প্রধান আভিগদর লিবারম্যানও কয়েকটি সম্ভাব্য জোটের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, নেতানিয়াহু কিংবা জয়েন্ট লিস্টের নেতা আহমেদ তিবি—কারও সঙ্গে তিনি জোটে যেতে আগ্রহী নন।
তবে আরব দলগুলো নেতানিয়াহুবিরোধী শক্তির সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসুফ জাবারিন জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু সরকারের পতনের লক্ষ্যে তাঁর দল সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
জোট গঠনে তিন ধরনের সম্ভাবনা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট চাইলে আরব দলগুলোর সঙ্গে কয়েকভাবে সমঝোতা করতে পারে।
প্রথমত, আরব দলগুলো সরাসরি সরকারে অংশ নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, তারা জোটের অংশ হলেও মন্ত্রিসভায় যোগ না দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে। তৃতীয়ত, সরকারে যোগ না দিয়েও সংসদে আস্থা ভোট ও অনাস্থা প্রস্তাবের ক্ষেত্রে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, রাআম সরাসরি সরকারে অংশ নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী হতে পারে। অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্ট বাইরে থেকে কোনো সংখ্যালঘু সরকারকে সমর্থন দেওয়ার পথ বেছে নিতে পারে।
তবে এ ধরনের সমঝোতা কতটা বাস্তবসম্মত হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, আইজেনকটের মিত্রদের একটি অংশ আরব দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতায় আপত্তি জানিয়ে আসছে।
নেতানিয়াহুর সামনে কী বিকল্প?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় থাকার জন্য নেতানিয়াহুর সামনে কয়েকটি পথ খোলা রয়েছে। তিনি বিরোধী জোটের কোনো দলকে নিজের সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। পাশাপাশি নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টাও করতে পারেন।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, নেতানিয়াহু বিরোধী জোটের ভেতরে বিভাজন তৈরি করে নিজের ক্ষমতায় থাকার সুযোগ খুঁজতে পারেন। আবার বিরোধী দলের কোনো এক বা একাধিক অংশকে নিজের জোটে যুক্ত করার চেষ্টাও করতে পারেন।
তবে আপাতত নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যানের দল নেতানিয়াহুর সঙ্গে যোগ দেবে—এমন স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।
ফিলিস্তিনিদের কাছে নির্বাচনের তাৎপর্য
ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর আসনসংখ্যা এবারের নির্বাচনে নতুন রাজনৈতিক গুরুত্ব তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব দলের সমর্থন ছাড়া বিরোধী জোটের সরকার গঠনের পথ কঠিন হতে পারে।
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ নাজ্জারের মতে, ফিলিস্তিনি নাগরিকরা নির্বাচনে অংশ নিয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করলেও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাঁদের রাজনৈতিক অংশীদারত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তবে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ইসরায়েলের এই নির্বাচন কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার যে-ই গঠন করুক না কেন, ফিলিস্তিনিদের অধিকার, গাজা পরিস্থিতি, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং রাজনৈতিক সমাধানের প্রশ্নগুলোই হবে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সব মিলিয়ে ইসরায়েলের নির্বাচনী ফল দেশটির রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। আরব দলগুলোর সমর্থন, বিরোধী জোটের ঐক্য এবং নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশল—এই তিনটি বিষয়ই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারে দেশটির পরবর্তী সরকার কারা গঠন করবে।











