রাশিয়ায় যুদ্ধে ড্রোন হামলায় আহত রাজনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া
আগস্ট ২৭, ২০২৬
অনলাইন ডেস্ক : অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে রাশিয়ায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজের আশায় পাড়ি দিয়েছিলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের রাজন হোসেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাকে যুদ্ধে পাঠানো হয়। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হয়ে কোমরের নিচের শক্তি হারান ২২ বছর বয়সী এই তরুণ।
সম্প্রতি রাশিয়ার একটি হাসপাতাল ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় দেশে ফিরে নিজ বাড়ি গয়েশপুর গ্রামে অবস্থান করছেন রাজন। যুদ্ধের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।
রাজন জানান, গত ৭ মে বাংলাদেশ থেকে তাকে মস্কোয় নেওয়া হয়। পরে আরও ২৯ বাংলাদেশির সঙ্গে বাসে করে মস্কো থেকে ওয়ারেনবার্গে নিয়ে একটি হোটেলে কয়েকদিন রাখা হয়। ব্যাংক কার্ড ও সিম কার্ড তৈরির কথা বলে সেখানে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে কাজ দেওয়ার কথা বলে তাদের একটি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে গিয়ে বিষয়টি বুঝতে পেরে রাজনসহ ৩০ বাংলাদেশি যুদ্ধে যেতে আপত্তি জানান। রাশিয়ার একটি কোম্পানির দুই ব্যক্তির কাছে তারা অনুরোধ করলেও কোনো লাভ হয়নি। পরে তাদের সেনাবাহিনীর গাড়িতে করে একটি বাংকারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কয়েকটি দলে ভাগ করে দেওয়া হয়।
রাজন বলেন, তিনি ছয়জনের একটি দলে ছিলেন। তাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর পোশাক, অস্ত্র ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া হয়। এরপর ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই ভয়াবহ ড্রোন হামলার মুখে পড়েন তারা। রাজনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় ১৭ বাংলাদেশি নিহত হন। একই হামলায় একটি ড্রোন তার কোমরের কাছে আঘাত করলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। এরপর থেকে কোমরের নিচে আর কোনো শক্তি অনুভব করছিলেন না।
আহত অবস্থায় চার দিন ধরে প্রায় চার কিলোমিটার পথ বুকের ওপর ভর করে পাড়ি দিয়ে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের একটি হাসপাতালে পৌঁছান রাজন। এ সময় পানির জন্য রুশ সেনাদের কাছে সাহায্য চেয়েও সাড়া পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে ক্যাম্পে ফিরে আসার কারণে কমান্ডারের মারধরের শিকার হওয়ার কথাও জানান।
রাজনের ভাষায়, যুদ্ধক্ষেত্রে একদিকে আকাশে ড্রোন, মাটিতে মাইন আর সামনে শত্রুপক্ষের সেনা—এমন পরিস্থিতিতে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল আতঙ্কের। চিকিৎসাব্যবস্থাও সেখানে সন্তোষজনক ছিল না বলে জানান তিনি।
পরে তাকে রাশিয়ার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ১৫ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর এক চিকিৎসক তাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়ে যান। দূতাবাসের সহযোগিতায় ২১ আগস্ট ট্রাভেল পাস নিয়ে এবং পরিবারের পাঠানো অর্থে টিকিট কিনে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সে দেশে ফেরেন রাজন।
রাজনের দাবি, বাংলাদেশি জাবাল-ই-নূর রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তাকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।
রাজনের বাবা আব্দুল কাদের জানান, ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে ধারদেনা করে ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। তার অভিযোগ, শ্রমিকের কাজ দেওয়ার কথা বলে দীর্ঘ সময় ঘোরানোর পর ছেলেকে প্রতারণার মাধ্যমে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে। এখন আহত ছেলের চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্যও তার নেই। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দাবি করেছেন তিনি।
রাজনের মা মাহফুজ বেগম বলেন, সংসারের অভাব দূর করার আশায় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সুস্থ অবস্থায় বিদেশে যাওয়া ছেলে এখন হাঁটতে পারছেন না। অন্যের সহায়তায় সংসার চালাতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় কলেজ শিক্ষক মুসা করিমও পরিবারটির দুরবস্থার কথা তুলে ধরে দালালদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
তবে অভিযুক্ত আবু তাহের লেন্টু প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তার ভাগ্নে সোহেলের মাধ্যমে রাজনকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল এবং তাকে সরকারি প্রক্রিয়াতেই পাঠানো হয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হওয়া ঠেকাতে মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে রাশিয়া থেকে ফিরে আসা রাজনের পাশে উপজেলা প্রশাসন থাকবে বলেও জানান তিনি।