শিশু গৃহকর্মী নির্যাতন: বিমানের সাবেক এমডিসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র
অনলাইন ডেস্ক : শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের মামলায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বীথি আক্তারসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। মামলার অন্য দুই আসামি হলেন রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগম।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা-পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রোবেল মিয়া গত ৩১ আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে গত ২৩ সেপ্টেম্বর মামলাটি ঢাকার নবম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। শনিবার (১৭ অক্টোবর) এ তথ্য জানা গেছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা গোলাম মোস্তফা গত ১ ফেব্রুয়ারি চারজনকে আসামি করে মামলা করেন। ওই রাতেই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর সাফিকুর রহমান চাকরি হারান।
মামলার তদন্তে বীথি আক্তার ও সুফিয়া বেগম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি দেওয়া জবানবন্দিতে বীথি শিশুটিকে বিভিন্ন সময়ে মারধরের কথা স্বীকার করেন। অন্যদিকে, সুফিয়া বেগম তাঁর জবানবন্দিতে সাবান ও নারিকেল তেল চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিশুটিকে মারধরের কথা উল্লেখ করেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সাফিকুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীর সন্তানের দেখাশোনার জন্য শিশুটিকে গৃহকর্মী হিসেবে বাসায় নেওয়া হয়েছিল। পরে কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই শিশুটির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। গৃহকর্ত্রীর নির্দেশে এবং তাঁর দেখাদেখি অন্য দুই গৃহকর্মীও শিশুটিকে নির্যাতন করতেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে আরও অভিযোগ করা হয়, শিশুটিকে ঠিকমতো খাবার না দিয়ে দীর্ঘ সময় বাথরুমে আটকে রাখা হতো। ক্ষুধার কারণে সে বাথরুমের পানি ও টুথপেস্ট খেয়ে থাকত। অসুস্থ হয়ে কাজ করতে না পারলে গরম লোহার খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়া এবং বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মারধর করা হতো বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
শিশুটির বাবাকে মেয়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে দেখা করতে দেওয়া হতো না বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। দেখা করার সময় শিশুটিকে বড় পোশাক পরিয়ে রাখা হতো এবং গৃহকর্ত্রী ও অন্য গৃহকর্মীরা পাশে থাকতেন। নির্যাতনের কারণে শিশুটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তার বাবাকে খবর দিয়ে নিয়ে যেতে বলা হয়।
অভিযোগপত্রে সাফিকুর রহমানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর স্ত্রী শিশুটির ওপর নির্যাতন চালালেও তিনি তা দেখেও কার্যকর পদক্ষেপ নেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার একজন মহানগর হাকিমের কাছে দেওয়া বক্তব্যে ভুক্তভোগী শিশুটি নিজের ওপর চালানো নির্যাতনের বিবরণ তুলে ধরে। সেখানে সে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া, বাঁশের লাঠি দিয়ে মারধর, চোখে মরিচের গুঁড়া দেওয়া এবং দীর্ঘ সময় বাথরুমে আটকে রাখার অভিযোগ করে। এ ছাড়া খাবার ও শীতের পোশাক না দেওয়া এবং মারধরের কারণে দাঁত ভেঙে যাওয়ার কথাও জানায় শিশুটি।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে সাফিকুর রহমানের বাসায় শিশুটিকে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর। শিশুটির বিয়েসহ বিভিন্ন খরচ বহনের আশ্বাস পেয়ে তার বাবা গত বছরের জুন মাসে তাকে ওই বাসায় পাঠান। সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর বাবা মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি বীথি আক্তার ফোন করে শিশুটির অসুস্থতার কথা জানিয়ে তার বাবাকে নিয়ে যেতে বলেন। পরে বাবা বাসায় গিয়ে মেয়ের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন দেখতে পান। এরপর তাকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মামলাটি এখন ঢাকার নবম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আসামিরা আইনগতভাবে নির্দোষ বলে বিবেচিত হবেন।











